
ভারতের সংবিধান তৈরি করতে সময় লেগেছিল ২ বছর ১১ মাস ১৭ দিন
প্রজাতন্ত্র হল এমন একটি সরকারি ব্যবস্থা যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করে থাকে জনগণ বা জণগণের এক অংশ। এই ব্যবস্থাতে কোন রাজা বা রানির অস্তিত্ব নেই। তবে ইংরেজী ভাষায় ‘প্রজাতন্ত্র’ শব্দের প্রতিশব্দ হল ‘REPUBLIC’। এটি এসেছে লাতিন শব্দবন্ধ ‘RESPUBLICA’ শব্দবন্ধটি থেকে, এর আক্ষরিক অর্থ ‘জনগণ সংক্রান্ত একটি বিষয়’। সারা বিশ্বের মধ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রজাতন্ত্র সরকার বর্তমান। তবে প্রজাতন্ত্র সরকারি ব্যবস্থাও কিন্ত ভারতে রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অতীতের ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন। ১৮৫৮ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে। এইসময় থেকে বিদেশি শাসকদের হাত থেকে মুক্ত করতে এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। বহু দীর্ঘদিনের সংগ্রামের পর ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। এবং জাতীয় উপমহাদেশে ভারত(INDIA) এবং পাকিস্তান(PAKISTAN) নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হওয়ার ফলে জাতিগত সমস্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেশে দেখা দেয়। এর ফলে ভারতকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে চরম পর্যায় পৌঁছে যায়।
ঠিক এইসময়ে ভারতে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত ভারতকে সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে এবং দেশ ও জাতির মুক্তির কামনার উদ্দেশ্যে শুরু হয় নানা গঠনমূলক কাজ। এই ভাবে শুরু হয় গণপরিষদ ও সংবিধানের কাজ। একই সঙ্গে সূচনা হল প্রজাতন্ত্রের সূত্রপাত।
গণপরিষদের সূচনা:- পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি একটি নির্দিষ্ট সংবিধানের দ্বারা পরিচালিত হয়। কারণ সংবিধানই হল একটি দেশের পরিচালনার অপরিহার্য অঙ্গ বিশেষ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সংবিধান রচনা করে থাকে। তবে সমগ্র দেশবাসীর পক্ষে সংবিধান রচনার কাজে প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। তাই এই সংবিধান রচনার কাজ একটি সংস্থা করে থাকে। আর এই সংস্থাই দেশবাসীর হয়ে সংবিধান রচনা করে।
গণপরিষদের গঠনের চারটি মূলনীতি:- গণপরিষদ গঠনের চারটি মূলনীতি ছিল। ঠিক হয়েছিল যে, গণপরিষদের যাঁরা সদস্য হবেন, তাঁরা প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবে। অর্থাৎ ক্যাবিনেট মিশনের সুপারিশ চারটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় গণপরিষদ ব্যবস্থা করা হয়।
১। ব্রিটিশ শাসিত প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলি তাদের জনসংখ্যার অনুপাত হিসাবে গণপরিষদে আসন পাবে।
২। গণপরিষদের সফল আসন সাধারণ (অ-মুসলিম ও অ-শিখ) অর্থাৎ হিন্দু, মুসলমান ও শিখ এই তিনটি সম্প্রদায়ের মধ্যে আনুপাতিক ভাগ হবে।
৩। প্রাদেশিক আইন সভার প্রতিটি সম্প্রদায়ের একক হস্তান্তর যোগ্য সমানুপাতিক ভোটাধিকার ভিত্তিতে নিজ নিজ সম্প্রদায় প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করবে।
৪। দেশীয় রাজ্যগুলিতে ৯৩জন প্রতিনিধি পাঠাবে, পরে আলোচনা মাধ্যমে ঠিক হয় যে, দেশীয় রাজ্যের অর্ধেক প্রতিনিধি নির্বাচন দ্বারা এবং অর্ধেক প্রতিনিধি মনোনয়নের দ্বারা স্থির করবে।
আর মন্ত্রী মিশন অনুযায়ী ঠিক হয় যে, গণপরিষদে মোট ৩৮৯জন সদস্য থাকবে। এর মধ্যে ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চল প্রদেশ থেকে ২৯২জন, চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশগুলি থেকে ৪জন। এবং দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে ৯৩জন প্রতিনিধিত্ব করবে।
গণপরিষদের গঠন:- ১৯৪৬ সালে জুলাই মাসে দিকে গণপরিষদের নির্বাচন কার্য অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনমণ্ডলীতে ছিলেন প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যরা। গণপরিষদের মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৮৯জন। এর মধ্যে দেশীয় রাজ্যের প্রতিনিধি সংখ্যা ৯৩ জন। ২৯৬টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস ২০৮টি আসন, মুসলিম লিগ ৭৮টি আসন লাভ করে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস বেশিরভাগ আসন লাভ করে। এই গণপরিষদের বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তিগণ সদস্য রূপে নির্বাচিত হন। তাঁদের মধ্যে হলেন – সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু, ড. বি. আর. আম্বেদকর, মৌলানা আবদুল কালাম আজাদ, চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী, ড. রাধাকৃষ্ণাণ, কে. এম. মুন্সি প্রমুখ।
তবে সংবিধান রচনা ও গণপরিষদের পরিচালনার মূল কর্তৃত্ব ছিল চারজনের হাতে। তাঁরা হলেন :- সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু, মৌলানা আবদুল কালাম আজাদ ও ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ। খসড়া সংবিধানের প্রণয়নের একক কর্তৃত্ব ছিল ড. বি. আর আম্বেদকরের।
গণপরিষদের মূল লক্ষ্য :- শুধুমাত্র স্বাধীনতা অর্জনের জন্য গণপরিষদ নয়। আর্থসামজিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাই প্রতিটি জাতির মূল লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছোবার জন্য প্রয়োজন বহিঃশত্রু নিয়ন্ত্রণমুক্ত পূর্ণ স্বাধীনতা। ভারতীয় গণপরিষদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ভারতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর রূপরেখা করা।
এই প্রসঙ্গে জওহরলাল নেহরু বলেন "গণপরিষদের প্রধান কাজ হবে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে ভারতকে স্বাধীন করা, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে দুই মুঠো অন্ন, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র, এবং প্রতিটি ভারতবাসীকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী আত্মবিকাশের সুবিধা প্রদান করা।" ড. সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণাণ বলেন “একটি সামজিক অথনৈতিক বিপ্লবসাধনই গণপরিষদের মূল লক্ষ্য।”
সংবিধান রচনা :- ১৯৪৬ সালে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল। কিন্তু প্রথম অধিবেশনে মুসলিম লিগের প্রতিনিধিরা যোগদান করেননি। তাঁদের অনুপস্থিতিতে ২০৭জন প্রতিনিধি নিয়ে কাজ শুরু হয়। বিশিষ্ট কংগ্রেস সভাপতি জে বি কৃপালিনীর প্রস্তাবে ড. সচ্চিদানন্দ সিংহকে গণপরিষদের অস্থায়ী সভাপতি করে কাজ শুরু হয়। তারপরে ১১ ডিসেম্বর গণপরিষদের স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৩ ডিসেম্বর জওহরলাল নেহরু ভারতীয় সংবিধানের "লক্ষ্যমূলক প্রস্তাব" উত্থাপন করে ভারতকে “স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র” বলে অভিহিত করেন। এর মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়ে যায়। এবং ২৯ আগষ্ট সংবিধান রচনার জন্য ‘খসড়া কমিটি’ (DRAFTING COMMITTEE) গঠিত হয়। এই কমিটি সভাপতি ছিলেন ড. বি. আর আম্বেদকর। কমিটি সদস্য ছিলেন এন. গোপালগোস্বামী আয়েঙ্গার, আল্লাদী কৃষ্ণস্বামী আয়ার, কে. এম মুন্সি, ডি.পি খৈতান ও বি. এল. মিত্র প্রমুখ।
১৯৪৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি 'খসড়া কমিটি' গণপরিষদের কাছে খসড়া সংবিধান পেশ করে। দীর্ঘ আলাপ আলোচনা ও সংশোধন মাধ্যমে শেষমেশ ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গ্রহণ করা হয়।
এই সংবিধানে মোট ৩৬৫টি ধারা ও ৮টি তপশিলি ছিল। সংবিধান তৈরি করতে সময় লেগেছিল ২ বছর ১১ মাস ১৭ দিন। পৃথিবীতে অন্য কোনও দেশে সংবিধান রচনা করতে এত সময় লাগেনি।
পৃথিবীর বৃহত্তম লিখিত সংবিধান হল ভারতের সংবিধান। এর পরে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ভারতের সংবিধান কার্যকরী হয়। এবং ওই দিন থেকে ভারত একটি ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর এই দিনটি ভারতের ‘সাধারণতন্ত্র দিবস’ (REPUBLIC DAY) হিসেবে পরিচিত।
২০১৮-তে প্রজাতন্ত্র দিবস ৬৯ বছর সম্পূর্ণ করবে। সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনে প্রধান কর্মসূচী হয় ভারতের রাষ্ট্রপতির সামনে, নয়াদিল্লিতে। এই দিন দিল্লির রাজপথে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়, যা ভারত রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে ভারতের তিন সামরিক বাহিনী – স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী ও বায়ুসেনা। এটি হল ভারতের জাতীয় দিবস।
তবে ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায়(PREAMBLE) ভারতকে একটি ‘সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যে – নারী-পুরুষ, জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ভোগ করবে।
এই কথাটি আজও আমাদের প্রতিটি পাঠ্যপুস্তকের প্রথম বা দ্বিতীয় পাতায় প্রস্তাবনা বলে লিখিত থাকে, আর অশোকস্তম্ভ চিহ্ন থাকে।
