স্বেচ্ছায় টুকরো হওয়া ব্রিজ

কলকাতার বুকে হাতেগোনা কয়েকটি আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম এই ব্রিজ

ভারতের মাত্র তিনটি ফোল্ডিং ব্রিজের একটি শহর কলকাতায়। খিদিরপুর ব্যাসকিউল ব্রিজ। বড়ো মাপের জাহাজ চলাচলের জন্য এই ব্রিজ দুভাগ হয়ে উঠে আসে পাড়ের দিকে। জাহাজ চলে গেলে আবার জায়গায় ফিরে যায় আগের মতো। কলকাতার খিদিরপুর ছাড়া মুম্বাই পোর্ট ও তামিলনাড়ুতে এমন দু’টি ব্রিজ রয়েছে। আমরা জানি ১৮৮৬ থেকে ’৯৪ এর মাঝামাঝি লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ পৃথিবীর প্রথম ব্যাসকিউল ও সাসপেনশন ব্রিজের সংমিশ্রন হিসাবে বিখ্যাত। সাল ১৯৬৬, নভেম্বর মাসের ১৫ তারিখ উদ্বোধন হয় এই ব্রিজের। যানবাহন চলাচল শুরু হয়। ওয়াগেন বিরো ব্রিজ সিস্টেম নামক অস্ট্রিয়ান এক কোম্পানির হাতে তৈরি হয় এই ব্রিজ।

ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন নিজের গাড়িতে। হঠাৎ আপনাকে আটকানো হলো এক ব্রিজের গোড়ায়। আপনি দেখছেন আপনার চোখের সামনে ব্রিজটি উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। মাঝখান দিয়ে রাস্তা কাটছে এক বিরাট মাপের জাহাজ। রোজের রুটিনে বেশ অবাক করা এক ঘটনা তাই না? সচরাচর এমন ঘটনা দেখলে অস্বস্তি হতে বাধ্য। টানটান পিচ রাস্তা আকাশের দিকে উঠে যেতে আমরা কেউই দেখিনি কখনও। দেখিনি রাস্তা কেটে জাহাজ চলে যেতেও।

খিদিরপুর ব্রিজ (কলকাতা, ভারত) 

এক ইলেক্ট্রো-হাইড্রোলিক সিস্টেমে ওঠানামা করে এই ব্রিজ। ব্রিজের মাঝ বরাবর একটি জায়গা থেকে দু-দিকে দু’টি অংশ আলাদাভাবে উঠতে থাকে উপর দিকে। একে বলে ডাবল-লিফ ব্যাসকিউল ব্রিজ। ব্রিজের দু-প্রান্তের দু’টি মোটরের দ্বারা দু’টি গিয়ার নিয়ন্ত্রিত হয়। যখন গিয়ারগুলি সামনের দিকে চলে, ব্রিজ খুলে যায় এবং তৈরি হয়ে যায় জাহাজ যাওয়ার রাস্তা। তারপর আবার বিপরীত দিকে গিয়ার চালিত হলে ব্রিজের দু’টি অংশ নেমে আসে যথাস্থানে। এখানে কোনও পুলি বা তারের ব্যবস্থা নেই। ব্রিজের দু’টি প্রান্ত আলাদাভাবে মাটির সঙ্গে ৬৬ ডিগ্রি কোণে খুলে থাকে। এই অ্যাঙ্গেলে পৌঁছতে অবশ্য সাত থেকে আট মিনিট সময় লাগে ব্রিজের। আবার পূর্বের জায়গায় ফেরাতেও লাগে প্রায় এই পরিমাণ সময়। বুধবার ও শনিবার ছাড়া সপ্তাহে পাঁচদিন এই ব্রিজ দুপুর ২টো থেকে ৩টের মধ্যে খোলা হয় জাহাজ যাতায়াতের জন্য।

১৯৬৬-তে চালু হওয়া এই ব্রিজ ২০১৮ পর্যন্ত প্রায় কোনও মেন্টেনেন্স ছাড়াই চলেছে নির্বিঘ্নে। তবে ২০১৮ সালের আগস্ট মাস নাগাদ দেখা দেয় বিপত্তি। ভরদুপুরে গাড়ির লাইন লেগে যায়। জ্যাম হয়ে যায় দীর্ঘ রাস্তা জুড়ে। জলযানের যাতায়াতে খোলা ব্রিজ কিছুতেই বন্ধ হতে চায় না। বহুক্ষণ ধরে চেষ্টার পরেও অপারগ হয়ে ডাকা হয় ইঞ্জিনিয়ারদের। তাঁরা কারণ বার করেন এবং মেরামত করেন ব্রিজ সেই মুহূর্তের জন্য। সমস্যা মিটে যায়। এরপর নভেম্বর মাস নাগাদ ব্রিজ দিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখে কিছুদিনের জন্য মেরামত করা হয়। কাজ শেষ হলে দিন চার পাঁচেকের মধ্যে শুরু হয় যান চলাচল। কলকাতার বুকে হাতেগোনা কয়েকটি আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম এই ব্রিজ। অথচ আমরা অনেকেই জানি না এর কথা, অনেকে ভুলেও গিয়েছি হয়তো বা। খিদিরপুরের এই ব্রিজকে কলকাতার এক ঐতিহ্য বললে বোধহয় বেশি বলে ফেলা হবে না এখনও।

টাওয়ার ব্রিজ (লন্ডন)

Developed by DXDasia