ভাই গিরীশচন্দ্র সেন ১৮৮১ সালে শুরু করেন বাংলায় কোরআন অনুবাদ
সিরাজাম মুনীর শ্রাবণ
বাংলাতে দীর্ঘ ছয় বছর খেটে কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেছিলেন গিরিশচন্দ্র সেন। তিনি ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। তবে আরবি ও ফার্সি ভাষার উপর তাঁর বেশ দখল ছিল। ১৮৮১ সালে বাংলায় কোরআন অনুবাদের কাজ প্রথম শুরু করেন তিনি। কয়েক বছরের অবিরাম পরিশ্রমে অনুবাদ কাজ সম্পন্ন হয়। তখন বাংলার প্রকাশনা ছিল কলকাতা কেন্দ্রিক। ঢাকায় তখনও প্রকাশনা শিল্প বিকাশ লাভ করেনি। অল্প অল্প করে তিনি অনুবাদ করতেন এবং খণ্ড খণ্ড আকারে তা প্রকাশ করতেন। তার লেখা আত্মজৈবনিক বই আত্ম-জীবন-এ তিনি জানাচ্ছেন-
“শেরপুরস্থ চারুযন্ত্রে প্রথম খণ্ড মুদ্রিত হয়, পরে কলকাতায় আসিয়া খণ্ডশঃ আকারে প্রতিমাসে বিধানযন্ত্রে মুদ্রিত করা যায়। প্রায় দুই বছরে কোরআন সম্পূর্ণ অনুবাদিত ও মুদ্রিত হয়। পরিশেষে সমুদয় এক খণ্ডে বাঁধিয়া লওয়া যায়। প্রথমবারে সহস্র পুস্তক মুদ্রিত হইয়াছিল, তাহা নিঃশেষিত হইলে পরে ১৮৯৮ সালে কলকাতা দেবযন্ত্রে তাহার দ্বিতীয় সংস্করণ হয়। দ্বিতীয়বারের সহস্র পুস্তকও নিঃশেষিত প্রায়। এখন সংশোধিত আকারে তাহার তৃতীয় সংস্করণের উদ্যোগ হইতেছে।”
অমুসলিম হয়েও তিনি যে কোরআন অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন তার পেছনে বেশ কিছু প্রভাবক কাজ করেছিল। প্রথমত তাঁর পরিবার। তিনি যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সেখানে ফারসি ভাষা চর্চার জন্য এলাকায় সুনাম ছিল। ইসলাম চর্চার জন্য ফারসি ভাষা অনেক সমৃদ্ধ। ছোটবেলাতেই তিনি ফারসি ভাষা শিখতে শুরু করেন। কিশোর বয়সে ইংরেজি শিক্ষায় মন টেকেনি, তাই ফারসিতেই পড়াশোনা শুরু করেন। কৈশোর পেরিয়ে তরুণ বয়সে যখন পা দেন, তখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ময়মনসিংহে, সেখানে একজন মওলানার অধীনে ফারসি ভাষার গভীর জ্ঞানার্জন শুরু করেন।
সব ধর্মের প্রতিই আগ্রহ ছিল তাঁর। সে সূত্রে চাকরির পাশাপাশি ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন করতে থাকেন দীর্ঘদিন। তার বয়স যখন ৪২ তখন তিনি আরবি ভাষা শিক্ষা এবং ইসলাম সম্বন্ধে আরো গভীর জ্ঞান লাভের জন্য লাখনৌ যান। সেখান থেকে আরবি ভাষা শিখে আসেন কলকাতায়। সেখানেও একজন মৌলবির কাছে ইসলাম সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করেন। এরপর চলে আসেন ঢাকায়, এখানে এসেও চালিয়ে যান ইসলাম সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন।
কোরআন সম্বন্ধে বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন অনুবাদ ও তাফসীর পড়ে কোরআনের উপর বেশ দখল অর্জন করলেন গিরিশচন্দ্র। একপর্যায়ে তিনি অনুভব করেন, কোরআনের মর্মবাণী সকলের জানা উচিৎ। সেজন্য বাংলা ভাষায় কোরআনের একটি অনুবাদ থাকা প্রয়োজন। এরপর সাহস করে শুরু করলেন বাংলায় কোরআনের অনুবাদ। তাঁর অনূদিত কোরআনের ভূমিকাতে তিনি এ সম্বন্ধে লিখেছেন – “আমি আরব্য ভাষা শিক্ষায় প্রবৃত্ত্ব হইলে অনেক বন্ধু বঙ্গভাষায় মূল কোরআন অনুবাদ করিয়া প্রচার করিতে আমাকে অনুরোধ করেন, এ বিষয়ে আমি কোন কোন মোসলমান বন্ধু কতৃকও বিশেষরূপে অনুরুদ্ধ হই। কোরআন অধ্যয়ন ও তাহ অনুবাদ করাই আরব্য-ভাষা শিক্ষায় প্রবৃত্ত হওয়ার আমার প্রধান উদ্দেশ্য। বন্ধুদিগের আগ্রহে ও স্বীয় কর্তব্যানুরোধে ঈশ্বর কৃপায় আমি এক্ষণ কোরআন বঙ্গভাষায় অনুবাদ করিয়া প্রকটন করিয়াছি।”
সম্পূর্ণরূপে কোরআনের বঙ্গানুবাদ গিরিশচন্দ্রই প্রথম করেন। শুধু সম্পূর্ণ অনুবাদই নয়, তাঁর অনুবাদে স্থানে স্থানে প্রয়োজন অনুসারে বেশ কিছু টীকাও সংযোজিত হয়েছিল। এসব টীকা দেবার জন্য তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় প্রকাশিত বেশ কিছু তাফসীর গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছিলেন। এত বড় কাজ অবশ্যই পরিশ্রমসাধ্য ও দীর্ঘ সাধনার ফল। নিঃসন্দেহে এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ এবং এটি বাংলা ভাষায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তবে দুঃখের বিষয়, অনেকেই কোরআনের প্রথম অনুবাদক হিসেবে তাকে কৃতিত্ব দিতে ইতস্ততঃ করেন। সম্ভবত এর প্রধান কারণ তিনি অমুসলিম বলে।
তৎকালে তাঁর করা অনুবাদ ছিল বাংলা ভাষায় সাড়া ফেলে দেবার মতো কাজ। তাঁর এই কাজের প্রতি সাধুবাদ জানিয়ে তৎকালের কলকাতা মাদ্রাসার আরবি শিক্ষক আহমদউল্লা এবং আরও কিছু আলেম-উলামা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লেখেন। সে চিঠির বক্তব্য অনেকটা এরকম-
“আমরা বিশ্বাসে ও জাতিতে মোসলমান। আপনি নিঃস্বার্থভাবে জনহিত সাধনের জন্য যে এতাদৃশ চেষ্টা ও কষ্টসহকারে আমাদিগের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকার সাধনে নিযুক্ত হইয়াছেন, এজন্য আমাদিগের অত্যুত্তম ও আন্তরিক বহু কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি।”
তাঁর অনুবাদের চতুর্থ সংস্করণের ভূমিকা লিখেন মওলানা আকরম খাঁ। তিনি ‘মোহাম্মদী’ ও ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ইসলামের উপর বেশ পাণ্ডিত্য ছিল তাঁর। ভূমিকায় তিনি ভাই গিরিশচন্দ্র সেনকে প্রশংসা করে লেখেন-
“তিন কোটি মোছলমানের মাতৃভাষা যে বাংলা তাহাতে কোরানের অনুবাদ প্রকাশের কল্পনা ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ দেশের কোন মনিষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তখন আরবি-ফারসি ভাষার সুপণ্ডিত মোছলমানের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তাঁহাদের মধ্যকার কাহারও যে বাংলা সাহিত্যের উপরও যে যথেষ্ট অধিকার ছিল তাঁহাদের রচিত বা অনুদিত বিভিন্ন পুস্তক হইতে তাহার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু (কোরআন অনুবাদের জন্য) এই মনোযোগ দেওয়ার মতো সুযোগ তাঁহাদের একজনেরও ঘটিয়া উঠে নাই। এই গুরুদায়িত্ব বহন করিবার জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়া, সর্বপ্রথমে প্রস্তুত হইলেন বাংলার একজন হিন্দু সন্তান, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন…।”
(ঋণ – রোর বাংলা)