রবীন্দ্রনাথের আদেশে ৩৯ বছর ধরে যুগোত্তীর্ণ ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ লেখেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এর সমগ্র অভিধান ১০৫ খণ্ডে মুদ্রিত হয়

বীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Haricharan Bandyopadhyay) জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। জমিদারির খাতা লেখার কাজ করতেন। মনে মনে ভালোবাসতেন সংস্কৃত ভাষাকে। গোপনে গান লিখতেন। মনের মধ্যে স্বপ্ন ছিল অনেক। কিন্তু দরিদ্রের সন্তান, খেটে খেতে হবেই। তাই সেই স্বপ্নের কথা প্রথম জীবনে ভুলতেই বসেছিলেন হরিচরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পর্যন্ত ছিল না তাঁর। আপাতভাবে তাঁকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য কোনো বৃহৎ দায়িত্ব রেখে দিয়েছে। তিনি প্রথমে কালীগ্রাম পরগনায় সুপারিন্টেনডেন্ট পদে যোগ দিলেন। কিন্তু এই কাজে তাঁর সংস্কৃত ভাষাচর্চার সুযোগ কমে গেল। তখন পাতিসরের চারিদিকে ঘন বর্ষা! এই সময় একটি সংস্কৃত বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ চলছিল জোরকদমে। হয়তো এই বইটাই হরিচরণের একমাত্র কাজ হয়ে থাকতে পারত। কিন্তু ঠিক সেই সময় তাঁর জীবনে এলেন রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ তখন সদ্য বিশ্বভারতী (Visva-Bharati) প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই আশ্রমের জন্য সুযোগ্য শিক্ষক খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এমন শিক্ষক, যিনি হবেন পণ্ডিত, জ্ঞানপিপাসু এবং নির্লোভ। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষক অনুসন্ধানের একটি ভঙ্গি ছিল। বলা যায় মনের চোখ দিয়ে আচার্য অনুসন্ধান করতেন রবীন্দ্রনাথ। প্রথমে দেখে নিতেন দৈনন্দিনের দাবি মিটিয়ে মানুষটির মধ্যে উদ্বৃত্ত কিছু আছে কীনা! জমিদারির মহল্লা পরিদর্শন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ হরিচরণকে কাজে মগ্ন থাকতে দেখলেন রবীন্দ্রনাথ। বললেন, “দিনে সেরেস্তার কাজ করো, রাতে কী করো?” তখন হরিচরণ জানিয়েছিলেন যে রাতে তিনি সংস্কৃত ভাষার চর্চা করেন। একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপিও তৈরি আছে। রবীন্দ্রনাথ সেই পাণ্ডুলিপি চেয়ে পড়লেন। তারপর হরিচরণকে নির্দেশ দিলেন শান্তিনিকেতনে (Shantiniketan) আসার জন্য। রবীন্দ্রনাথ তখন ‘সংস্কৃত প্রবেশ’ বইটি লিখছেন। হরিচরণ শান্তিনিকেতন যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ সেই পাণ্ডুলিপি তুলে দিলেন হরিচরণের হাতে। যেন অভিষেক হল। এরপর হরিচরণ কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করলেন। শান্তিনিকেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করলেন এবং পাশাপাশি চলল বই লেখার কাজ।

তখন পাতিসরের চারিদিকে ঘন বর্ষা! এই সময় একটি সংস্কৃত বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ চলছিল জোরকদমে। হয়তো এই বইটাই হরিচরণের একমাত্র কাজ হয়ে থাকতে পারত। কিন্তু ঠিক সেই সময় তাঁর জীবনে এলেন রবীন্দ্রনাথ।

বিশ্বভারতীতে ক্লাস নিচ্ছেন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

রবীন্দ্রনাথ জহুরি ছিলেন। প্রকৃত হিরে চিনতেন। হয়তো তাই মাত্র ৩৭/৩৮ বছর বয়স্ক একজনকে অনায়াসে দিলেন অভিধান লেখার কাজ। হরিচরণের কাছে এ আদেশ দৈববাণীর মতো মনে হল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে অভিধান লেখার কাজ চলল গভীর অধ্যাবসায়ের সঙ্গে। শান্তিনিকেতনে হরিচরণকে সকলে সবসময় শব্দ নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতেই দেখতেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (Dwijendranath Tagore) হরিচরণের এই মগ্নতা নিয়ে মজা করে বলতেন,

“কোথা গো ডুব মেরে রয়েছ তলে,
হরিচরণ! কোনগরতে?
বুঝিয়াছি! শব্দ অবধি জলে
মুঠাচ্ছ খুব অরথে।”

রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী হরিচরণকে নিয়মিত অর্থসাহায্য করতেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে লিখে চলা এই দুরূহ কাজটি সমাপ্ত হওয়ার আগেই রাজা মণীন্দ্রচন্দ্রের মৃত্যু হয়। হরিচরণ একজন শব্দশ্রমিকের মতো জীবনের মূল্যবান সব মুহূর্ত অতিক্রম করেছেন। সঙ্গে বিরাট মহীরূহের মতো ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একবার অর্থনৈতিক কারণে হরিচরণকে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করে কলকাতার কলেজে কাজ নিতে হয়। কিন্তু অভিধানের কাজ তিনি চালিয়ে যান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে তিনি কাজ নিয়ে আলোচনা করে আসতেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। সবসময় তাঁরা একমত হননি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনোই কোনো মত চাপিয়ে দেননি হরিচরণের উপর। মনের স্বাধীনতা পেয়ে হরিচরণ নিজের মতো করে শেষ করলেন ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ (Bangiya Shabdokosh)। মাঝখানে শুধু গড়িয়ে গেল ৩৯ বছর। রবীন্দ্রনাথ আর হরিচরণের পরিচয়ের বয়সও প্রায় ষাট। হরিচরণ কথা খুব কম বলতেন। তাছাড়া তাঁর স্বভাবগত সংকোচের কারণে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বেশি পত্র বিনিময়ও হয়নি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে হরিচরণ বেশ দূরত্ব বজায় রাখতেন। হয়তো তাঁর মনে রবীন্দ্রনাথের জমিদার ভাবটি রয়ে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু হরিচরণের গুণমুগ্ধ ছিলেন। ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ছাড়াও হরিচরণ লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কথা’ ও ‘কবির কথা’। এই লেখাদুটি পড়লে রবীন্দ্রনাথ ও হরিচরণের সম্পর্কটি বোঝা যায়।

রবীন্দ্রনাথ জহুরি ছিলেন। প্রকৃত হিরে চিনতেন। হয়তো তাই মাত্র ৩৭/৩৮ বছর বয়স্ক একজনকে অনায়াসে দিলেন অভিধান লেখার কাজ। হরিচরণের কাছে এ আদেশ দৈববাণীর মতো মনে হল।

বঙ্গীয় শব্দকোষ – প্রথম পাতা

রবীন্দ্রনাথের দেওয়া অভিধান রচনার কাজ শেষ করেন পরম যত্নে। তারপর নিজ ব্যয়ে তার প্রকাশ ও মুদ্রণ করেন। সমগ্র অভিধান ১০৫ খণ্ডে মুদ্রিত যখন হয়, তখন রবীন্দ্রনাথ ইহলোকে নেই। তবে হরিচরণ নিজের সারাজীবনের তপস্যা দিয়ে বুঝিয়ে গিয়েছেন মহৎ কাজ মানুষকে অমরতা দেয়। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানটি তাঁকে অমর করেছে। সার্থক করেছে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকেও।

____

সহায়ক প্রবন্ধঃ
রবীন্দ্রসান্নিধ্যে হরিচরণ বন্দ্যোপাধায়, দেবাঙ্গন বসু

Developed by DXDasia