
রাজ্যের অধিকার কাড়তে আসছে জিএসটি আইন
জিএসটি নিয়ে বেশ একটা হইচই পড়ে গেছে। অনেকদিন ঘুমিয়ে থাকার পর হঠাৎ জিএসটি সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন বিল পাশ হয়ে গেল সর্বসম্মতিতে। ভারতীয় সংবিধানের ১২২-তম সংশোধন আসলে সংবিধানের অনেকগুলি ধারার সংশোধন হবে। যেমন-২৪৬, ২৪৮, ২৪৯, ২৫০,২৬৮,২৬৮এ, ২৬৯, ২৭০, ২৭১, ২৭৯, ২৮৬, ৩৬৬, ৩৬৮, ষষ্ঠ সিডিউল, সপ্তম সিডিউল প্রভৃতি। জিএসটির মূল কথা হল – কেন্দ্র ও রাজ্য এতদিন যে সব নানা ধরনের ট্যাক্স বসাতো, সেই সব গুলির পরিবর্তে এ বার থেকে একটিই ট্যাক্স চালু হবে। এবং সেটি হল জিএসটি বা গুডস্ অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স। অবশ্য আমাদের মতো বিরাট এবং বহু রাজ্যে বিভক্ত দেশে সব করের পুরোপুরি একীকরণ খুবই অসুবিধার ব্যাপার। নানা কারণে এবারও পেট্রো-পণ্য, মদ ইত্যাদি কয়েকটি জিনিসের উপর জিএসটি বসানো যাচ্ছে না। তবে অদূর ভবিষ্যতে পেট্রো-পণ্যের উপর জিএসটি বসানো যাবে বলে অনেক তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা।
আমরা এই প্রবন্ধে অবশ্য এ সব নিয়ে কথা বলছি না। আমাদের আলোচ্য হল, সারা দেশে একই ধরনের কর বসানো কী রাজ্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ নয়? জিএসটি যতদিন না চালু হচ্ছে, রাজ্যগুলো নিজের নিজের হারে ভ্যাট বা অন্য কয়েক ধরনের কর বসায়। সেই বাবদ আয় ও কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রাপ্ত কয়েক ধরনের কর বসায়। সেই বাবদ আয় ও কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রাপ্ত টাকা, এই দুই আয়ের উপরেই প্রধানত রাজ্যের বাজেট নির্ভরশীল। এ বার থেকে সে রকম বাজেটও রাজ্যগুলোর থাকবে না। আয় কত হবে তা জিএসটি কাউন্সিল সুপারিশ করবে, সংসদ ঠিক করবে। আয় বাড়ানো বা কোনও জিনিসে কর কমিয়ে সাধারণ মানুষকে সুবিধা দেওয়ার যে সুযোগ এখন রাজ্যগুলোর আছে, তা আর থাকবে না। আমাদের দেশ বহু-বার্ষিক, বহু-সংস্কৃতি, উন্নয়নের মাপকাঠিতে উঁচুতে-নীচুতে থাকা দেশ। একেকটি রাজ্য মোটের উপর একেকটি ভাষাভিত্তিক, যদিও সব রাজ্যেই সংখ্যালঘু ভাষাভাষী মানুষ রয়েছেন। আছে ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈচিত্র্যও। এত সব বিভিন্নতা সত্ত্বেও একই হারের কর বসানো কী দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পক্ষে বেমানান নয়? এই প্রশ্নের উত্তরে জিএসটি-র পক্ষ অবলম্বনকারীরা বলবেন কেন? জিএসটি কাউন্সিলে তো সব কেন্দ্র ও রাজ্যেরই প্রতিনিধি থাকবেন। তারা মিলে যে সুপারিশ করবেন তার ভিত্তিতেই সংসদ করের হার ঠিক করবে। তা হলে অসুবিধা কোথায়। হ্যাঁ, ঠিক এই জায়গাটাই আমরাও বলতে চাইছি। জিএসটি কাউন্সিলে কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রী চেয়ারম্যান হবেন, থাকবেন সব রাজ্যের প্রতিনিধিরা। কিন্তু সবার ভোটাধিকারের মান সমান নয়। মোট যত ভোট পড়বে, তার তৃতীয়াংশ কেন্দ্রের ভোট হিসাবে গণ্য হবে, বাকি ভোট উপস্থিত রাজ্যগুলির মধ্যে ভাগ হবে।
ব্যাপারটা বোঝার জন্য জিএসটি কাউন্সিলের একটা কাল্পনিক বৈঠকের কথা ভাবা যাক। ধরা যাক কেন্দ্র ছাড়াও সেখানে ২০টি রাজ্যের প্রতিনিধিরা আছেন। সবাই ভোট দিলে মোট ভোট পড়বে ২১টি। কিন্তু ভোট গণনার সময়ে এর এক-তৃতীয়াংশ বা সাত ভোট কেন্দ্রের বলে ধরা হবে। বাকি ১৪টি ভোট সব রাজ্যের। যদি রাজ্যগুলির মধ্যে এই ভোট সমান ভাবে ভাগ করা হয়, তবে একেকটি রাজ্যের ভোটের মান দাঁড়াবে ১৪ কে ২০ দিয়ে ভাগ করলে যা হয়, এক্ষেত্রে ০.৭ ভোট। কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী কোনও সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তিন-চতুর্থাংশ গরিষ্ঠতা চাই। অর্থাৎ ২১টি ভোট পড়লে ১৫.৭৫ ভোট চাই কোনও সিদ্ধান্ত হবার জন্য। এর মধ্যে ৭ ভোট কেন্দ্রের থাকায় আরও ৮.৭৫ ভোট কেন্দ্রের মতের পক্ষে পড়লেই সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। একেকটি রাজ্যের যেহেতু ০.৭ ভোট, তাই ১৩টি রাজ্যের ভোট কেন্দ্রের পক্ষে গেলেই সেটি সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ধরা হবে। এক্ষেত্রে বাকি ৭টি রাজ্যের স্বার্থ হানি হলেও ওই রাজ্যগুলির কিছু করার থাকবে না।
অন্য একদিকে থেকেও বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে। কেন্দ্রের মতকে কি হারানো সম্ভব? আমাদের উদাহরণে সিদ্ধান্ত হতে হলে ১৫.৭৫ ভোট চাই। কিন্তু সবকটি রাজ্যের মিলিত ভোট রয়েছে ১৪। তাই তত্ত্বগত ভাবেই কেন্দ্রের মতকে হারানো সম্ভব নয়।
সমস্যার আর একটি দিক হল, যদি কিছুতেই তিন-চতুর্থাংশ ভোট কোনও সিদ্ধান্তের পক্ষে না পড়ে। সেক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকালের জন্য অচলাবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে কেন্দ্রে যে দল ক্ষমতাসীন, তাদের হাতে যদি বেশির ভাগ রাজ্য সরকার থাকে, তবে ওই দল অন্যদের উপর স্টিমরোলার চালিয়ে দিতে পারবে। তখন সত্যিই বিপন্ন হয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো।
