ভারতে ৫৭ জনের সম্পদ দরিদ্র ৭০ শতাংশের সম্পদের সমান

নেহেরু-ইন্দিরার আমলে বৈষম্য কম, আচ্ছে দিনে বাড়ছে

কয়েকদিন ধরে মিডিয়াতে একটি বিষয় নিয়ে খুব লেখালেখি হচ্ছে। আর নরেন্দ্র মোদির সমালোচনাও চলছে খুব জোর। তা হল, দেশে বৃদ্ধির হার এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেছে। সবাই বলছেন, এটা হলো নোটবাতিলের ফল। কেন বৃদ্ধির হার কমল, তা নিয়ে এমনকী কেন্দ্রের কেষ্ট-বিষ্টুরাও অন্য কোনও রা কাড়তে পারছেন না। মুখ লুকোবার জন্য তাই অমিতভাই অমৃতবাণী শোনাচ্ছেন, এখন নোটবাতিলের ভালো ফল টের না পাওয়া গেলেও অনেক বছর ধরে তা নাকি পাওয়া যাবে। অমিতের কথায়, অর্থনীতির লাভ হবে দীর্ঘমেয়াদে। যাকগে যাক, মোদি মশাইয়ের পোষা টিয়া কি অন্য গান গাইবে? তাই ওই নিয়ে এই লেখা লিখতে বসিনি। আমি বলতে চাইছি ভিন্ন এক প্রসঙ্গে। সারা বিশ্ব জুড়ে যা নিয়ে খুব হইচই হচ্ছে। তা হলো, যতই আর্থিক উন্নতি হচ্ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে বৈষম্য। ভারতে তা এমন আকার নিচ্ছে, যে স্রেফ আর্থিক অসাম্যই সব সাফল্যকে বানের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্যের গতিবিধি
সম্প্রতি পিকেট্টি অ্যান্ড চ্যান্সেল (Thomas Piketty and Lucas Chancel) একটি দীর্ঘমেয়াদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। রিপোর্টটিতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে এখন পর্যন্ত ভারতে বড়লোকেদের আর্থিক অবস্থার কথা বলা হয়েছে। রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, ১৯২২ সাল থেকে ২০১৪ সময়কালে দেশের সবথেকে ধনী এক শতাংশ মানুষের হাতে সারা দেশের কত শতাংশ সম্পদ ছিল। যেহেতু ১৯২২ সালেই এ দেশে আয়কর নেওয়ার আইন চালু হয়, তাই ওই সময় থেকেই তথ্য পাওয়া সম্ভব। ১৯২২ সালে সবথেকে ধনীদের হাতে ছিল সম্পদের ১৩ শতাংশের মতো। ১৯৩০ পর্যন্ত তা মোটামুটি একই জায়গায় ছিল। কিন্ত হঠাৎই সেটা বাড়তে শুরু করে ওই শতকের তিরিশের দশকের গোড়া থেকে। বাড়তে বাড়তে ১৯৩৮-৩৯ সাল নাগাদ তা পৌঁছে যায় ২২ শতাংশে। অর্থাৎ, দেশের মোট সম্পদের ২২ শতাংশ ছিল মাত্র ১ শতাংশ বড়লোকের হাতে। মনে পড়বে, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে শুরু হচ্ছে, যুদ্ধের বাজারে মূলত ইংরেজ ব্যবসায়ীরা ও সেইসঙ্গে কিছু ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ফুলে ফেঁপে লাল হওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এটা যে অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও অন্যায় বৃদ্ধি, সেটা তারপরেই বোঝা যায়। পরের কয়েক বছরে ওই অনুপাত নামতে থাকে এবং দেশ স্বাধীনতা পাবার সময়ে এ দেশের ধনী ১ শতাংশের হাতে ছিল মোটামুটি দশ শতাংশের মতো সম্পদ।

নেহেরু জমানা
ভারতের নিজস্ব ধরনে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচায় অর্থনীতি সাজাতে চেয়েছিলেন নেহেরু। তাঁর আমলে বৈষম্য ততটা বাড়েনি। ১৯৬৪ সালে যখন নেহেরু মারা যান, তখন ওই অনুপাত সাড়ে বারো শতাংশের মতো ছিল। এর দু-এক বছর পরে শুরু হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধির আমল। ইন্দিরা একটার পর একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন অসাম্য দূর করতে। তাঁর আমলেই ধনীদের রমরমা সবথেকে কম ছিল। গত শতকের আশির দশকের গোড়ার দিকে সবথেকে ধনী ১ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল দেশের ৬ শতাংশ সম্পদ। এটাই সর্বনিম্ন। রাজীব গান্ধি জমানার শেষভাগ থেকেই ধীরে ধীরে উদারীকরণের অর্থনীতি চালু হয়। নরসিংহ রাওয়ের আমলে তা পরিষ্কার আকার পায়। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকায় নি উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ বা বিশ্বায়ন। আর সমানে বেড়ে চলেছে বৈষম্য। এটার সবথেকে নগ্ন আত্মপ্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে সম্প্রতি। ২০১৪ সালে এ দেশের ধনী ১ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল ২২ শতাংশ সম্পদ, যা ব্রিটিশ যুগের রেকর্ডকে ছুঁয়ে ফেলেছে। আরও সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ২০১৬-১৭ সালে তা ওই রেকর্ডকেও ছাপিয়ে গেছে। মোদি মশাইয়ের "সবকা বিকাশ'' যে এই চেহারা নিয়ে আসবে, তা কিন্তু অনেক আগেই বলেছিলেন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই।

গরিব লোকেদের হাল
এটা হিসেব করা হয় দেশে সবথেকে গরিব ৫০ শতাংশের আয় ধরে। এই হিসেবেও দেখা যাচ্ছে, নেহেরু-ইন্দিরার আমলেই গরিব লোকেদের হাতে তুলনামূলকভাবে বেশি সম্পদ ছিল। ১৯৫০ সালে এদের হাতে ছিল প্রায় ২০ শতাংশ সম্পদ। তা বাড়তে বাড়তে ইন্দিরা গান্ধি আমলের শেষদিকে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ শতাংশ সম্পদ। এটাই এ দেশে রেকর্ড। তার পরের কয়েক বছরে হাওয়া লাগে উদারীকরণের। গরিবের সম্পদও কমতে থাকে। ২০১৪ সালে তা দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে। সর্বশেষ তথ্যে বলছে, এই অনুপাত আরও কমেছে। মোদি মশাইয়ের আড়াই বছর শাসনের প্রায় শেষে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে অক্সফোর্ড কমিটি ফর ফেমিন রিলিফ বা অক্সফ্যাম এক রিপোর্টে সেটা দেখিয়েছে। সারা বিশ্বের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তারা বলেছে, পৃথিবীর মাত্র আটজন বড়লোকের হাতে যত টাকা আছে, তা গরিব ৩৬০ কোটি মানুষের মোট সম্পদের সমান! প্রসঙ্গত, জনসংখ্যার নিরিখে ৩৬০ কোটি মানুষ বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেক। ভারতের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এই দেশে অতি-ধনী ৫৭ জনের সম্পদ দেশের মোট জনসংখ্যার দরিদ্র ৭০ শতাংশের সম্পদের সমান। সবথেকে ধনী ১ শতাংশের হাতে রয়েছে ভারতের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ!

কী করে এটা সম্ভব হলো? অক্সফ্যামের রিপোর্ট বলছে, মূলত ট্যাক্স ফাঁকি, ট্যাক্সের আইনের ফাঁকফোকর বার করে কর না দেওয়া এবং সর্বোপরি এ দেশের থেকে সম্পদ সুইজারল্যান্ডের মতো নানা দেশে সরিয়ে ফেলার মধ্য দিয়েই এই বিশাল ধনীদের সৃষ্টি হয়েছে। একেবারে পরিষ্কার, সরকার ও কোনও কোনও রাজনৈতিক দল সহযোগিতা না করলে এটা সম্ভব হয় না। 
আবার ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর তথ্য অনুযায়ী ভারতের ২৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে। এর অর্থ হলো, তারা দু-বেলা দু-মুঠো খেতেও পায় না।

তাহলে জিডিপি নিয়ে এত হইচই কেন?
দু-এক বছর আগেও ভারতের গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিডিপি বিশ্বে সর্বোচ্চ ছিল। এমনকী তা চিনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তা নিয়ে অনেক ঢাক-ঢোল বেজেছে। এখন আবার চিন শীর্ষে চড়ে বসলেও ভারতের প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধিকে অর্থনীতির ছাত্ররা বেশ বেশিই বলবেন। এখানেই গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছেন এক দল অর্থনীতিবিদ। তাঁরা বলছেন, এই বৃদ্ধি আসলে গরিব-বড়লোকের বৈষম্যের বৃদ্ধি। নেহেরু-ইন্দিরার আমলে, যখন বৃদ্ধি কম ছিল, বৈষম্যও কম ছিল। বৃদ্ধি যত রকেট গতি পেয়েছে, বৈষম্যও সেই হারে বেড়েছে। চিনেও এই জিনিসই দেখা যাচ্ছে। আগেকার জিডিপি-র ধারণা এক মেরু বিশ্বে উদারীকরণ ও বিশ্বায়নের যুগে বদলে গিয়েছে। চাই নতুন মাপকাঠি, নতুনভাবে দেখার চোখ। নাহলে, শত কোটি মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে বড়লোক হবার পরিমাপ জিডিপি-র জয়গান গেয়ে আমরাও কি মানুষ থাকব আর?

Developed by DXDasia