‘ক্রিকেটের পিতামহ’ ডব্লিউ জি গ্রেস

১৯১৪ সালে, ৬৬ বছর বয়সে ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তিনি

স্থূল শরীর। কোমরের বেল্ট কোনো রকমে সামলে রেখেছে অবাধ্য ভুঁড়িটাকে। মাথায় ডোরাকাটা টুপি। ঘন গোঁফে ঢেকে গেছে ঠোঁট দুটো। বুকের নিচ পর্যন্ত ঝুলে থাকা লম্বা দাড়িগুলোর প্রায় সবই পেকে গেছে। চেহারায় বয়সের ছাপটাও পুরোপুরি স্পষ্ট। এমন অবয়ব আর যাই হোক কোনো ক্রিকেটারের হওয়ার কথা নয়, যে খেলায় ফিটনেস আর শারীরিক সামর্থ্যই মূল বিষয়। তবে ক্রিকেটে এমন ঘটনারও নজির আছে।

উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস। পেশায় একজন ডাক্তার হলেও ক্রিকেট ছিল তাঁর আত্মা। ১৯৪৮ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে জন্ম নেওয়া এ কিংবদন্তি ক্রিকেট দুনিয়ায় ‘দ্য ডক্টর’ কিংবা ডব্লিউজি নামেই যার পরিচয়। বর্তমান ক্রিকেটের বেশির ভাগ শটেরই আদি পিতা তিনি। ব্র্যাডম্যান, বোথাম, সোবার্স, শচীনরা যদি ক্রিকেটের সেরা ছাত্র হয়ে থাকেন তাহলে সেই স্কুলের শিক্ষকের নাম স্যার ডব্লিউ জি গ্রেস। আধুনিক ক্রিকেটের জনক বলা হয় তাঁকে।

১৮৬৫ সালে থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত প্রথম শ্রেণিতে গ্রেস ২৮টি দলের হয়ে রেকর্ড ৪৪ সেশনে মাঠে নেমেছেন। যে রেকর্ডে পরবর্তী সময়ে ভাগ বসিয়েছেন স্বদেশি জন শেরম্যান (১৮০৯-১৮৫২)। জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ১৯৮০ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ২২টি টেস্ট যার মধ্যে শেষ ১৩টিতে অধিনায়কত্ব করেছেন। ৩২.২৯ গড়ে তার আন্তর্জাতিক রান ১ হাজার ৯৮। দুটি সেঞ্চুরি এবং পাঁচটি হাফসেঞ্চুরি। বল হাতে উইকেট নিয়েছেন ৯টি। ১৮৯৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। তখন তার বয়স ৫০ বছর ৩২০ দিন। সবচেয়ে বেশি বয়সে অবসর নেওয়া তৃতীয় ক্রিকেটার গ্রেস। তার চেয়ে সাতদিন বেশি বয়সে অবসর নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্রেড আইরনমঙ্গার। বয়স্ক ক্রিকেটারদের তালিকায় সবার ওপরে আছেন ৫২ বছর ১৬৫ দিন বয়সে অবসর নেওয়া ইংল্যান্ডের উইলফ্রেড রুডিস।

তখনকার পিচ আধুনিক ক্রিকেটের মতো অতটা ব্যাটিং সহায়ক ছিল না। লো পিচে রান করাটা ছিল যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। তারপরেও প্রথম শ্রেণিতে ৮৭০ ম্যাচে ৩৯.৪৫ গড়ে ৫৪ হাজার ২১১ রানের মালিক গ্রেস। ১২৪টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি আছে ২৫১টি হাফসেঞ্চুরি। সর্বোচ্চ ৩৪৪। প্রথম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি রান করা ক্রিকেটারদের তালিকায় এ ডানহাতির অবস্থান পঞ্চম। ৮৩৪ ম্যাচে ৬১ হাজার ৭৬০ রান নিয়ে এ তালিকার শীর্ষে আছেন গ্রেসের স্বদেশি স্যার জ্যাক হবস।

ডানহাতি পেস বোলার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গতিতে লাগাম দেন, শুরু করেন মিডিয়াম পেস। তবে বোলিংয়ের কার্যকারিতা কমেনি এতটুকু বরং আরো ধারালো হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে বল হাতে ১৮.১৪ গড়ে গ্রেসের উইকেট দুই হাজার ৮০৯টি। প্রথম শ্রেণিতে তিনি দশম সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক। এ তালিকায় সবার ওপরে আছেন উইলফ্রেড রুডেস। এক হাজার ১১০ ম্যাচে চার হাজার ২০৪টি উইকেট নিয়েছেন এ বামহাতি স্পিনার। সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের মধ্যে অন্যতম গ্রেস ফিল্ডিংয়েও ছিলেন অসাধারণ। প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ক্যাচ নেওয়া দ্বিতীয় ক্রিকেটার তিনি। তাঁর ক্যাচের সংখ্যা ৮৮৭টি। তাঁর ওপরে আছেন স্বদেশি ক্রিকেটার ফ্রাংক উলে। তিনি নিয়েছেন এক হাজার ১৮টি ক্যাচ, ৯৮৭ ম্যাচে।

যৌবনে ক্রিকেটের পাশাপাশি ডাক্তার সাহেব ছিলেন একজন পুরাদস্তুর অ্যাথলেট। ১৮ বছর বয়সে ইংল্যান্ডের হয়ে সুরির বিপক্ষে অপরাজিত ২২৪ রানের ইনিংস খেলেন, খেলার মাঝপথে ম্যাচ ছেড়ে চলে যান ক্রিস্টাল প্যালেসে। চ্যাম্পিয়ন হন ৪০০ মিটার হার্ডলিংয়ে। তখনকার দিনে ইংল্যান্ডের সেরা অ্যাথলেটদের তালিকাতেও ছিল গ্রেসের নাম। ওয়ান্ডারার্স এফসির হয়ে ফুটবলও খেলেছেন গ্রেস।

১৯১৪ সালের ৮ আগস্ট সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন গ্রেস। ততদিনে বয়স তাঁর ৬৬। এলথামের হয়ে নর্থব্রুকের বিপক্ষে ড্র হওয়া ম্যাচটিতে ব্যাট কিংবা বোলিং কোনোটিই করেননি ক্রিকেটের এ মহারথী। পরের বছর ২৩ অক্টোবর হৃদরোগে মারা যান ক্রিকেটের এ পথপ্রদর্শক।

গ্রেসের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মজার ঘটনাও। একবার বোল্ড হওয়ার পর আম্পায়ারের দিকে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন, “আপনি জানেন কিনা জানি না, আসলে ঝোড়ো বাতাসেই স্টাম্পের বেলটা পড়ে গেছে”। প্রত্যুত্তরে ওই আম্পায়ার মুচকি হেসে বলেছিলেন, “আশা করি বাতাসটি আরেকটু ঝোড়ো গতি পেয়ে ডাক্তার সাহেবকে প্যাভিলিয়নে উড়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে”।

আরেকবার গ্রেস গেছেন গ্রামে খেলতে। সেখানকার এক অখ্যাত বোলার একেবারে প্রথম বলে আউট করে দিল গ্রেসকে! কিন্তু তিনি হাল ছাড়বেন কেন? “ট্রায়াল বল হিসেবে প্রথম বলটা ভালোই করেছ বাছা। বেশ তবে, এবার শুরু হোক আসল খেলা’ বলে আবারও গিয়ে দাঁড়ালেন উইকেটে!

আউট হতে একেবারেই ইচ্ছে করত না গ্রেসের। আম্পায়াররাও বোধহয় তাঁর এই ইচ্ছেটাকে সম্মান করতেন। ১৮৯৮ সালের এক ম্যাচে গ্রেসের বিপক্ষে একাধিকবার এলবিডব্লিউর আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হলেন ফাস্ট বোলার চার্লস কোর্টনাইট। শেষে রেগেমেগে একেবারে দুটো স্ট্যাম্পই দিলেন উপড়ে। বোল্ড! এরপর গ্রেসের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘ডক্, তুমি এবার নিশ্চয়ই মাঠ ছাড়বে? তখন আউট না হতে চাওয়ার হাস্যকর যুক্তি দিলেন গ্রেস, ‘দেখতেই পাচ্ছো একটা স্ট্যাম্প এখনো মাটিতে দাঁড়িয়েই আছে?’ ‘লোকে গাঁটের পয়সা খরচ করে আমার ব্যাটিং দেখতে এসেছে, নিশ্চয়ই তোমার বোলিং দেখতে নয়’—বোলারের উদ্দেশ্যে এই ছিল তাঁর বাণী! বোলার বেচারা আর কী করবে, বল নিয়ে পরের বল করতে প্রস্তুত হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায়ই ছিলো না।

(ঋণ – এনটিভি অনলাইন)

Developed by DXDasia