
শিল্পকে ভোগে পাঠানোর পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষ কী খাবেন এখন তা ঠিক ক’রে দিচ্ছে জ্যাঠামশায়ের গো-রক্ষক বাহিনী
আমাদের ছোটবেলায় বাড়িতে এক দূর সম্পর্কের জ্যাঠামশায় আসতেন প্রায়ই। তিনি এলেই আমরা ভাই বোনেরা তটস্থ থাকতাম। ওমুকটা খাবে না, তমুকটা পরবে না। তার নিদান না মানলেই বেমক্কা শাস্তি। একবার সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেয়েছিলাম বলে এক ঘণ্টা এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখে দিয়েছিলেন।
এখন কেন্দ্রের শাসকদল উত্তরপ্রদেশেও ক্ষমতায় এক জ্যাঠামশায়কে বসিয়েছেন। তিনি যোগী পুরুষ, মঠের মোহান্ত। যোগবলে গড়ে তুলেছিলেন হিন্দু যুব বাহিনী। এতদিন রাজ্যের পূর্বাঞ্চলে নানা খেলায় ব্যস্ত ছিল তারা। ভোটের আগে বড় এজেন্ডা ছিল কসাইখানা বন্ধ করার। গ্রিন ট্রাইবুনালের দোহাই দিয়ে ‘বে-আইনি’ কসাইখানা কথাটা যোগী বারবার উচ্চারণ করলেও তিনি জানেন, লক্ষনৌ পুরসভায় কসাইখানার জন্য কত নতুন লাইসেন্স এবং পুরনো লাইসেন্সের নবীকরণের আবেদন ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে অনন্তকাল। আর কেবল মহিষের মাংস খাওয়া বন্ধ করা প্রাথমিক লক্ষ্য থাকলেও এখন তো তার সৈনিকরা নিদান দিয়েছেন, মন্দিরের আশপাশে কোনও রকম মাংসের দোকান থাকাই চলবে না। তাই কেবল বড়া কাবাব নয়, চিকেন –মটন ও বন্ধ হতে চলেছে। সরকারি হিসেব বলছে মহিষের মাংস রপ্তানিতে ভারত প্রথম। ২০১৫-য় রপ্তানি করা প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের বিফের অর্ধেকটাই যোগায় উত্তরপ্রদেশ। চামড়া ইত্যাদি ধরলে ৫০ হাজার কোটি টাকার শিল্পের সঙ্গে জড়িত কম পক্ষে দেড় কোটি মানুষ। তো শিল্পকে ভোগে পাঠানোর পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষ কী খাবেন এখন তা ঠিক ক’রে দিচ্ছে জ্যাঠামশায়ের গো-রক্ষক বাহিনী। সাংস্কৃতিক বহুত্ব এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম রাজ্যে। জ্যাঠামশায়ের এ মত শাস্তিবিধান তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে দিল্লির তখত।
আমাদের এক মাস্টারমশায় চিন দেশে গিয়েছিলেন বৌদ্ধ দর্শন বিষয়ক সেমিনারে। এমনিতে মাছ-মাংস বড় একটা খান না, শারীরিক কারণে বহু বিধিনিষেধও আছে। কিন্তু পরদেশে গিয়ে কী আর অত বাছ-বিচার চলে। তবু যথা সম্ভব নিরামিষ খেয়েই চালাচ্ছিলেন বেশ। কিন্তু শেষ দিন সেমিনারের পরে উদ্যোক্তাদের আয়োজনে বিলাস বহুল হোটেলের রেস্তোরায় বুফে ডিনার। তিনি লক্ষ্য করলেন দুটি পদের সামনেই ভিড় বেশি হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের একজনের কাছে জানলেন ওই দুটি পদ খুবই দুর্লভ এবং সুস্বাদু। সারা দিনে কাজের ধকল ছিল। ক্ষুধার্ত মাস্টারমশায় দুটি পদের বংশ কৌলীন্য নিয়ে একটাও প্রশ্ন না তুলে সোজা প্লেটে তুলে নিলেন। তাঁর কথায়, ‘মাংস জাতীয় কিছু একটা খাচ্ছি বুঝলাম, কিন্তু অমন অতুলনীয় স্বাদ, কোনও দিন ভুলব না। তা উদরতৃপ্তির পর প্রশ্ন জাগল, কী খেলাম? রেস্তোরার ম্যানেজারকে মুগ্ধতার কথা জানিয়ে প্রশ্ন করতেই ভাঙা ভাঙা ইংরাজিতে সে যা বলল, শুনেই আক্কেল গুরুম। দুটো ডেলিকেসির একটা দুর্লভ প্রজাতির সাপের মাংস অন্যটা ততোধিক দুর্লভ ব্যাঙ-এর মাংস’। তো ফিরে আসার পর তাঁর মুখে এই অভিজ্ঞতার কথা শুনে জিজ্ঞেস করলুম, আগে জানলে খেতেন? তিনি বললেন, প্রচণ্ড খিদের মুখে বুফে টেবিলের পাত্রগুলিকে খাদ্যের আধার জ্ঞানেই দেখছিলাম, কী খাবার, সেই প্রশ্ন গঠন করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। আর খাবার পর যে সম্যক তৃপ্তি হয়েছিল সে কথা ভুলি কী করে। তবে ছোটবেলা থেকে ও দেশের অধিবাসীরা সাপ-ব্যাঙ খায় শুনে আসছি, তা বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই আমাদের বাড়িতে এমত সাধারণ জ্ঞান বিতরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু সে দিনের পর আমি তাঁদের খাদ্যাভ্যাসকে সম্মান করতে শিখলাম।
মাস্টারমশায় এখনও শিখে চলেছেন। আর জ্যাঠামশায়দের সযত্নে লালিত ‘সহিংস’ তত্ত্বের প্রয়োগ দেখতে দেখতে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি হাজার বছর…
