সমস্যা হচ্ছে ইতিহাসতো বড়বাজারের গদি নয় যে সেখান থেকে বাঙালির মেজাজ ও রুচির খানিক রাশ ধরা যাবে
মা দুগ্গা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পার্লারে গেছেন। গণেশ গদিতে শুয়ে মশগুল মোবাইলে। কার্তিক চুলের ছাঁট ঠিক করাচ্ছেন। আর লক্ষ্মী-সরস্বতী ব্যস্ত মেকআপে। এই ‘নির্দোষ’ মজাদার কার্টুন দেখেই চাড্ডিবাহিনীর তথাকথিত তাত্ত্বিকরা ‘মোছলমান নাপিত’ ব্র্যান্ড জাভেদ হাবিবের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেছেন। এতে নাকি হিন্দু আবেগে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। হাবিব কর্তৃপক্ষ অবশ্য বিতর্কে যাননি। আরেকটি বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বলেছেন তাঁদের সেই ‘নির্বিষ’ কার্টুনটি যদি কাউকে আঘাত করে থাকে তাহলে তাঁরা দুঃখিত। কিন্তু এই দুঃখ প্রকাশ কাদের পক্ষ থেকে এবং কাদের কাছে এই নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
কার্টুন কোনও কোনও ক্ষেত্রে ব্যঙ্গচিত্র হয়ে ওঠে। এই শিল্পমাধ্যমে সমাজের নানা ক্ষতর বিষমুখ দর্শিয়ে ক্ষমতার ব্যাডবুকে গিয়ে সাম্প্রতিক অতীতে কাউকে কাউকে জেলও খাটতে হয়েছে। তবে আলোচ্য বিজ্ঞাপনটি নেহাতই একটি বিজ্ঞাপন মাত্র, বলা যায় একটা রিলিফ। কৈলাশ থেকে জাভেদ হাবিবের পার্লারে সপরিবারে মাদুগ্গার অলস যাপনেই রয়েছে কার্টুনটির মজা ও মেজাজ। সর্বোপরি পার্লারের আরামে বাহন সিংহ পর্যন্ত তন্দ্রাতুর এবং উমা বেশ এনজয় করছেন তাঁর ছেলে-মেয়েদের কারবার। একটা হালকা ছুটির মেজাজ এসে যেন শরতের কাশফুল ফুটিয়ে দিচ্ছে হৃদয়ে। এই ছবি দেখেই হিটলার আজকের ধম্ম পুলিশরা। এতে নাকি বেজায় অপমান করা হয়েছে হিন্দুত্বকে। উত্তরপ্রদেশের এক নেতাতো এফআইআর করেই বসেছেন। একে ‘মোছলমান’ হাবিব, তায় দেবী দশপ্রহরণধারিনীকে নিয়ে কিনা ঠাট্টা!
আসলে ইউপিওয়ালারা বাংলায় খানিকটা কনভার্সনের মুডে এসেছে। বাঙালিকে তাঁর চিরকালীন হাস্যরসোজ্জ্বল অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করার খেলা কোনও চক্রান্ত নয়, একটা অভ্যাস, যা বারবার ভুলে যায় রামনবমীর অস্ত্রমিছিল কোনও মতেই বাঙালির ঐতিহ্য নয়। ইতিহাসের দার্শনিক ডিলদে তাঁর ‘মিনিং ইন হিসট্রি’ বইয়ে লিখেছিলেন ঐতিহ্যে হেলান দিয়েই মানুষ নিজের জীবনের অর্থ খুঁজে চলে এবং নিজের মূল্য নিরূপণ করে। এখন সমস্যা হচ্ছে ইতিহাসতো বড়বাজারের গদি নয় যে সেখান থেকে বাঙালির মেজাজ ও রুচির খানিক রাশ ধরা যাবে। যে বাঙালির রক্তে পূর্বপুরুষ উপস্থিত তিনি এই কার্টুনের সৌন্দর্যকে গায়ে মাখবেন, ছড়িয়ে দেবেন।
বাংলার পুজো আক্ষরিক অর্থেই উৎসব। পৃথিবীর সব থেকে বড় স্ট্রিট ফেসটিভ্যাল। আর বহু পুজো কমিটির মাথা থেকে গা পর্যন্ত রয়েছেন নানা সম্প্রদায়ের মানুষ সেই সুদূর অতীত থেকেই। তাই মা দুগ্গাকে হিন্দুত্ববাদীদের বাপের সম্পত্তি ভাবারও কোনও কারণ দেখছি না। যারা তরোয়াল আমদানি করে এবার বিজয়া দশমীতে মিছিল করার স্বপ্ন দেখছেন তাদের সঙ্গে অবশ্য এসব ইতিহাস পর্যালাপ করে লাভ নেই। তারা দুর্গাকে কোনও দিনও ঘরের মেয়ে উমা ভাবতে পারেনি, মা দুগ্গা তো নয়ই।
আর ‘কনভার্টেড’ বা যারা চাড্ডি প্রসেসে রয়েছেন তারা দেখুন ছাপান্ন ইঞ্চি বা তাদের এ রাজ্যের ক্রমবর্ধমান ঘোষবাবুরা কী বলছেন। তাদের তো আর যত মত তত পথ নেই। মতেও বিষ, পথেও বিষ। সেই বিষভাণ্ড মন্থন করে অমৃতের রাস্তা করে দিতে পারে ইতিহাস এবং দর্শনের রাস্তা। কিন্তু সে পথের সন্ধানেও যে তারা নেই, কেউ নেই। গাঢ় অন্ধকার দিয়ে বিদ্বেষের তুলি বুলিয়ে সৃষ্টি করে চলেছে মিথ্যে এক ভারতীয় সভ্যতা।