
এই সচেতনতা নির্মাণেরই অন্যতম প্রধান ধাপ ছিল ‘গার্ল পাওয়ার গ্রুপ’ তৈরি করা
নারী পাচার বেড়ে যাচ্ছিল উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে। কয়েক বছর আগের কথা। নারী পাচারের মূলে থাকত অভাবী পরিবারের অসহায়তা। তারই সুযোগ নিয়ে শহরে কাজ দেওয়ার ছুতোয় কিশোরী, যুবতী মেয়েদের পাচার করে দেওয়া হত অন্যত্র। অনেকসময় অবশ্য অপহরণও করা হত। এই নারী পাচার ঠেকাতেই এরপর উদ্যোগী হয় কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। শুধুমাত্র প্রশাসনিক সতর্কতা দিয়েই যে নারী পাচারের মতো ঘটনা আটকানো যাবে না, তা বুঝতে পেরে এঁদের উদ্যোগেই শুরু হয় স্থানীয় স্তরে সচেতনতা নির্মাণের কাজ।
এই সচেতনতা নির্মাণেরই অন্যতম প্রধান ধাপ ছিল ‘গার্ল পাওয়ার গ্রুপ’ তৈরি করা। অল্পবয়সী, কিশোরী, সদ্য যুবতী মেয়েদের সচেতন করে তোলাই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। আর মেয়েদের পরিবারের লোকজনেদের সচেতন করতে তৈরি হয়েছে ‘মেইন কেয়ার গ্রুপ’। নেপাল সীমান্তের খড়িবাড়ির বিন্নাবাড়ি এবং রানিগঞ্জ পানিশালি ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তের ফাঁসিদেওয়া গ্রাম এলাকায় তৈরি হয়েছে এই গ্রুপগুলি। ওই তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত ‘গার্ল পাওয়ার গ্রুপ’ তৈরি হয়েছে ৪০টি। একেকটি গ্রুপে ২৫ জন করে মেয়ে সদস্য। গ্রামের সীমান্তে নারী পাচার প্রতিরোধ করতে হলে কী কী করতে হবে তা তাদের শেখানো হচ্ছে।
এই শিক্ষারই একটি অঙ্গ হিসাবে আগামী মাস থেকে শুরু হতে চলেছে মেয়েদের নিয়ে ফুটবল খেলা। আগেই ঠিক হয়েছিল, মেয়েদের শারীরিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন খেলা তাদের শেখানো হবে। এখন যেহেতু বিশ্বকাপ ফুটবলের হাওয়া চলছে, তাই প্রথমে ফুটবল শেখানোরই কথা ভাবা হয়। উদ্যোক্তা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশনের’ তরফে আমোস শিরিং জানাচ্ছেন, তাদের তৈরি ‘গার্ল পাওয়ার গ্রুপের’ মেয়েরা ফুটবল খেলতে চায়। ওরা খেলাধুলায় পিছিয়ে। তাই ওদের ফুটবল খেলা শেখানো হবে। আর তার জন্য দুজন ফুটবল প্রশিক্ষকও নিয়োগ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সীমান্তবর্তী গ্রামের মেয়েদের সচেতন করতে বৃহস্পতিবার ফাঁসিদেওয়াতে ওই সংস্থা একটি সভার আয়োজন করে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘শিলিগুড়ি রাজবংশী রীপ মিনিস্ট্রি’র তরফে রোজলি দত্ত সেই সভায় মেয়েদের গুড টাচ, ব্যাড টাচ নিয়ে আলোচনা করেন। সপ্তাহে দু-তিন দিন ধরে তারা সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে গিয়ে এই ধরনের সভার আয়োজন করছেন বলে রোজলি জানান। এর ফলে শারীরিক নিগ্রহের মতো ঘটনা নিয়েও সচেতন হবে মেয়েরা। সীমান্তের গ্রামে নারী পাচার একটি বড় সমস্যা। কখনো টাকার প্রলোভন, কখন কাজ দেওয়ার নাম করে পাচারকারীরা অনেক মেয়েকে উধাও করে দিয়েছে। আবার নেপাল বা বাংলাদেশের মেয়েদের এপারে পাচার করতে সীমান্তের মেয়েদের কখনও টাকার বিনিময়ে কাজে লাগিয়েছে পাচারকারীরা। সেই পাচার রুখতেই কাজ করে চলেছে ‘গার্ল পাওয়ার গ্রুপ’ এবং ‘মেইন কেয়ার গ্রুপ’। অপর এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সিনি’র কর্মকর্তা শেখর সাহা বলেছেন, তাঁরাও নেপাল সীমান্তে অনবরত মেয়ে পাচারের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। তাঁদের অনবরত প্রচারের ফলে মেয়ে পাচার অনেকটাই কমেছে। ২০০৪ সালে যেখানে নেপাল সীমান্ত দিয়ে পাচারের সময় বছরে কুড়িটি মেয়ে উদ্ধার হয়েছে, এখন তা বছরে সাতটিতে এসে ঠেকেছে। তবুও তাঁদের অনবরত প্রচার চলছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলির ধারাবাহিক প্রচার ও নানাবিধ উদ্যোগের ফলে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নারী পাচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা যে আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা স্পষ্ট। এখন দেখার নারী পাচারের সংখ্যা এবং এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রবণতা এতে কতখানি কমে।
