তার কোলে ফুল পড়ে রয়েছে..সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা..

উত্তর কলকাতায় চলে আসার আগে পর্যন্ত আমাদের বাড়ি আর আমার মামার বাড়ি ছিল কাছাকাছি। মামার বাড়িতে দাদু, দিদু, মামু আর মাসিমণি। মাসিমণির বয়স আমার থেকে দশ বছর বেশি আর আমার মায়ের থেকে দশ বছর কম। ফলে আমার সঙ্গে অন্তত সম্পর্কটা ভাবের সময়ে ভাব, অন্য সময়ে সাপে নেউলে।এমনও হয়েছে, আমাকে দেখেই বলে উঠেছে, “ব্যস, হয়ে গেল! এসে গেছ?" আবার আমার সঙ্গেই একটাই মিষ্টি পান ভাগ করে খেয়েছে।

আমার দিদু আমার দেখা সবচেয়ে অন্যরকম মহিলা। আমি এত পরিপাটি করে কাউকে হাসিমুখে বছরের পর বছর..এমনকি অত্যন্ত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সংসার করতে দেখিনি। আর ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এত উজ্জ্বল আর আলোকপ্রাপ্তা নারীও খুব কম দেখেছি। দিদু অসাধারণ রান্না করতেন। রান্না যে খুব সামান্য উপকরণেও এক শিল্প হয়ে উঠতে পারে, তাও দেখেছি।  আমার মা, মাসি দুজনেই অত্যন্ত ভালো রাঁধিয়ে, তবু আমি এখনো নাক কুঁচকে বলি “কিছুই শেখোনি মায়ের কাছ থেকে।" সেলাই, উল বোনা, গান, আবৃত্তি…নিখুঁত নিপাট। আমি খুব ছোট বয়সে দিদুর মুখ থেকে প্রথম শুনি "কর্ণ কুন্তী সংবাদ" আর তাও বইয়ের পাতা না খুলেই।

আমার বাবার মারাত্মক দুর্ঘটনা হয়েছিল আমার পাঁচ বছর বয়সে। আমি তখন অনেকদিন দিদুর কাছে ছিলাম। দাদু ঠাম্মা তখন অন্য একটি পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে কলকাতার বাইরে এবং সেই মুহূর্তে কলকাতায় ফিরে আসার অবস্থাতেও ছিলেন না। সেই আমার হাতেখড়ি। দুপুরবেলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। দিদুর কোল ঘেঁষে। তার আগে তো ছড়া, ছবি, ঠাকুরমার ঝুলি, টুনটুনির বই। এক ঝটকায় আমার হাত আর মন ছুঁয়ে ফেলল "সঞ্চয়িতা''। আমি তখনও আধো আধো কথা বলি। "ক" উচ্চারণ করতে পারি না। বলি “ত"। দিদু আমার ঠোঁট আঙুলে টিপে অসীম অধ্যবসায়ে শেখালেন "ক" বলতে। কারণ, "কবিতা ঠিকমতো উচ্চারণ না করলে তা কবিতা হয়ে ওঠে না"। আমি বিহ্বল হয়ে পাতায় আঙুল রেখে পড়লাম, "আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমন পশিল প্রাণের "পর…" আমার সেই দুপুরের পর থেকে “না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ"

কবিতা চেনার শুরু দিদুর হাত ধরে। দিদু লিখতেনও। কবিতা লিখেছেন, গদ্যও। এখনো নিজের কথা..খাতায় লেখা আছে। সেই সামাজিক প্রেক্ষাপটে জীবনের আর মূল্যবোধের দলিল। আর অনেক প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তিরও।

এবার গান। তার আগে বলে নেওয়া ভালো…আমার মামারবাড়ি ছিল প্রায় সরাইখানা। কে কখন আসছে, খাচ্ছে, থেকেও যাচ্ছে…হিসেব নেই। মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিক অবস্থান ছিল, কিন্তু নিম্নবিত্ত মানসিকতা ছিল না। চিকিৎসা করাতে, পড়াশুনো করতে এমনকি সিনেমা দেখার পথে চা জলখাবার খেতেও এই বাড়ি। খুব ভালো গান গাইত আমার এক কোকিলকন্ঠী মাসি। সোনামাসি। আমার মায়ের জেঠতুতো বোন। ছোটবেলায় মাতৃহারা, তাই আমার দিদুই সব। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম পাওয়া। যেকোনো ধরনের গানেই অবাধ বিচরণ। গাইত যখন, সাত সুর যেন রামধনু রং ছড়িয়ে দিত। আমি শুনতাম চুপটি করে, আবিষ্ট হতাম। কিন্তু সোনামাসি আমাকে রবিগান চেনায়নি। চিনিয়েছিল ঠুমরী, দাদরা, কীর্তন, আধুনিক গান, নিধুবাবুর টপ্পা, খেয়াল… এই সব। বরং রবি ঠাকুরের গান গাইত আমার বড়মাসি, মায়ের জ্যাঠতুতো দিদি।

একদিন মামারবাড়ি গিয়ে দেখি, একটা নতুন মাসি এসেছে। কলকাতায় যোগমায়া কলেজে পড়তে। থাকবে এ বাড়িতেই। আত্মীয়তা তো আছেই লতায় পাতায়।  তিপুমাসি। আমার সঙ্গে ভাব হয়ে গেল। আমি গেছি দু'দিন থাকব বলে।

পরের দিন। দুপুরবেলা। মেঘ করেছে খুব। আমি ওই বছর পাঁচ- ছয় হবো হয়ত। কেউ বাড়ি নেই। কে কোথায় গিয়েছিল..মনে নেই। তবে বাড়িতে আমি আর তিপু মাসি। বাইরেটা কেমন ছায়া ছায়া ধূসর সোনালি আলো। একটু একটু সোঁদা–গন্ধ হাওয়া। অন্য কোথাও কি বৃষ্টি নেমেছে? এইরকম আকাশ দেখলে খুব মন খারাপ লাগে। আমি আর তিপুমাসি। তিপুমাসি আর আমি। জানালার ওপরে গুটিশুটি মেরে। এখনো চোখ বুজলেই ছবি। তিপুমাসি ছিপছিপে, শ্যামলা, কাটা কাটা চোখমুখ, ঠোঁটের ওপর একটা ছোট্ট কালো তিল, পিঠ ছাপিয়ে কোমর পেরিয়ে রাশি রাশি কালো রেশমি চুলের ঢল।পরনে একটা পেঁয়াজের খোসার রং তাঁতের শাড়ি, কালো পাড় আর কালো ব্লাউজ। কানে দুটি সোনার ফুল। হাতে এক গাছা করে সোনার রুলি। খালি গলায় কোনরকম আগাম জানান না দিয়েই গেয়ে উঠলো…"ওই জানালার কাছে বসে আছে, করতলে রাখি মাথা। তার কোলে ফুল পড়ে রয়েছে..সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা…"।

আমি অসাড় হয়ে গেলাম। বিবশ। আমার চোখের ওপরে মেঘ ভেসে যাচ্ছিল, পাখি উড়ে যাচ্ছিল.. মধুর স্বপ্নে প্রাণের ভিতরে অবিরাম বেজে যাচ্ছিল  সেই অদেখা অজানা অচেনা মধুর বাঁশিটি। রবিগান আমার পাঁচ বছরের চেনা জগত এক লহমায় অন্যরকম করে দিল। আমার অবচেতন ফিসফিস করে বলল…তখন বুঝিনি..এখন বুঝি…বলল, “যাও, তোমার যা সর্বনাশ হবার..তা হয়েই গেল…এই মেঘছায়া উদাস একলা দুপুরের নির্জনতায়’’।

Developed by DXDasia