
গাছ খুনিদের ধরার জন্য কোনও গোয়েন্দা দফতর বা কোনও ব্যোমকেশ নেই। শুরু হোক সব শহরে ওয়ার্ড ভিত্তিক গাছ সুমারি
রাতে কলকাতা থেকে বিমানবন্দরের দিকে যেতে প্রচুর গাছের গায়ে দেখতে পাই ইলেকট্রিকের তার জড়িয়ে আলো জ্বলছে। নানা রঙ-এর আলো। দেখতে ভালোই লাগে। কিন্তু এই যে সারা রাত ধরে গাছের গায়ে আলো জ্বলে, তাপ সৃষ্টি হয়, তাতে কি গাছের কোনও অসুবিধে হয়? সালোক সংশ্লেষ কোনও ভাবে ব্যাহত হয়? মানুষই যখন দারিদ্রসীমা পেরোতে নাজেহাল, তখন রাস্তার কুকুর, বা গাছ নিয়ে ভাবাটা অমানবিক। এমন মত অনেকেরই। কিন্তু গাছ, পুকুর, জলাশয়, পশু-পাখির কথা বাদ দিয়ে যে উন্নয়নের কথা, তা আজ সারা পৃথিবীতেই বাতিল হয়ে গেছে।
বছর ২৫ আগে কলকাতার মিডিলটন স্ট্রিটের কাছে একটা বাড়ির (সম্ভবত তিন তলা) দরজায় কলিংবেল টিপতে মলিন গেঞ্জি আর লুঙি পরে যিনি এসে দরজা খুললেন, তাঁর নাম প্রফুল্ল সেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তখন তরুণ সাংবাদিক। মনে হল এত দুর্নীতির এত কথা শুনেছি ভদ্রলোকের নামে, এক বার গিয়ে দেখে আসি। আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, থাকতেন এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে। নিজের কোনও বাড়ি ছিল না। ভদ্রলোক খেতে বসলেন। পাশের চেয়ারে আমি। দেখলাম একটু ভাত, ডাল, চারা পোনা আর একটা তরকারি। এই। নানা কথার মধ্যে ভদ্রলোক বললেন, আমি তখন বলেছিলাম গাছ লাগাতে, লোকে হাসত। এখন দেখছ তো, সবাই এ কথা বলছে। সত্যি প্রফুল্ল সেন হয়তো বেশি আগে বলে ফেলেছিলেন। তাঁর কথা জনমানসে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিন্তু তার পর থেকে তো বহু বছর ধরে আমরা তোতাপাখির মতো আউড়ে গেছি একটি গাছ একটি প্রাণ। গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান। মেদিনীপুর বনসৃজনে আন্তর্জাতিক পল গেটি পুরস্কারও পেয়েছে এই রাজ্য। কিন্তু কাজ কি খুব হয়েছে? মনে তো হয় না। গাছ-খুন নিয়মিত ঘটে চলেছে। সেই খুনিদের ধরার জন্য কোনও গোয়েন্দা দফতর বা কোনও ব্যোমকেশ নেই।
বাম ফ্রন্টের আমলে পুরমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যকে এই বিষয়ে এক বার জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ১৯৯৮-৯৯ সাল হবে। বলেছিলেন পাঁচ বছরের মধ্যে কলকাতায় এত গাছ লাগানো হবে যে হারিয়ে যাওয়া পাখি ফিরে আসবে। আসেনি। ২০১০ সালে যেদিন শোভন চট্টোপাধ্যায় কলকাতার মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন, সেদিন তাঁর এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। শোভনও একই কথা বলেছিলেন। হয়নি। অন্যদিকে সোডিয়াম ভেপার আলোর সংখ্যা এই শহরে বেড়েই চলেছে। অনেকেরই মত, এই আলো পাখির প্রজনন ক্ষমতাকে নষ্ট করে। করে কী না জানি না। তবে কথাটা যখন উঠেছে বিষয়টির সত্যতা আছে কী না তা খতিয়ে দেখা উচিত। ২০১৩-১৪ সালে বাইপাসের ধারে একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। তখন নিয়মিত দেখতাম একটা একটা করে রাস্তার ধারের অর্জুন গাছ মরে যাচ্ছে। ৫-৬টা অর্জুন গাছ ওই সময়ে মরে যেতে দেখেছি। বুঝতাম গাছগুলোকে খুন করা হচ্ছে। কিন্তু কী ভাবে বোঝা যাচ্ছিল না। এক দিন পুরসভার কনট্রোল রুমে ফোন করে খবরটা জানিয়েও ছিলাম। ওঁরাও বলেছেলেন দেখছি। কিন্তু দেখতে পারেননি। একই ভাবে ভিআইপি রোড, বিটি রোড, যশোর রোডের ধারেও বহু দিন ধরে অনেকেই দেখেছেন বহু গাছে মরে যাচ্ছে অজানা কারণে। তার পর অবধারিত ভাবেই দেখা যায় বেশ গুছিয়ে ট্রাকে চাপিয়ে ওই গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে। গাছের মৃত্যু চোখ খোলা রাখলে দেখতে পাবেন কলকাতার ব্রিগেড এলাকাতেও। বছর দেড়েক আগে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখেছিলাম বিশাল রুদ্রপলাশ গাছটা মরে গেছে। চোখে পড়ল আরও কয়েকটা গাছের কঙ্কাল। একটা কথা, হয়তো গুজব, চালু আছে বেশ কিছু কাল। বলা হয় গাছে গর্ত করে হিং ভরে দেয় খুনিরা। তাতেই গাছটা ধীরে ধীরে মরে যায়। দু’এক জন বটানিস্টকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। বলতে পারেননি। মৃত গাছ নিয়ে বিষয়টির তদন্ত হওয়া উচিত। সত্যি কোনও রাসায়নিক দিয়ে পরিকল্পিত ভাবে গাছ খুন করা হচ্ছে কি না! গাছ খুন করার সুপারি কিলারের অস্তিত্ব সত্যি আছে কি না!
মাস খানেক আগে চোখে পড়ল, সল্টলেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যে খালধারের রাস্তা চলে গেছে মহাসমারোহে গাছ কাটা চলছে। কেন, কারা কাটছে প্রশ্ন করে উত্তর মেলেনি।
বৃহত্তর কলকাতায় এখনই যেটা দরকার সেটা হল ওয়ার্ড ভিত্তিক গাছ শুমারি। গাছের নাম সহ ছবি দিয়ে এই গাছ গণনার রিপোর্ট ইন্টারনেটে আপলোড করা হোক। খোলা হোক একটি বিশেষ গাছ-কনট্রোল রুম, যা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। যেখানে গাছ কাটা সহ গাছের বিষয়ে যে কোনও অভিযোগ নাগরিকরা জানাতে পারবেন। এর সঙ্গে সরকার বিধানসভায় পেশ করে তার নির্দিষ্ট বৃক্ষরোপণনীতি ঘোষণা করুক। এবং নিয়মিত অডিট চালু হোক শহরের সবুজায়নের। সবুজ ধ্বংস হতেই থাকবে, আর বৃক্ষরোপণ দিবসে আমরা স্লোগান দিয়েই যাব, এই গাছেরও খাব না, তলারও কুড়োবো না নীতি থেকে আমাদের সরে আসার সময় হয়েছে।
