
‘শিল্পীরা সাবধান। মূঢ় জ্ঞানান্ধ ক্রিটিকরা কেবলমাত্র আঙ্গিক এবং দেশকাল নিয়ে বিচার করে'
হেমাঙ্গ বিশ্বাস- জর্জদা তোমার গান নিয়া কাগজে পত্রে ভীষণ বাদানুবাদ শুরু হইসে। সেই নিয়ে একটু কথা বললে বড় ভালো হয়।
দেবব্রত বিশ্বাস- ভাই হেমাঙ্গ, তুমি নিশ্চই আনন্দবাজার দেখসো। আর নারায়ণ চৌধুরী বইলা এক ভদ্রলোক তিনি পঁচিশে বৈশাখ, কাগজটার নাম হইল যুগান্তর, যুগান্তরে তিনিও লেখসেন। তা আমারে অনেক চিঠিপত্র দিসে। জিজ্ঞাসা করসে আপনি কিছু বলেন এ বিষয়ে। তা আমি অবশ্যি তাদের বলছি যে আমার এ বিষয়ে কিছুই বলার নাই। তবে একজন-দুজনক্বে, মানে যারা চিঠি দিস্যা বাইরে থেইক্যা, মানে কলকাতার৫ বাইরে যারা থাকে, অন্য কোন জেলাতে, সেইরকম লোকেদের আমি চিঠি দিসি দু-একটা। তার মধ্যে আমি লেখসি যে, আচার্য নন্দলাল বোস চিত্রশিল্পী শান্তিনিকেতনের, তাঁর নাম আপনারা নিশ্চই শুনেছেন। তিনি একটা চিঠি লিখসিলেন কানাইলাল সামন্ত বইলা এক ভদ্রলোকরে ৩০ মার্চ, ১৯৭৪ সনে। এখন সেই চিঠির শেষ লাইন ছিল- ‘শিল্পীরা সাবধান। মূঢ় জ্ঞানান্ধ ক্রিটিকরা কেবলমাত্র আঙ্গিক এবং দেশকাল নিয়ে বিচার করে। রস একটি অখণ্ড অতুলনীয় বস্তু। তাকে বিশ্লেষণ করা যায় না। শুধু উপভোগ করা যায় মাত্র’।
রাবীন্দ্রিকতা বিচার করবার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটের আমদানি হইসে। তিনি কি পাশ করসেন আমি জানি না তবে তিনি নানারকম ফতোয়া জারি করতেসেন। আমি যে গান গাই সেই গান যদি তার চিনা পরিচিত না হয়, তাইলে তিনি বলতেসেন যে যে এটা রবীন্দ্রনাথের রচিত কিনা? এবং যদি রচিত হইয়া থাকে প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। তা আমি তো ছোটবেলায় যাদের কাছে গান শিখছি, তারা আর কেউই আর বাইচ্যা নাই। আর যখন শিখসি তখন তো স্বরলিপি টরলিপির ব্যাপার আছিল না। কানে কানে আমরা শুনসি। তার মধ্যে হয়তো বদলাইয়া যায়। অনেক কিছুই হয়। তা আমরা কোনও প্রমাণপত্র চাইও নাই। আমাদের পকেটেও এখনও কোন প্রমাণপত্রও নাই, দলিলপত্রও নাই। সুতরাং আমি কি করে দেখাবো? তবে এই ব্যাপারে আমার ভয়ের কিছু কারণ নাই। কারণ অনেক গান বা আমি তো নগণ্য গায়ক, বড় বড় রবীন্দ্রসংগীতের ওস্তাদেরা যা রেকর্ড করসেন সেইগুলি অনেকগুলি আমি দেখছি স্বরলিপির ধারের কাছেও নাই। সেই গানগুলির নাম করলে তোমরা টের পাইয়া যাইবা। সুতরাং কোন শিল্পীর বিরুদ্ধে আমি কইতে চাই না। সেই গানগুলির নাম আমি কমুনা তোমরা নিজেরাই বাইছ্যা লইও, দেখবা মিলাইয়া স্বরলিপির সাথে মেলে না। তা তাদের ভসঙ্গে কোন গান করনের সময় কোন দলিল পত্র চায় নাই সি ম্যাজিস্ট্রেট। আমার বেলা চাইতাসেন। তা শাস্তি যদি পাইতে হয় আমাদের সকলেরই পাইতে হইবে।সুতরাং আমার কোনও ভয়ই নাই। তবে একটা ভয় আমার আছে, সেইটা হইল সেদিন ১৩ এপ্রিল আকাশবাণী কর্মীদের একটা অনুষ্ঠান হইতাছিল, সেই অনুষ্ঠানে আমি যখন গান গাইতাসি সেই ম্যাজিস্ট্রেটরে দেখলাম পিছন ফিরা কিসব কইতাসে কার সঙ্গে যেন। তারপর গানটান শেষ হইয়া গেল বাইর হইয়া আমি জিজ্ঞেস করসিলাম যে কি কইতাসিলেন উনি, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব? তখন কেউ কইতে চায় না, তবে ফট করে একজন কইল যে উনি বলছিলেন-‘ওকে স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক। তা আমি বললামতা আমারে হুকুমটা দিলেন না কেন? বলে-‘আপনি তখন গান গাইছেন। কি করে দেওয়া যাবে’? তা যাই হোক। এইটাই একটা ভয় সেই ম্যাজিস্ট্রেট যদি আইজ আমাদের সামনে আছেন কি না জানিনা, যদি থাকেন আর যদি হুকুম দেন যে ‘স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক’ তাহলে আপনেরা আমাকে রক্ষা করবেন কিনা?
(১৯৭৪-এ নেওয়া সাক্ষাতকারের নির্বাচিত অংশ)
