বন্যায় ডুবছে বাংলা, কলকাতা নির্বিকার কেন?

ত্রাণ সংগ্রহে যে কলকাতা পথে নামত, সেই কলকাতা কোথায়?

গোটা রাজ্যে ভয়ঙ্কর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েক কোটি মানুষ। মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। ডিভিসি-র জল ছাড়ায়, বাধ ভেঙে, প্রবল বৃষ্টিতে রাজ্যের, বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলা প্লাবিত। ইতিমধ্যেই জলবাহী রোগ দেখা দিয়েছে। সরকার ত্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু তবু ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভের খবর আসছে। বহু ছাত্রছাত্রীর বই নষ্ট হয়ে হয়ে গিয়েছে জলে। বিভিন্ন জায়গায় এখনও বহু মানুষ জলবন্দি। উদ্ধারে বায়ুসেনাকে নামানো হয়েছে। স্মরণকালে পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৮-এর বন্যাই ছিল সব থেকে ভয়ঙ্কর। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন ভয়াবহতার নিরিখে এবারের বন্যা ৭৮-এর বন্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। ফসল এবং সম্পত্তির ক্ষয় ক্ষতি কতটা তা হয়তো শীঘ্রই জানা যাবে। তবে তার পরিমাণ যে সর্বকালের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে, তা মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যেই স্পষ্ট।

এই পরিস্থিতিতে একটা বিষয় লক্ষণীয়। গ্রাম বাংলার এই দুর্দিনে কলকাতা কোথায়? কোথায় সোস্যাল নেটওয়ার্কের সচেতন সক্রিয় সদস্যরা? অতীতে দেখা গেছে, গ্রাম বাংলার বন্যায় কলকাতাকে রাস্তায় নেমে পড়তে। পাড়ায় পাড়ায় চলত ত্রাণ সংগ্রহ। ট্রাক নিয়ে বেরিয়ে পড়ত একের পর এক ক্লাব। শিল্পী কবি বুদ্ধিজীবী টলিউড, কেউই পিছিয়ে থাকত না। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা ত্রাণ নিয়ে চলে যেত দুর্গম এলাকায়। চাল, ডাল, চিড়ে, গুড়. খাতা, পেনসিল, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ওসুধ, ওআরএস, জিওলিন, বিড়ি কী না থাকত ত্রাণের তালিকায়। সঙ্গে পোশাক, প্লাস্টিক ইত্যাদি। এখন আমাদের সঙ্গে সদাংবাদিকতা করছেন এমন বহু মানুষ আছেন যাদের ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে পড়ুয়া বয়েসে।

সেই সাংবাদিকদের কারও কারও মত, এই বদলটা এক দিনে হয়নি। সময়ের সাথে কলকাতার মানুষের পাশে থাকার ইচ্ছেটা কমছিল। কমছিল যে তা বোঝাও যাচ্ছিল। পাশের রাজ্য নেপালে ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের সময়েও দেখা গিয়েছিল নির্বিকার কলকাতার ছবি। কিন্তু এবারে যেন একেবারেই অদৃশ্য কলকাতার মানবিক মুখ। কেন এই পরিবর্তন? কেউ কেউ বলছেন, গ্রামের অবস্থা আর আগের মতো নেই। এখন গ্রাম বাংলা বদলে গিয়েছে। এখন আর অতটা ত্রাণের দরকার হয় না। ঘরে ঘরে টিভি, দ্বারে দ্বারে বাইক। গ্রাম বাংলা অনেক দিন ধরেই আর ‘আগের’ মতো নেই। অতটা ত্রাণের তাদের আর দরকার নেই। কারও মত, গ্রামের মানুষ আর আগের মতো পুরোনো পোশাক নিতে চায় না। কথা গুলো হয়তো আংশিক সত্যি। কিন্তু সবটা কি সত্যি? তাহলে এই যে বিপুল সংখ্যক দারিদ্রসীমার নীচের মানুষ, দু’টাকা কিলো চাল, ১০০ দিনের কাজ ছাড়া যাদের চলে না, এমন কোটি কোটি সংসার, তারা এই বন্যার ক্ষতিতে বিপর্যস্ত নন? তাহলে ত্রাণের দাবিতে সাংসদকে ঘিরে কেন বিক্ষোভ হল? আর যদি মেনেও নেওয়া হয় তর্কের খাতিরে গ্রাম বদলে গিয়েছে, যেটা বাস্তবে সত্যিও অনেকটা, তা দিয়ে কি কলকাতার এই নীরবতার ব্যাখ্যা করা যায়?

তাহলে? এত দিন একটা ধারণা ছিল, জন্ম মৃত্যু বিবাহ, এই তিন ঘটনায় মানুষ মানুষকে পাশে চায়। এখন নার্সিংহোম, ক্যাটারার, ডেকরেটর টাকার বিনিময়ে এই সব কাজ নিখুঁত ভাবে করে দিচ্ছে। কোমরে নতুন গামছা জড়ানো প্রতিবেশীকে আর দরকার হয় না বিয়েবাড়িতে। আর এই খরচটা মধ্যবিত্তের নাগালে চলে এসেছে। যেমন মধ্যবিত্ত আর বেড়াতে গেলে জিওলিনের বোতল নিয়ে যায় না। কারণ মিনারেল ওয়াটার এখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। এসবই ভালো। কিন্তু এই যে মূল্য ধরে দিলেই আর প্রতিবেশীর উপর নির্ভর করতে হয় না, তাতে কী আমরা অন্যের কথা ভাবতে ভুলে যাচ্ছি? তাই কি বন্যা নিয়ে উবেরে, এসি বাসে, ওলায় আর কোনও আলোচনা নেই! আলোচনা নেই চায়ের দোকানে, কফি হাউসেও। গোরু, অসহিষ্ণুতা, নীতীশ, অচ্ছে দিন, মোর্চা ও বাঙালি নিয়ে সদা জাগ্রত সোস্যাল নেটওয়ার্কে কোটি কোটি বন্যাকবলিত মানুষের যে অনুপস্থিথি দেখা যাচ্ছে, তাকে কী ভাবে ব্যখ্যা করা যায়? মনোবিদ ডঃ বাসুদেব মুখোপাধ্যায়ের মত, দেশে সামগ্রিক ভাবে একটা রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে। এর শেষ কোথায় মানুষ জানে না। কোনও স্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ সামনে নেই। সব মিলিয়ে, কিছুই হবে না, কিছু করে কোনও লাভ নেই, এমন একটা মানসিকতা গ্রাস করছে অনুভূতিপ্রবণ মানুষকে। তাকে নিস্পৃহ, নির্বিকার করে দিচ্ছে।

Developed by DXDasia