পাঁচদিন পাঁচ বিগ্রহের দোল জয়নগরে

দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চলে আজও বর্তমান আশ্চর্য এক প্রথা

প্রাচীনকালে সমবত্ বা নববর্ষ শুরু হত ঋষি মনুর জন্মদিন ফাল্গুনী পূর্ণিমাতে। গোপভূমে এই অনুষ্ঠান ছিল খুব আড়ম্বরপূর্ণ। গিরি গোবর্ধন ও গো-ধনকে ঘিরে এদিন নানা মাঙ্গলিক আচার পালন করা হত। প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে আবার এদিন মদনোত্সব। রঙের খেলায় আদিরসে মেতে উঠবার বিশেষ দিন ছিল এটি। প্রচলিত এক গল্পে জানা যায়, রাধা গোঠবিহারী গোপালকে তাঁর কৃষ্ণবর্ণের কথা বলে গোপিনীদের মাঝে উত্যক্ত করতেন। এক সমবতের দিন রাগান্বিত কৃষ্ণও নাকি রাধার গোরা মুখ রাঙিয়ে দিয়েছিলেন নিজ গাত্রবর্ণের কালো রঙে। অন্য এক কাহিনীতে পাওয়া যাচ্ছে, শিব তাঁর স্ত্রী কালীকে কৃষ্ণবর্ণের জন্য সমাদর করতেন না, দেবসমাগমে তাঁকে আড়ালে রাখতেন। মনোকষ্টে কালী তাই শিবকে বলেছিলেন, পরের জন্মে আমি হব গৌরী আর তুমি হবে কৃষ্ণবর্ণ। শিবকালীর এই রাধাকৃষ্ণ অবতার সে কারণেই। প্রাচীন সমবত এবং মদনোত্সবের বিবর্তিত রূপ দোল তথা হোলিতে রাধাকৃষ্ণের প্রাসঙ্গিকতা এসেছে এভাবেই।

মথুরা ছেড়ে কৃষ্ণ যখন দ্বারকাতে চলে এলেন তখন রাধার বিচ্ছেদ বেদনা তাঁকে বড় পীড়া দিয়েছিল। গোপিনীরা প্রত্যেক বছর কৃষ্ণকে সমবতের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান কিন্তু সময়াভাবে দ্বারকাধীশ কৃষ্ণের তা হয়ে উঠত না। বেশ কিছুকাল পর এক সমবতের দিন কৃষ্ণ উপস্থিত হলেন মথুরাতে রঙের উত্সবে। হোরির জন্য আনন্দকাননে ফুল দোলনা, রঙের ডালি, ফাগুয়ার সমস্ত আয়োজন প্রস্তুত কিন্তু বিশাখা, ললিতা, শ্রীচিত্রা, চম্পকলতা, শ্রীরঙ্গ, তুঙ্গবিদ্যা, ইন্দুরেখা প্রভৃতি রাধার অন্তরঙ্গ সখিদের অনেকেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রিয় সখা কৃষ্ণের সঙ্গে বহুকাঙ্খিত সেই রঙের উত্সবে মেতে উঠতে পারল না। শারীরবৃত্তীয় সেই স্বাভাবিক অসুস্থতা কেটে গেলে পর সেইসব গোপিনীদের সঙ্গে ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু কৃষ্ণ দ্বিতীয়া থেকে দ্বাদশী এই তিথিগুলিতে দোল খেলে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেছিলেন। পৌরাণিক এই আখ্যান মেনে বহুস্থানে দ্বিতীয়া থেকে পঞ্চমী, সপ্তমী এবং দ্বাদশী ইত্যাদি তিথিগুলিতে পৃথক দোল অনুষ্ঠিত হয়। নিম্ন দক্ষিণবঙ্গের প্রাচীন জনপদ জয়নগর মজিলপুরে এই রীতি মেনে সেখানকার প্রাচীন পাঁচটি রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ ঘিরে ফাল্গুনী পূর্ণিমার প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী এই পাঁচদিন পাঁচ বিগ্রহের দোল উত্সব অনুষ্ঠিত হয়।

পূর্ণিমায় চাঁচড় অনুষ্ঠিত হবার পর প্রতিপদে প্রথম দোলটি হয় মজিলপুরের জমিদার দত্তবাড়িতে। দত্তদের আদিপুরুষ চন্দ্রকেতু দত্ত ছিলেন যশোহররাজ প্রতাপাদিত্যের কায়স্থ মুন্সী। মোঘলদের কাছে প্রতাপের পরাজয়, বন্দী এবং মৃত্যুর পর তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের ধরপাকড় শুরু হয়। সুযোগসন্ধানী মগ ও আরাকান জলদস্যুরা নদীতীরস্থ গ্রামগুলিতে এই সময় লুঠপাঠ ও অত্যাচার চালাতে শুরু করে। লোকশ্রুতি মোঘল সৈন্যরা এই চন্দ্রকেতুকে ধর্মান্তরিত করতে চেয়েছিল। জাত-ধর্ম রক্ষার্থে রাতারাতি সঙ্গোপনে যশোরের চাঁপাকুলি গ্রাম থেকে তাঁর যজ্ঞপুরোহিত শ্রীকৃষ্ণ উদ্গাতা ও কুল পুরোহিত রঘুনন্দন পোতাকে সঙ্গে নিয়ে (১৬০৬ খ্রীঃ মতান্তরে ১৬১১ খ্রীঃ) জয়নগরে আদিগঙ্গার পূর্বতীরে মজাগর্ভে জল-জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে এসে আত্মগোপন করেন। কুলদেবতাকে ভোগ-শীতল না দিয়ে গৃহস্থ অন্নজল গ্রহণ করতে পারতেন না। তাই এই তিনজনই তাঁদের কুলদেবতাকে সঙ্গে করেই এনেছিলেন। চন্দ্রকেতু সঙ্গে আনেন কুলদেবতা গোপালজীউ, শ্রীকৃষ্ণ উদ্গাতা তাঁর ইষ্টদেবী ব্রহ্মময়ী তারা এবং রঘুনন্দন আনেন তাঁর আরাধ্য কষ্টিপাথরের শ্যামরাইকে।

এই তিন পরিবার এবং পরবর্তীকালে তাদের প্রয়োজনে আসা লোকজনদের নিয়ে আদিগঙ্গার মজা গর্ভে জঙ্গল হাসিল করে যে জনপদটি গড়ে ওঠে তা মঞ্জুলপুর অপভ্রংশে মজিলপুর নামে খ্যাত হয়। নলেন গুড়ের মোয়া এবং দারুময়ী দেবী জয়চণ্ডীর অধিষ্ঠানের সূত্রে বিখ্যাত দক্ষিণবঙ্গের সমৃদ্ধ জনপদ জয়নগরের দোসর গ্রাম মজিলপুরের দত্তবাজারের নিকটেই সুবৃহৎ অট্টালিকাটি প্রাচীন দত্ত জমিদারবাড়ি। মূল রাস্তার পাশেই অতীত ঐতিহ্যের স্মারক সিংহদুয়ার। তারপর ডাইনে প্রশস্থ অঙ্গনে সবুজ বাগিচাশোভিত শ্বেতশুভ্র দোলমঞ্চ ও শিবমন্দির। জমিদার বাড়ির অন্দরে অপূর্ব পঙ্খের কারুকাজ করা সুবৃহৎ আটচালা গোপালজীউ মন্দির। চন্দ্রকেতু দত্তের নাতির ছেলে রামচন্দ্র দত্তের হাতে জমিদারির সূচনা। তিনিই রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর আমলে দোল, রাস ও দূর্গাপূজা সাড়ম্বড়ে শুরু বলে কথিত। জনশ্রুতি চন্দ্রকেতু দত্তের নিয়ে আসা সোনার গোপালজীউ চুরি গেলে রাধাকৃষ্ণ দত্ত বৃন্দাবন থেকে পদব্রজে অষ্টধাতুর গোপালজীউ এনে প্রতিষ্ঠা করেন। এই গোপালজীউকে ঘিরে হয় প্রথম দোল। আগের রাতে চাঁচড়ে বাজিপোড়ানো অনুষ্ঠানের পরদিন দেবদোলে বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হয় দোলমঞ্চে। সারাদিন এখানে বিগ্রহের পূজাপাঠ হয় এবং ভক্তরা বিগ্রহ আবীরে রাঙিয়ে আশীর্বাদ নেয়। ছোট্ট একটি মেলাও বসে।

পরদিন দ্বিতীয়ার দোল পোঁড়া বাড়িতে। চন্দ্রকেতু দত্ত তাঁর যে পুরোহিত রঘুনন্দন পোতাকে সঙ্গে আনেন তাঁদের বাড়িতে দোল এদিন। পোতা উচ্চারণবৈকল্যে পোঁড়াতে পরিণত হয়েছে। এঁদের নিত্যপূজিত কষ্টিপাথরের কৃষ্ণ ও অষ্টধাতুর রাধা পদব্রজে বৃন্দাবন থেকে আনা বলে কথিত। পোতা-রা দাক্ষিণাত্য বৈদিক ব্রাহ্মণ। উপাধি ভট্টাচার্য্য। লোকায়ত নানা গল্পগাথা রয়েছে এই বিগ্রহকে ঘিরে। পোঁড়া বাড়ির দোলে প্রচুর লোকজন আসেন এবং মেলাও বসে।

দুর্গাপুরের সরখেলবাড়ির শ্যামসুন্দরজীউকে ঘিরে হয় তৃতীয়ার দোল। দুর্গাপুর মোড় পেরিয়ে উত্তরে একটু এগোলেই মূল রাস্তার পাশে আটচালা প্রাচীন দালান মন্দির। বাইরে অঙ্গনে সুউচ্চ দোলমঞ্চ, তারপর মন্দিরের সিংহদুয়ার। গর্ভগৃহে অষ্টসখী পরিবৃত নিমকাঠের রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ। বিগ্রহটি প্রতাপাদিত্যের কাকা বসন্তরায়ের রাজবাড়ি খাড়িগ্রাম থেকে আনা বলে কথিত। পূজারি সরখেলরা এই বিগ্রহ মগেদের অত্যাচারের ভয়ে এখানে নিয়ে আসেন। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। সাড়ম্বড়ে অনুষ্ঠিত হয় এই দোল। জমজমাট মেলাও বসে।

 

চতুর্থীর দোল বনমালীপুরের মদনমোহনকে ঘিরে। অনিন্দ্যসুন্দর এই রাধাকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ। জয়নগর স্টেশন থেকে মিনিট পনেরোর পথ এই মন্দির। সাতপুরুষ ধরে এই বিগ্রহের সেবাপূজা করছেন চক্রবর্তীরা। জানা গেল এই বিগ্রহটিও খাড়িগ্রাম থেকে আনা। টেরাকোটার অলঙ্করণশোভিত প্রাচীন মন্দির নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর নবরূপে সংস্কার হয়েছে। মন্দিরের পাশেই দোলমঞ্চ। মন্দিরের সামনে খোলা মাঠে মেলা বসে এবং অষ্টপ্রহর নামগানে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়। প্রতিবছর দোলের পর মদনমোহন ও রাধারাণীর বিগ্রহের অঙ্গরাগ করানো হয়।

পঞ্চমীতে শেষ তথা মূল দোলটি হয় জয়নগরের সর্বপ্রাচীন রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ রাধাবল্লভজীউকে কেন্দ্র করে। এটি বসন্তরায়ের গৃহদেবতা বলে কথিত। মগ দস্যুরা একবার বসন্তরায়ের বাড়িতে ডাকাতি করতে এসে এই বিগ্রহটিকে বহুমূল্যবান মনে করে চুরি নিয়ে যায়। নদীর খাড়ির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় এটি কাঠের বোধ হলে তারা নৌকা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বনের মধ্যে। শৃগালের দল তা মনুষ্যদেহ ভেবে টেনে নিয়ে যায় আরও দূরে। পরদিন সকালে বসন্তরায়ের আত্মীয় তথা জয়নগরের জমিদার মধুসূদন মিত্র গিয়ে তাঁদের পুরোহিত রত্নেশ্বর সরখেলকে নিয়ে বিগ্রহ উদ্ধার করে জয়নগরে তাঁর জমিদারিতে প্রতিষ্ঠা করেন।

মিত্রগঙ্গার পাড় ধরে উত্তরে এসে গঞ্জের বাজার থেকে ডানদিকে গেলে রাধাবল্লভতলা। সামনে প্রশস্থ অঙ্গনে সুবৃহৎ দোলমঞ্চ। পেরিয়ে দু-পা গেলে মন্দিরের সিংহদুয়ার। তারপর সুদৃশ্য এক নাটমঞ্চ। জগমোহন থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমান প্রাণজুড়ানো যুগল মূর্তি। বিগ্রহটি নিমকাঠের। ১লা বৈশাখ গোষ্ঠ এবং ফাল্গুনী পূর্ণিমার পঞ্চমীতে দোল ও ন-দিনের মেলা মূল উত্সব। প্রতিবছর মিত্ররা নিমন্ত্রিত হয়ে আসেন সরখেল বাড়িতে। দোলের আগের রাতে চাঁচড়ে বিগ্রহ গর্ভগৃহে থেকে দালানে আনার জন্য। এরপর যুগলবিগ্রহ চতুর্দোলায় চাপিয়ে শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয় শেখের দিঘির পাড়ে। সেখানে কীর্তন এবং নৃত্যের সঙ্গে মেড়াপোড়ানোর অনুষ্ঠানে চলে রঙিন আতসবাজির প্রদর্শন। পরদিন দেবদোল। মন্দিরের পাশে প্রাচীন এক কদমগাছে এমন অসময়েও প্রতিবছর নিয়ম করে একটি বা দুটি কদমফুল ফোটে। সকালে ভোগ-রাগের পর রাধাবল্লভের কর্ণমূলে তা গ্রথিত করে বিগ্রহ নিয়ে যাওয়া হয় দোলমঞ্চে। ভক্তরা দলে দলে গিয়ে শ্রীবিগ্রকে আবীরে রাঙান এবং প্রতি প্রহরে বিগ্রহে দোল দিয়ে আসেন। সন্ধ্যার মুখে বিগ্রহ নামিয়ে আনা হয় মূল মন্দিরে। বিগ্রহ হিসেবে শ্যামসুন্দরজীউ জয়নগরের সবচেয়ে প্রৌঢ়। ১লা বৈশাখ গোষ্ঠে আশপাশের গ্রামগুলোর বনেদি বাড়ির প্রাচীন বিগ্রহগুলো নিমন্ত্রিত হন। এদিন বিকাল থেকে মিত্রদের গোপীনাথ, দত্তদের রাধারমণ, গোপালজীউ, পোঁড়াদের পোপীবল্লভ, ঘোষবাড়ির রঘুনন্দন, দুর্গাপুরের শ্যামসুন্দরজীউ ও বনমালীপুরের মদনমোহন একে একে বিচিত্র সঙ্ ও শোভাযাত্রা সহযোগে উপস্থিত হন। কোম্পানির আমলের প্রখ্যাত সার্ভেয়র মেজর স্মিথ তাঁর ‘List of Ancient Monuments’ গ্রন্থে এই বিগ্রহ, মন্দির এবং আশ্চর্য কদমফুলের কথা উল্লেখ করেছেন। 

Developed by DXDasia