দুই অসমবয়সী মানুষের মাঝে ছিল অক্ষরের সেতু
…হেমন্তবালার মনের মধ্যে বিশ শতকের এক দৃপ্ত, শিক্ষিত মানুষের বাস ছিল। শুধুমাত্র মেয়েমানুষের ঘেরাটোপে হেমন্তবালাকে বাঁধা যায়নি কখনো। তাই সেই শতাব্দীর সবচেয়ে সেরা মানুষের অটুট সখ্য ও সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। যে সম্মান দেওয়ার সাধ্য সেই সময়ের অন্দরমহলের ছিল না।
শেষ পর্বঃ
চিঠি তো কতই আসত। অক্ষরের বন্ধনে দৃঢ় হত লেখক পাঠক সম্পর্ক। পত্রপ্রাপক যখন রবীন্দ্রনাথ, তখন শব্দের সুভাষিত প্রয়োগ হত বেশ ভালোরকম। চিঠির দায়িত্বে থাকা সুধীরচন্দ্র করের ছিল হরেকরকম কাজ। অনেকসময় যত্ন করে লেখা বেয়ারিং চিঠি গ্রহণের গুরু দায়িত্বও বহন করতে হত তাঁকেই। এইসব চিঠি চাপাটির জন্য নির্দিষ্ট ছিল ‘পাগলা ফাইল’। সেই ফাইল থেকে হেমন্তবালার চিঠি কেমন করে রবি ঠাকুরের মর্মে প্রবেশ করল, সে গল্প তো রয়েছে। কিন্তু আজকের কথকতা এই দুই পত্রমিতার চিঠির বিষয় নিয়ে।
প্রথম দিকের চিঠিগুলি ছিল বেশ বিশেষণে বিশেষিত। ‘হে মোর অমর কবি’, ‘ চির মধুর’ — এই জাতীয়৷ রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিয়েছিলেন মাপা শব্দে। তারপরেই রবীন্দ্রনাথের কাছে এল আরেকটি চিঠি, প্রেরিকার নাম — ‘দক্ষবালাদেবী’। তিনি একটি নতুন কবিতা চান কবির কাছে। প্রশ্ন রেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতার অন্তরালে কে রয়েছেন? উত্তর আসবে এমন আশা ছিল না। কিন্তু জীবনের পরম সম্পদের মতো রবি ঠাকুরের উত্তর এল। সঙ্গে ‘নীহারিকা’ নামের কবিতা। পরে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় এবং ‘বিচিত্রিতা’ কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। এত বড়ো স্বীকৃতি পেয়ে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি হেমন্তবালা ওরফে দক্ষবালাদেবী। তাঁকে তাঁর মেয়ের শিক্ষিকা বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ নাকি নিজের হাতে সব চিঠির উত্তর দেন না। সেক্রেটারিরা উত্তর দিয়ে দেন। কিন্তু নাটোরের তখনকার মহারাজ যোগীন্দ্রনাথ সেই স্বর্ণাক্ষর দেখেই চিনেছিলেন আর হেমন্তবালাকে বলেছিলেন, ‘সোনার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখো।’ কারণ কবিগুরুর হাতের লেখা তাঁর খুব পরিচিত ছিল। এরপর হেমন্তবালার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পত্রালাপ চলল দীর্ঘ দশ বছর। ১৯৩১ থেকে ১৯৪১— রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত।
হেমন্তবালাকে রবি ঠাকুরের ‘অবজ্ঞা’ না করার একটি কারণ সম্ভবত হেমন্তবালার লেখার বাঁধুনি। হেমন্তবালা লেখিকা ছিলেন। জীবনের নানা ঘাতপ্রতিঘাত তাঁকে অক্ষরের মধ্যে শান্তি খুঁজতে শিখিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর আকর্ষণও রবীন্দ্রসাহিত্য পড়েই। দুই অসমবয়সী মানুষের মাঝে ছিল অক্ষরের সেতু। এ এক আশ্চর্য বন্ধন। দশ বছরে ২৬৪টি চিঠি— নেহাত কম কথা নয়। হেমন্তবালার রবীন্দ্রনাথকে লেখা অনেকগুলি চিঠি আবার পাওয়া যায় না। না হলে চিঠির সংখ্যা আরো হত। চিঠিগুলিতে শুধু ভাবাবেগের প্রকাশ ছিল না, ছিল বিতর্ক ও মত বিনিময়। হেমন্তবালার সঙ্গে পত্র বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে পৌত্তলিকতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অনেক মূল্যবান মতামত উঠে এসেছে। চিঠিগুলি এক অচেনা রবীন্দ্রনাথকে আমাদের চিনতে সাহায্য করে। ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক পৌত্তলিক মনও কখনো কখনো নিজেকে প্রকাশ করে ফেলেছে এই চিঠির পাতায়। একটি চিঠিতে সামান্য ব্যঙ্গ করে হেমন্তবালা লিখেছিলেন, ‘কাজেই অপৌত্তলিক আপনার, পৌত্তলিক জোনাকির একটু উপকার করায় কিছু ক্ষতি হবে না।’ নিজেকে বিনয় করে ‘জোনাকি’ বলতেন হেমন্তবালা। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ হেমন্তবালাকে লিখেছিলেন— ‘অবশ্য ধর্মমত আমার আছে— কিন্তু কোনো সম্প্রদায় আমার নেই। আমি নিজেকে ব্রাহ্ম বলে গণ্যই করি নে।’ হেমন্তবালা জীবনের একটা সময় ভক্তির প্লাবনে ডুবেছিলেন। সেই দিক থেকেই রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের কুমুর সঙ্গে নিজেকে এক করে ফেলেছিলেন হয়তো। নিজের ভক্তিকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে একবার প্রায় কুড়ি পাতার পত্র পাঠিয়েছিলেন হেমন্তবালা। রবীন্দ্রনাথও আরেকটি দীর্ঘ পত্রে নিজের ব্রাহ্মধর্ম সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য জানিয়েছিলেন। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমাকে অনেকে বাজে চিঠি লেখে—তার উত্তর দিতে গেলে আমার সময়ের অপব্যয় হয়। তুমি তোমার সত্য প্রয়োজনেই আমাকে লেখো বলেই তোমাকে ভালো করে বুঝিয়ে লিখতে কৃপণতা করিনে। তাছাড়া তুমি লিখতে জানো, তাই লেখা আদায় করা তোমার পক্ষে সহজ।’
এই সহজিয়া সম্পর্কের বাঁধনে দুজনে বাঁধা রইলেন । যত সময় গেছে চিঠির বিষয় হয়েছে বিচিত্র —বর্ণাশ্রম, শাস্ত্র, অবতারবাদ, গুরুপুজো, ব্যক্তিপ্রেমও। হেমন্তবালার চিঠির ভাষাও ছিল চমৎকার —
‘শ্রীচরণেষু দাদা, মেঘে আকাশ ভরে রয়েছে। চারদিক গুমোট অন্ধকারাচ্ছন্ন, আমার হৃদয়ের মত। রুদ্ধঘরের মাঝখানটিতে আমি একলা। এমন দিনে একলা শ্রেয়। এটা বিরহের দিন। –কলকাতার তেতলার ঘরে কোনো গন্ধ নেই। পিসিমা একটা পদ্মফুল দিয়েছিলেন পুজোর জন্য। মনটা ভালো ছিল না। বললাম, ফিরিয়ে নিয়ে যান, আজ আমার পথ দেবতা পাবেন না। দাদা, আপনি কোথায় বসে আছেন, কি করছেন, কি ভাবছেন, কে জানে।’
রবীন্দ্রনাথকে এই শব্দের জাদুকরী মায়া স্পর্শ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি গুরু নই, আমি কবি।’ আসলে হেমন্তবালা ভালোবেসে চিঠি লিখতেন। তাই সে চিঠি কৃত্রিম ছিল না। প্রথমে হেমন্তবালা নিজের পরিচয় জানাননি রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু তারপর রবীন্দ্রনাথের আন্তরিকতার স্পর্শে নিজের পরিচয় জানিয়েছিলেন। হেমন্তবালার পরিচয় পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিঠিগুলি বিশেষভাবে সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেখাও হয়েছিল তাঁদের। উপহার বিনিময় হত। রবি ঠাকুরকে বাড়ির রান্না পাঠাতেন হেমন্তবালা। রবীন্দ্রনাথ পাঠিয়েছিলেন সুরুলের তাঁতের শাড়ি, বিষ্ণুপুরী সিল্কশাড়ি, চামড়ার পোর্টফোলিও, নিজের ব্যবহার করা ঝর্ণা কলম। হেমন্তবালার শেষ চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের পাঠানো ‘ছেলেবেলা’ বইটির উল্লেখ আছে। এই ছিল রবীন্দ্রনাথের থেকে পাওয়া শেষ উপহার। আসল উপহার ছিল শতাধিক অক্ষর, যা দুটি ভাবুক মানুষের মনকে বিনি সুতোর মালায় গেঁথেছিল।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবি ও জোনাকি, জয়ন্তী সান্যাল