রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে সম্পাদকের পদ অর্জন করেছিলেন তিনি
'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'র সম্পাদক নির্বাচনের জন্য পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। পরীক্ষক ব্রাহ্ম নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। প্রার্থীদের ‘বেদান্ত ধর্ম্মানুযায়ী সন্ন্যাস ধর্ম্মের এবং সন্ন্যাসীদের প্রশংসাবাদ’ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠাতে বলা হয়েছিল। প্রবন্ধ পাঠালেন একাধিক দিকপাল ব্যক্তি।
পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে জানা গেল, অক্ষয়কুমার দত্তের রচনাই উৎকৃষ্ট বিবেচিত হয়েছে। তিনিই মনোনীত হয়েছেন 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'র সম্পাদক পদে।
১৮৩৯ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর 'তত্ত্ববোধিনী সভা' প্রতিষ্ঠা করেন। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন জায়গায় ব্রাহ্মসমাজের প্রচার করা।
এর চার বছর পর 'তত্ত্ববোধিনী সভা'র মুখপত্র হিসাবে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’ প্রকাশিত হয়। হিন্দুধর্মের পৌত্তলিক প্রথা, অবতার তত্ত্ব ও ভাবাবেগকে নিন্দা করে ব্রাহ্মধর্মের মূল আদর্শ তুলে ধরতেই পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে তখন কলকাতার সভা-সংগঠনগুলির এক-একটি মুখপত্র ছিল। যা দেখে দেবেন্দ্রনাথের মনে একটি আদর্শ পত্রিকা প্রকাশ করার ইচ্ছে তৈরি হয়।
যদিও এই 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' প্রকাশের কয়েক বছর আগে অক্ষয়কুমার দত্ত ও টাকি নিবাসী প্রসন্নকুমার ঘোষের উদ্যোগে ‘বিদ্যাদর্শন’ নামে একটি মাসিক পত্র প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাটি উচ্চ মানের হলেও মাত্র ছয় সংখ্যা প্রকাশের পর কোনো কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়।
'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'র সদ্য ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্তের প্রথমে পারিশ্রমিক ছিল ৩৯ টাকা; কিন্তু তাঁর দক্ষ পরিচালনার জন্য তা বেড়ে ৪৫ টাকা এবং পরে হয় ৬০ টাকা।
ফুলস্কেপ কাগজের আকারে প্রকাশিত ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল আট থেকে বারো। তত্ত্ববোধিনী সভার সভ্যদের জন্য পত্রিকা মূল্য ছিল বার্ষিক তিন টাকা।
প্রথমদিকে একাধিক বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথের সাথে অক্ষয়কুমারের মতবিরোধ ঘটে। কিন্তু ধীরেধীরে দেবেন্দ্রনাথ অক্ষয়কুমারের দক্ষতা বুঝতে পারেন এবং অক্ষয়কুমারের মতামত নেওয়া শুরু করেন। একসময়ে অক্ষয়কুমারের গুণগ্রাহী হয়ে ওঠেন মহর্ষি।
পত্রিকাতে প্রকাশিত হত অসাধারণ সব প্রবন্ধ। যা নির্বাচনের জন্য বিদ্বজ্জনদের নিয়ে একটি নির্বাচকমণ্ডলী তৈরী হয়েছিল। যেখানে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, রামমোহন রায়ের পুত্র রাধাপ্রসাদ রায়, আনন্দকৃষ্ণ বসুর মত বিভিন্ন বিষয়ে দিকপাল পণ্ডিতেরা।
বিদ্যাসাগর তাঁর "মহাভারতের উপক্রমণিকা" গ্রন্থটি এই পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। অক্ষয়কুমারের সম্পাদনাকালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা হয়েছিল সাতশোর মত।
অন্যান্য পত্রিকা থেকে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র প্রভাব যে কতখানি ছিল, তা বোঝাতে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পরে। 'নিরামিষ ভোজনের শ্রেষ্ঠতা'- এ বিষয়ে ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হলে অনেক তরুণ যুবক আমিষ ত্যাগ করে নিরামিষ খাওয়া শুরু করেন। শুধু তাই নয়, নিরামিষ খাওয়ার বিষয়ে প্রচারকার্যও চালাতে থাকেন। ভাবা যায়! এমন কি এই বিষয়কে কেন্দ্র করে ‘নিরামিষভোজী পত্রিকা’ নামেও একখানি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
যাই হোক, কোন কারণে পত্রিকা সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত সে সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার জানান তাঁর অসুস্থতার কারণ নিরামিষ ভোজন।এ বিষয় নিয়ে জানাজানি হলে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তাঁর ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় এ নিয়ে একটি দীর্ঘ ব্যঙ্গ-কবিতা প্রকাশ করেন।
সমাজ জীবনে 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে, মদ্যপানের বিরুদ্ধে অক্ষয়কুমার প্রবন্ধ প্রকাশ করলে অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিও মদ্যপান অবধি ত্যাগ করেন।
ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ পড়ে ব্রজসুন্দর মিত্র ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ঢাকায় ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন।
অক্ষয়কুমারের পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে স্কুল সমূহের সহকারী পরিদর্শকের পদ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ করলেন। দেড়’শ টাকা পারিশ্রমিকের পদ অক্ষয়বাবু অনায়াসে প্রত্যাখান করলেন। কারণ, অক্ষয় কুমার তখন পত্রিকার সম্পাদনায় কাজে এতটাই ডুবে ছিলেন যে তাঁর অন্য কিছু ভাববার ফুরসত ছিল না।
এদিকে কলকাতায় নর্ম্যাল স্কুল স্থাপিত হলে শিক্ষাবিভাগের নির্দেশক ইয়াং সাহেবের আবেদনে কিন্তু অক্ষয়কুমার সাড়া দিলেন। নর্মাল স্কুলের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করলেন।
সম্পাদকের পদ থেকে অক্ষয়কুমার ইস্তফা দেওয়ার পর 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'র চাহিদা ক্রমশঃ কমতে থাকে। কমতে থাকে গ্রাহক সংখ্যা।
অক্ষয়কুমার দত্তের পর পত্রিকা সম্পাদনার ভার নেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত বিদ্বজনেরা। পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভার নেন। কিন্তু কেউই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যেতে পারেননি। হতে পারেননি অক্ষয়কুমারের মত সফল সম্পাদকও।