দিল্লি থেকে বাংলা বিদায়

আকাশবাণী দিল্লি থেকে বাংলা সংবাদ সম্প্রচারের গতকালই ছিল শেষ দিন। সন্ধ্যা ৭.৩৫-এ শেষ সংবাদ

সাতসকালেই ফোনটা এল। সৌম্যর ফোন। সৌম্য আমার সেই বয়সের বন্ধু, যে বয়সে সবকিছু করলেও পাপ হয় না। ফোন তুলতেই ভরাট গলায় সৌম্যর বয়ান – ‘তুই তো আজ থেকে ইতিহাস হয়ে গেলি রে!’ ‘মানে?’ মানেটা জানতে জানতে বাইরে তাকালাম – বৃষ্টি ঝরছে অঝোরে। মনেও অবিরাম বৃষ্টির ধারাপাত।

লুটিয়েন্স দিল্লির সংসদমার্গে রাশভারী ঐতিহ্যের সম্ভ্রম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লালবাড়িটায় যেদিন প্রথম পা রাখলাম, মাথা ঝুঁকে এল ভাললাগায়। প্রথম পরিচয়, সেখানেও চমক। মহানির্দেশকের স্বরে মন্ত্রগুপ্তির শপথ ও অন্যান্য সরকারি আনুষ্ঠানিকতার পর, আকাশবাণী দিল্লির বাংলা বাংলা সংবাদ বিভাগে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে তখন একের পর এক চোখ ধাঁধানো নাম। বিভাগীয় প্রধান অনিল চট্টোপাধ্যায়। হঠাৎই অনিলদা বললেন, ‘চাইলাম দুজন, পেলাম দেড়জন।’ আমরা হতভম্ব। পরপরই রসিকতাটা ধরতে পেরে সবার প্রাণখোলা হাসি। সবাইকে ছাপিয়ে অনিলদার কানফাটানো হাহাহা। উপলক্ষ্য আমি ও ধৃতি। আমি ছ-ফুট দুই ইঞ্চি, আর ধৃতি আমার কোমর ছুঁই-ছুঁই। এভাবেই, অতি সহজে এক তাকলাগানো পরিবারের সদস্য হয়ে গেলাম। তখন আমরা কয়েকজন। আমি নেহাতই দুগ্ধপোষ্য হরিণশাবক। আকাশবাণী দিল্লির বাংলা সংবাদ বিভাগের পত্তন বিজন বোসের হাত ধরে। এরপর, এসেছেন অনেকেই। কিন্তু উজ্জ্বল হয়ে আছেন ইভা নাগ আর একমেবাদ্বিতীয়ম নীলিমা সান্যাল। ইভাদি ছিলেন রাশভারী, কড়া ধাঁচের গার্লস কলেজের অধ্যক্ষার মতো। নীলিমাদি দমছুট হাওয়া। রূপে-গুণে-ব্যক্তিত্বে এক অসামান্য মানুষ। সৃষ্টিকর্তা যাঁকে দু-হাত ভরে এতকিছু দেন, তাঁদের কোথাও একান্ত একাও করে দেন বোধহয়। নীলিমা সান্যাল, কেয়া চক্রবর্তীরা এভাবেই নিজেরা জ্বলেপুড়ে জ্বালিয়ে দিয়ে যান। বিজন বোস বা নীলিমা সান্যালদের চাক্ষুষ দেখিনি। তাঁদের গল্প শুনেছি। ইভা নাগকে দেখার সৌভাগ্য একবারই হয়েছে। মনে আছে, হিমশীতল ব্যক্তিত্বের মধ্যেও মাথায় রাখা প্রশ্রয়ের হাত। আসলে আমরা ছিলাম এক পরিবারের মতো যে পরিবারে অনিলদা অভিভাবক, মায়ের ভূমিকায় রমাদি(প্রশ্রয় আর বকা দুটোই জুটতো, সুমিত্রাদি দিদির মতো (যাঁকে অনায়াসেই সব কথা বলে ফেলা যায়)। আর ছিল সংবাদ বিভাগের আংশিক সময়ের বন্ধুরা প্রণব দত্ত, উদয় চট্টোপাধ্যায়, অরূপ ভট্টাচার্য, মনোজদা, মাস্টারমশাই, বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরও অনেকে। একসময় আমরা কজন প্রায় দিল্লি শাসন করতাম। মাঝরাত্তিরে ইন্ডিয়া গেটে আমাদের হেঁড়ে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যাঁরা শুনেছেন, তাঁরা এ-কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য।

এরপর এলেন তরুণ চক্রবর্তী। ফিরতি টিকিট কাটা ছিল কলকাতার। গেলেনও তবুও তাঁর উষ্ণ সাহচর্য আজও মনে আছে। এলেন এবং থাকলেনও শিলচরের দীপশিখা রায়। প্রায় শেষদিন পর্যন্ত। সলতে শেষ এবারে নিভে যাওয়ার অপেক্ষা। আকাশবাণী দিল্লি থেকে বাংলা সংবাদ সম্প্রচারের গতকালই ছিল শেষ দিন। সন্ধ্যা ৭.৩৫-এ শেষ সংবাদ। তারপর ইতিহাস। চীনের ভারত আক্রমণ, চাচা নেহেরু-র জীবনাবসান, পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম, জরুরি অবস্থা, ইন্দিরার মৃত্যু এক সময়ে যে খবর বেতারে শোনার জন্য কান পাতত আপামর বাংলার মানুষ, মাইক লাগানো হত পাড়ায় পাড়ায় তা আজ থেকে ঠাঁই পাবে স্মৃতিতে। টেলিভিশন, ইন্টারনেটহীন জীবনে যা ছিল এক প্রাত্যহিক অনুষঙ্গ।

Developed by DXDasia