পঞ্চম জর্জের ভারতে আসার উপলক্ষ্যেই কি জন-গণ-মন লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ?

১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে মর্যাদা পায় এই গান

বাঙালির জীবন চর্চা আর চর্যা ছাড়া চলে না। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটিকে ঘিরেও কম বিতর্ক হয়নি। ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ নিখাদ দেশাত্মবোধক সঙ্গীত নাকি সম্রাট পঞ্চম জর্জের স্তুতিবাদ — এই নিয়ে কলহপরায়ণ হয়েছেন অনেকে। সংশয় জেগে আছে এখনো অনেক মনে। গানটির পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না, রচনাকালও জানা যায় না। ১৯১১ সালে ‘ভারতীয় জাতীয়  কংগ্রেস’-এর ২৬তম বার্ষিক অধিবেশন হয়েছিল ২৬ -২৮ ডিসেম্বর। সেই অনুষ্ঠানে ২৭ ডিসেম্বর প্রথম জনসমক্ষে গাওয়া হয়েছিল ‘জনগণমন’। তবে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে নয়। 

দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া সুরে নীলরতন সেনের হ্যারিসন রোডের বাড়িতে এই গানের রিহার্সাল হয়েছিল। মূল অনুষ্ঠানের পরের দিন, ‘দি বেঙ্গলি’ পত্রিকায় ইংরেজি অনুবাদসহ এই গানের সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। মাঘ, ১৩১৮ বঙ্গাব্দেের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ‘ভারত বিধাতা’ নামে এই গানটি প্রকাশিত হয় এবং ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে মান্যতাও পায়। এই অনুবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। তখন ১৯১১ সাল। ১৯১৮-১৯ সাল নাগাদ বেসান্ত থিওজফিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ জেমস এইচ কাজিনসের অনুরোধে এক ছাত্র সম্মেলনে গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজিনসের স্ত্রী ছিলেন পাশ্চাত্য সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ। তিনি এই গানের স্বরলিপি রচনা করেন, যা আজও স্বীকৃতি পায়। এই ঘটনা ঘটেছিল অন্ধ্রপ্রদেশের মদনপল্লী নামক জায়গায়। এখনো সেখানকার বেসান্ত থিওসফিক্যাল কলেজে এই অনুবাদ ও তার স্বরলিপি ফ্রেমবন্দি করে  দেখানো হয়। 

১৯৩৭ সালে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়ার কথা বলেছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। ১৯৪৩ সালের ৫ জুলাই আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের কথা বলা হয় আর সেই দিনই গানটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়। ওই বছর ২৫ আগস্ট নেতাজী আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাপতির পদ গ্রহণ করেন এবং ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে আর জি হুকুমত এ হিন্দ  প্রতিষ্ঠা করেন। এই দুটি দিনও জনগণমন জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় গাওয়া হয়। লয়ালপুরের তরুণ কবি হুসেন এবং আজাদ হিন্দ সরকারের সেক্রেটারি আনন্দমোহন সহায়ের সাহায্যে গানটির হিন্দি অনুবাদ করান নেতাজী। এই অনুবাদ আক্ষরিক নয়, ভাবানুবাদ ছিল। ভারতে তো বটেই, জাপান ও জার্মানে এই গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতে আসে আর প্রথম ভারতে জনগণমন মর্যাদা পায় আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সঙ্গীতের।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে দুটি গানের প্রস্তাব আসে— একটি বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম আর অন্যটি রবীন্দ্রনাথের জনগণমন। গায়কির কারণে জনগণমনকেই নির্বাচন করা হয়। তাছাড়া এই গানটি হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। অবশেষে ২৪ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে এই গান স্বাধীন ভারতবর্ষের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মর্যাদা পায়।

রবীন্দ্রবিরোধী গোষ্ঠী তখন প্রচার শুরু করেন , জনগণমন আসলে সম্রাট পঞ্চম জর্জের ভারতে আসার উপলক্ষ্যে তাঁকে তোষামোদ করে লেখা। ফলে এই গান জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেতে পারে না। অথচ, বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র পুলীনবিহারী সেন গানটি রচনার উপলক্ষ জানতে চেয়ে ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেছিলেন। তার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘–সে বৎসর ভারত সম্রাটের আগমনের আয়োজন চলছিল। রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনো বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্য আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল। তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায়যুগ যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগ যুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ কোনো জর্জই হতে পারেন না, সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।’ এর পর তো আর বিতর্কের অবকাশ থাকে না। কিন্তু জীবদ্দশাতেও এই গানটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক তিক্ততা আর ভুলবোঝাবুঝির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই গানের জন্য গর্বিত ছিলেন। মদনপল্লীর থিয়োজফিক্যাল কলেজে এই গান গেয়ে তার নামকরণ করেছিলেন— ‘The Morning  song of India’। এই গান ওই কলেজের প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলি সং ছিল। ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত রাশিয়াতে গিয়েছিলেন। মস্কোয় ‘পায়োনিয়ার্স কমিউন’-এ অনাথ বালক বালিকারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরও জনগণমন শুনিয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী এই গানকে বলেছিলেন, ‘দিব্য মন্ত্র।’ সারা পৃথিবী মুগ্ধ আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে। শব্দ ব্রহ্ম অন্তরের ঘুমন্ত সত্তাকে জাগিয়ে তোলে আর আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে এক সূত্রে গাঁথা হয়ে যায় আসমুদ্রহিমাচল, আমাদের মাতৃভূমি।

Developed by DXDasia