‘তিনি সত্যানুসন্ধান চেতনার একমাত্র স্রস্টা। পাপ ও অন্যায়ের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা’

তিনি স্বাধীন চিন্তার কথা বলেছিলেন। যুক্তি দিয়ে যে কোনও অচলায়তনকে প্রশ্ন করতে বলেছিলেন তাঁর ছাত্রদের। মাত্র বছর ২৪ এর জীবন তাঁর। কিন্তু জ্ঞান, চিন্তা ও প্রতিভায় তাঁর বয়স কয়েক শতাব্দী। বাঙালিকে জাগানোর জিয়নকাঠি নিয়েই এই কলকাতা শহরেই পর্তুগীজ পরিবারে জন্ম। হেনরি ডিভিয়ান ডিরোজিও। বাঙালির নবজাগরণ শহুরে কিছু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল কি না, সে তর্কের মীমাংসা করতে এই লেখার অবতারণা নয়। তৎকালীন হিন্দু কলেজ (পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ), যা জ্ঞানচর্চার উৎকৃষ্ট পীঠস্থান হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল, সেই কলেজ থেকে তুমুল জনপ্রিয় শিক্ষক ডিরোজিওর বিতাড়ণের কাহিনি। এই আশ্চর্য বিচারের কথা পড়তে পড়তে মনে পড়ে যেতে পারে সক্রেটিসের বিচারের কিছু প্রাচীন দৃশ্যকে।

কবি হিসাবে নন্দিত ডিরোজিওর আঠেরো বছর বয়সে লেখা একটি কবিতা থেকে তাঁর মনোভাবটিকে বুঝতে সুবিধা হয় আমাদের। ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত উক্তি ‘And as the Slaves departs, the Man returns’ উদ্ধৃত করে যে কাব্য তিনি রচনা করছেন তার ভাব ব্যাখ্যা করে প্রখ্যাত গবেষক-প্রাবন্ধিক বিনয় ঘোষ লিখছেন, ‘ কবি ডিরোজিও বলেছেন, গোলাম যখন জানতে পারল যে সে তার দাসত্বের নির্বাসনদণ্ড থেকে মুক্ত, তখন তার অন্তরাত্মা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। যখন সে স্বাধীন জীবনের স্বাদ পেল, তখন মুক্ত মানুষের উন্নত চিন্তা ভাবনাগুলিও তার মনের অনন্ত আকাশে যেন তারার মতো ঝিকমিক করতে লাগল। কারও কাছে আর সে নতজানু হবে না মাথা হেঁট করবে না, মাথা উঁচু করে উচ্চ চিন্তা করবে নির্ভীক বীরের মতো। …ভাবতে লাগল-এই আকাশ, এই বাতাস, এই পাখি, এই নদী, এদের মতো আমিও স্বাধীন, আমিও মুক্ত।’ এই স্বাধীন রোমান্টিকতার সঙ্গে মিশে ছিল তাঁর দার্শনিক যুক্তিধারা। ছাত্রজীবনে ডিরোজিও কান্টের দর্শনের ওপর যে সন্দর্ভ রচনা করেছিলেন তা বিদ্বৎ মহলে সাড়া জাগিয়েছিল। তাই ধর্ম, সংস্কার, নির্বিচার আচারে বাঁধা এক অন্ধ চিন্তনের দাসত্ব করা সমাজকে প্রশ্ন তিনি করবেন এটাই কী স্বাভাবিক নয়।

১৮২৮ সালে হিন্দু কলেজের উঁচু ক্লাসে পড়ানোর জন্য ডিরোজিও শিক্ষক নিযুক্ত হন। মনে রাখতে হবে তাঁর জন্ম ১৮০৯ সালে। কলেজে যোগদানের অনেক আগে থেকেই বিবিধ সংবাদপত্রে প্রবন্ধ এবং কবিতা লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আর কলেজে প্রবেশ করেই ছাত্রদের উপর তাঁর প্রভাব ছিল ঈর্ষণীয়। সুশোভন সরকার লিখছেন, ‘এই তরুণ শিক্ষক চুম্বকের মতো বয়স্ক ছাত্রদের নিজের চারপাশে টেনে আনতে লাগলেন’। পশ্চিমের কাব্য-সাহিত্য-দর্শনের শিক্ষায় দীক্ষিত করে ছাত্রদের যুক্তিশীল করে তোলার সাধনায় একনিষ্ঠ ছিলেন ডিরোজিও। আর সেই কাজ করতে গিয়েই তথাকথিত সনাতনপন্থীদের আঘাত হানেন তাঁর ছাত্ররা। কলেজে এবং কলেজের বাইরে ডিরোজিওর বাসস্থানেও তাঁর ছাত্রদের জন্য ছিল সর্বদা অবারিত দ্বার। তিনি ছাত্রদের বলেছেন, ‘নিজেরা চিন্তা কর। বেকনের উল্লিখিত কোনও দেবতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ো না। সত্যকেই জীবন এবং মৃত্যুর অবলম্বন ধরে নাও’। ডিরোজিওর শিষ্য রামগোপাল ঘোষ নীতিবাক্য গ্রহণ করেছিলেন, ‘যে তর্ক করে না, সে অন্ধ গোঁড়ামীতে ভুগছে। যে তর্ক করতে পারে না, সে নির্বোধ এবং যে তর্ক করে না, সে ক্রীতদাস’।  তাঁর ছাত্র রাধানাথ শিকদার ডিরোজিও সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি সত্যানুসন্ধান চেতনার একমাত্র স্রস্টা। পাপ ও অন্যায়ের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড ঘৃণা। তাতে ভারতের মঙ্গল ছাড়া অমঙ্গল হতে পারে না’।

ডিরোজিওর অনুগামীদের তর্কাচারণ বন্ধ কক্ষে কারারুদ্ধ হয়ে থাকেনি। একের পর এক পত্রিকা প্রকাশ করে কুপ্রথাগুলির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, সমাজ এবং রাজনৈতিক প্রসঙ্গে মতামত প্রকাশ করা ছিল তাঁদের কাজ। এছাড়াও কেউ কেউ তারুণ্যচিত কারণে কিঞ্চিত বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন। শোনা যায়, রাস্তায় টিকিধারী বামুনদের ব্যাঙ্গবিদ্রূপ, গোমাংস এবং মদ খাওয়া ইত্যাদির কারণে স্থিতিশীল সমাজের একটা বড় অংশ ডিরোজিয়ানদের সহ্য করতে পারতেন না। তবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ডিরোজিয়ানদের রুখে দাঁড়ানোর প্রশংসা করেছেন সুশোভন সরকার। তিনি লিখেছেন, ‘… প্রকাশ্য আদালতে গঙ্গার জল ছুঁয়ে শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এ ব্যাপারে রসিককৃষ্ণ মল্লিক যথেষ্ট চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি গঙ্গার পবিত্রতায় বিশ্বাস করি না”। সমাজ একজন তরুণ শিক্ষকের অনুগামীদের এই সব স্পর্ধাকে মেনে নিতে পারেনি। যেমন একদিন সক্রেটিসকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল, ডিরোজিওর ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।

১৮৩১ সালের ২৩শে এপ্রিল হিন্দু কলেজের ডিরেকটর বোর্ডের একটি অধিবেশন হয়। সেই অধিবেশনে আলোচনার জন্য উত্থাপন করা হয় এক ঐতিহাসিক স্মারকলিপি। সেখানে বলা হয়, ‘যেহেতু ডিরোজিও যত নষ্টের গোড়া এবং জনগণের পক্ষে ভীতিস্বরূপ, সেই হেতু তাঁকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হোক। যদি কোনও ছাত্র সভা-সমিতিতে যায় তাহলে তাঁকেও তাড়িয়ে দেওয়া হবে।’ ডিরোজিওর বিচার সভায় তাঁকে বিতাড়ণের লক্ষ্যে দু বার ভোট গ্রহণ করা হয়। প্রথমবার ৩-৬ ভোটে তিনি পরাজিত হন। দ্বিতীয়বার ভোট গ্রহণের সময় উইলসন এবং হেয়ার সাহেবকে বিরত থাকতে হয়। কেননা ডিরোজিওর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল হিন্দু সমাজ আর তাই সে সম্পর্কে মতামত প্রকাশের তাঁদের কোনও অধিকার ছিল না। রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন, রাধামাধব বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রকুমার ঠাকুর, রসময় দত্ত এবং প্রসন্নকুমার ঠাকুরদের ভোট ছিল ডিরোজিওর বিরুদ্ধে। একমাত্র পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ সিংহ। এবার ডিরোজিওর অপরাধের দিকে সামান্য চোখ ফেরানো যাক।

তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান ‘সংসদীয়’ অভিযোগ ছিল, তিনি ছাত্রদের ঈশ্বর বিশ্বাসে আঘাত হেনেছেন। উইলসন সাহেবের এই অভিযোগের উত্তরে একটি চিঠি দেন ডিরোজিও। তিনি লেখেন, ‘যদি ওই বিষয়ের ওপর কথা বলা অন্যায় হয় তাহলে আমি অপরাধী। কারণ একথা ঘোষণা করতে আমার কোনও ভয় অথবা লজ্জা নেই যে, এ ব্যাপারে আমি দার্শনিকদের সন্দেহের কথা প্রকাশ করেছি এবং সেই সন্দেহ নিরসনের পন্থাও আমি ব্যক্ত করেছি। এত বড় একটা বিষয়ের ওপর তর্ক করা কি কোথাও নিষিদ্ধ? যদি তাই হয় তাহলে বিবদমান কোনও পক্ষে যুক্তি তোলাই অন্যায়। এত বড় একটা বিষয়ের ওপর একটি মাত্র ধারণাকে আঁকড়ে ধরে তার বিরোধী সমস্ত ধ্যানধারণার দিকে চোখকান বুজে থাকা কি জ্ঞানদীপ্ত সত্যের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? …বিশেষ অবস্থার মধ্যে আমি কিছুকালের জন্য তরুণদের শিক্ষাদানের ভার পেয়েছিলাম। তাদের কি আমি প্রগলভ এবং নির্বোধ অন্ধবিশ্বাসী তৈরি করতে পারি?… সেই জন্য আমি কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে হিউমের লেখা ক্লিনথেস এবং কিলোর বিখ্যাত কথোপকথোনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। তাতে আস্ত্বিকতার বিরুদ্ধে অতি সূক্ষ এবং চতুরতাপূর্ণ যুক্তিতর্ক আছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ডাঃ রীড এবং ডুগাল্ড স্টুয়ার্ড হিউমের যুক্তিতর্কের যেসব জবাব দিয়েছেন, সেগুলোও আমি ছাত্রদের পড়তে দিয়েছি। সে জবাব আজ কেউ খণ্ডন করতে পারেনি। আমার অপরাধ কি তা এবার বুঝে দেখুন। …আমি যে নাস্তিক এবং অবিশ্বাসী বিশেষণ লাভ করব তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ধর্মের ব্যাপার নিয়ে যারা স্বাধীন চিন্তা করে, তারা চিরকালই ঐ বিশেষণে ভূষিত হয়’।

কলেজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কলেরায় মাত্র ২৪ বছর বয়সে ডিরোজিওর মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর পরও তাঁর ছাত্রদের আন্দোলন থামেনি। আর বাংলার চিন্তার জগতে তাঁর ছাত্ররা আজও জন্মাচ্ছে, আজও লড়াই করছে।

Developed by DXDasia