শুধু কণ্ঠস্বর নন, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কণ্ঠস্বরের ভিতর এক আহ্বান
বাংলাদেশের তানভির মোকাম্বেল তাঁর তথ্যচিত্র ‘১৯৭১’ তৈরি করছেন যখন, দেবদুলাল বদ্যোপাধ্যায় (Debdulal Bandyopadhyay) সেসময় অসুস্থ। কথা জড়িয়ে আসে, বলতে বলতে ভুলে যান। কিন্তু, তাঁকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র নির্মান সম্ভব নয়, সেকথা ভালোভাবেই জানতেন পরিচালক মহাশয়। যাবতীয় সমস্যা এড়িয়ে সেই তথ্যচিত্রে সামান্য কিছু কথা তিনি বলতে পেরেছিলেন, সেটুকুই বোধহয় যথেষ্ট ছিল।
তথ্যচিত্রটির একটি ফুটেজ-এ দেবদুলালবাবু বলছেন, “বেতারে কাজ করবো প্রথম থেকে এ ইচ্ছে ছিল না, পাকচক্রে হয়ে গেছিলাম।” এই পাকচক্রই যে তাঁর পরিচিতির পথ হয়ে দাঁড়াবে অনেক ঝঞ্ঝা পেরিয়ে তা বুঝেছিলেন। আমরা জানি যাঁরা খবর পড়েন, তাঁদের কণ্ঠে অতিরিক্ত আবেগ দেখানোর জায়গা থাকে না। কিন্তু, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর পড়ার সময় দেবদুলালবাবুর কণ্ঠে আবেগ বোঝা যেত। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এটা তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবেই করতেন। মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে যে দেশ, তার প্রতি মাথা নত হয়ে আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রণবেশ সেনের লেখা 'সংবাদ পরিক্রমা' তাঁর কণ্ঠে শোনার জন্য অপেক্ষা করে থাকত দুই বাংলার মানুষ। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তা প্রেরণা হয়ে উঠেছিল। সাক্ষাৎকারে বলেছেন –
“আকাশবাণীর খবর পড়তে গিয়ে মাঝেমধ্যে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারিনি। মনে হতো, আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেদিন আমার বুকের ভেতরের সব লুকানো আবেগ আর উত্তেজনা ঢেলে দিয়েছিলাম আকাশবাণীর সংবাদ, সংবাদ-পরিক্রমা বা সংবাদ-সমীক্ষা পড়তে গিয়ে। রণাঙ্গনের খবর যখন পড়তাম, তখন মনে করতাম, আমিও সেই রণাঙ্গনের সৈনিক, যখন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কথা পড়তাম, তখন আমার মনের সমস্ত উল্লাস উচ্ছ্বাস নেমে আসতো আমার কণ্ঠজুড়ে। যখন করুণ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা পড়তাম, তখন কান্নায় জড়িয়ে আসত গলা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকটায় যেন নেশায় পেয়ে বসেছিল আমাকে। উত্তেজনা আর প্রবল আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, কখন পড়বো বাঙলাদেশের খবর। এই খবর পড়ার জন্য কখনো কখনো রাতে বাড়িও ফিরিনি। রাত কাটিয়েছি আকাশবাণী ভবনে। ভোরের খবর পড়তে হবে যে!”
সারা ভারতে এখনও পর্যন্ত তিনজন ব্রডকাস্টার পদ্মশ্রী পেয়েছেন। তার মধ্যে একজন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দু’জন- AIR-এর মেলভিন ডি মেলো (Melville de Mellow) এবং ঊষা মেহতা, যিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গোপন বেতার কেন্দ্র চালাতেন।
নদিয়া জেলার লোক তিনি। জন্ম শান্তিপুর, তারপর বেলপুকুর (নদিয়া)। সেখান থেকে তাঁর বাবা যখন কলকাতায় নিয়ে চলে আসেন, তখন তাঁর ৭ বছর বয়স। ১৯৬০ সালে যোগ দেন রেডিওতে। তারপরই শ্রোতারা শুনতে পাবেন সেই মার্জিত কণ্ঠ – ‘আকাশবাণী কলকাতা খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়’। আকাশবাণীতে তাঁর সংবাদ ও ভাষ্যপাঠ, তাঁর কণ্ঠস্বর, বাচন ভঙ্গি শ্রোতা-মনে অনেকটা ‘হাইপোডারমিক নিডল থিয়োরি’র মতো কাজ করেছিল। একটানা বত্রিশ বছর আকাশবাণীতে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, হয়ে ওঠেন দৃষ্টান্তমূলক 'ব্রডকাস্টার'।
১৯৬৪ সালে দিল্লিতে বাংলা বিভাগে সংবাদ পাঠক হিসেবে যোগ দেন। তারপর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের শেষদিকে ফিরে আসেন কলকাতা বেতার কেন্দ্রে। সংবাদ পাঠকে তিনি এমন একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, ঘরে ঘরে সংবাদ পরিক্রমা শোনার জন্য রেডিও খোলা হতো। বেতার সম্প্রচারে বাংলা ভাষার বাচিকশিল্পকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ঐতিহাসিক মর্যাদায়। প্রকাশভঙ্গি ও উচ্চারণ শৈলীতে গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য ঘরানা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৃদয়স্পর্শী পাঠের জন্যই ১৯৭২ সালে পেয়েছিলেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান। বাংলা ভাষা রক্ষা সমিতি বা একুশে আন্দোলনেরও তিনি অন্যতম কাণ্ডারি ছিলেন। তাঁর আবৃত্তি প্রকাশ পেয়েছে রেকর্ড ও ক্যাসেটে। পার্থ ঘোষ, তরুণ চক্রবর্তী, গৌরী ঘোষ, জগন্নাথ বসু প্রমুখ প্রখ্যাত বাচিক শিল্পীরা তার কাছে এ ব্যাপারে ঋণী বলে উল্লেখ করেছেন। ২০১১ সালে তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর গড়ে ওঠে ‘দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সংসদ’।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল আর, দেবদুলালবাবু পদ্মশ্রী পেয়েছিলেন ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক বইটি প্রকাশ করে ঢাকার বাংলা একাডেমি। পান্নালাল দাশগুপ্ত, বরুণ সেনগুপ্ত, শংকর ঘোষ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখের প্রবন্ধ ছিল সেই বইতে। একেবারে শেষের লেখাটি ছিল দেবদুলালবাবুর – ‘তোমারই হোক জয়’। সারা ভারতে এখনও পর্যন্ত যে তিনজন ব্রডকাস্টার পদ্মশ্রী পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্য দু’জন- AIR-এর মেলভিন ডি মেলো (Melville de Mellow) এবং ঊষা মেহতা, যিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গোপন বেতার কেন্দ্র চালাতেন। এরকমই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠে আসছিল বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং দূরদর্শনের প্রাক্তন আধিকারিক সুমিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায়। কাজের সূত্রে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। আকাশবাণীর নিউজ রিডার হিসেবেই বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন দেবদুলালবাবু। দূরদর্শন-এ ওনার খবর পড়াটা বেশিদিন চলেনি, কিছুদিন পর নিজে থেকেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। সুমিতবাবু তখন ওখানেই চাকরি করতেন।
তাঁর কথায়, “আমরা যখন কলেজে পড়ি তখন উনি খ্যাতির একেবারে মধ্যগগনে। বাংলা শব্দের উচ্চারণ নিয়ে অক্লান্ত চর্চা ও সাধনা, এটা আমরা দেখেছিলাম দুজন বাঙালি ব্যক্তিত্বের মধ্যে। একজন শম্ভু মিত্র অন্যজন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। দেবদুলালবাবুর সঙ্গে একটা বিশেষ কাজের সূত্রে জড়িয়ে গিয়েছিলাম, সেটা মনে পড়ছে খুব।
কলকাতার প্রথম আকাশবাণী কেন্দ্র গার্স্টিন প্লেস-এর বাড়িটা তখন প্রোমোটারদের হাতে চলে গিয়েছে। সেইসময় আমি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-কে বলি, বাড়িটা না ভেঙে যদি সেখানে একটা আর্কাইভ গড়ে তোলা যায় ভালো হয়। প্রস্তাব শুনে উনিও উৎসাহিত হন। এরপরই আমি যোগাযোগ করি দেবদুলালবাবুর সঙ্গে। তিনি এবং আমি দু'জনে মিলে তৎকালীন মেয়র প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাছে যাই। বিষয়টার মধ্যে বিভিন্ন জটিলতা ছিল, তবু আমরা হাল ছাড়িনি। প্রশান্তবাবুকে বলি, প্রোমোটাররা যদি ওই বাড়ির কোনও অংশ স্মারক জাতীয় কিছু করার অনুমতি দেন তাহলেও চলবে। সেই প্রস্তাবে রাজীও হয়ে যায় প্রোমোটাররা। তোড়জোড়ও শুরু হয়ে যায়। ফুটবল-ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার অজয় বসু, রামকুমার চট্টপাধ্যায়, যূথিকা রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ গার্স্টিন প্লেস-এর আকাশবাণীতে যাঁরা যাঁরা কাজ করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। আমি আর দেবদুলালবাবু প্রত্যেকের বাড়িতে যাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কিছুই বাতিল হয়ে যায়। এ নিয়ে দেবদুলালবাবু খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন, ব্রডকাস্টিং মিউজিয়াম গড়ে তোলা নিয়ে ওনার অপরীসীম আগ্রহ ছিল, আত্মজীবনীমূলক বইতে সেকথা লিখেওছিলেন।”
আসলে শুধু কণ্ঠস্বর নন, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কণ্ঠস্বরের ভিতর এক আহ্বান যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে।