দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে কী হয়, তা মোদিবাবুর জানা না থাকলেও ভারতীয় জনতার জানা আছে
একটা খবর চলতি সময়ে বেশ আলোড়ন তুলেছে। কেন্দ্র বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর পুঁজিতে টান পড়েছে। তা মেটাতে এবার বিশাল টাকার থলি নিয়ে এগিয়ে এসেছে মোদি-সরকার। ঠিক হয়েছে, প্রায় ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকা ঢালা হবে ব্যাঙ্কগুলোর পুঁজি বাড়াতে। আর তা নিয়েই চারদিকে উঠছে নানা প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, সাধারণ মানুষের করের টাকা এভাবে কর্পোরেটদের পায়ে অঞ্জলি দেওয়ার অতীত কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ধান্দার ধনতন্ত্রে অবতার মোদি
কথাটা ইংরেজিতে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম্ (Crony Capitalism), বাংলায় কখনও কখনও লেখা হচ্ছে ধান্দার ধনতন্ত্র। এই 'ধান্দা' কথাটাকে আরও একটু বিস্তৃত করে বললে বলা চলে, 'চোরে চোরে মাসতুতো ভাই' ধনতন্ত্র। ব্যাপারটা কী? আসলে ব্যাবসা করার প্রথম কথাটাই হলো ঝুঁকি নেওয়া। ধরুন, আপনি ঠিক করলেন ব্যাবসা করবেন, মোবাইল ফোন বানিয়ে বিক্রি করার ব্যাবসা। আপনি পুঁজি জোগাড় করলেন, কারখান খুললেন, শ্রমিক নিয়োগ করলেন, আর যা যা করার করলেন। এত সব আপনি করলেন কেন? লাভ রাখবেন বলেই তো? লাভ না থাকলে আপনি এত খাটাখাটি করবেনই বা কেন? তা লাভের অঙ্ক ধরে আপনার প্রতি ফোনের দাম হয়তো দাঁড়াল দু' হাজার টাকা। বেশ চলছিল, হঠাৎই আপনার এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারে এসে গেল, যে ওই ফোনই দু'শো টাকা কমে বেচতে শুরু করল। এবারে আপনি কী করবেন? ব্যাবসা বন্ধ করে দিলে বিরাট ক্ষতি, আবার আপনিও যদি দু'শো টাকা কমে ফোন বিক্রি করতে শুরু করেন, আপনার খুবই সামান্য লাভ থাকবে যার জন্য এতটা পরিশ্রম করার মানে হয়না। তার মানে আপনি হিসেব-নিকেশ করে একভাবে এগোলেন, কাজে নামার পরে সে হিসেব গুলিয়ে যেতে পারে। আবার আপনার যতটা মাল বিক্রি হবার কথা ছিল, তা হলো না। বা কাঁচামালের দাম বেড়ে গেল। এসব নানা কারণে আপনার পরিকল্পনা রূপায়ণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটাকেই বলে ব্যাবসার ঝুঁকি। যে কোনো মুক্ত বাজারে এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত ক্রোনি ক্যাপিটালিজম সেই স্বাভাবিক ধারণাটাকেই বদলে দিচ্ছে।
ইংরেজিতে Crony কথাটার মানে কিন্তু ভালোই, তা হলো অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা বন্ধু। সেই কথাটাই আধুনিক যুগে অর্থ পাল্টে ফেলল। ক্রোনি ক্যাপিটালিজম-এর অর্থ হলো, ঝুঁকির মাধ্যমে নয়, ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক নেতাদের হাত করে ব্যাবসা বিরাট বড়ো করে ফেলছে। এখানে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা অন্তরঙ্গ বন্ধু। এ দেশে এর আগেও কখনও কখনও এমন অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু এমন খোলাখুলি বিশাল বিশাল পুঁজিপতিদের টাকার থলি দিয়ে সহায়তা এর পূর্বে দেখা যায়নি। সর্বশেষ ঘটনাটা খুলেই বলি।
ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিতে কর্পোরেটদের পাশে দাঁড়াচ্ছে মোদি সরকার
সম্প্রতি কেন্দ্র সিদ্ধান্ত করেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে পুঁজি জোগানো হবে। কত টাকা? ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকা। কেন এটা করতে হচ্ছে? কারণ, ব্যাঙ্কগুলির বহু টাকা বড়ো বড়ো শিল্পপতিরা ব্যাবসা করার নামে ধার নিয়েছিল, কিন্তু আর শোধ করেনি। শোধ করব বলে ধার নিয়ে শোধ না করলে ব্যাঙ্কের ভাষায় সেই ঋণকে বলা হয় নন্ পারফর্মিং অ্যাসেট। অর্থাৎ ব্যাঙ্কের সম্পদের সেই অংশ যা ব্যাঙ্ককে কোনো ব্যাবসা দিচ্ছে না। কত টাকা? ক্রিসিল নামে এক সংস্থা সারা দুনিয়া জুড়ে আর্থিক ব্যাপারে গবেষণা ও নানা রির্পোট তৈরি করে। এই সংস্থার হিসেবকে যথেষ্টই মান্যতা দেওয়া হয়। এদের হিসেবে ভারতে বর্তমানে ব্যাঙ্কগুলো থেকে টাকা ধার নিয়ে শোধ না করার পরিমাণটা ঋণের মূল ও সুদ সহ প্রায় ১১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা কাদের টাকা? আপনি-আমি ব্যাঙ্কে যে টাকা জমা রাখি, তা থেকেই ঋণ দেওয়া হয় কর্পোরেটদের। ধরে নেওয়া হয়, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সুদ সহ টাকা ফেরত দেবে, আর এভাবেই ব্যাঙ্কের ব্যাবসাও চলবে। কিন্তু ধান্দার ধনতন্ত্রে সেই সুস্থ হিসেবটাই ভেঙে পড়ছে। মোদি ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত বিশাল বিশাল কর্পোরেটগুলোকে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ ছেড়ে দিয়েছে। এটাও একটা পদ্ধতি। ব্যাঙ্ক যদি মনে করে, কোনো ঋণ আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে তারা চলতি খাতায় সম্পদের হিসেব থেকে সেই অঙ্কের টাকা সরিয়ে নেয়। তার ফলে ব্যাঙ্কের পুঁজি, যা আগে ছিল, বর্তমান খাতায় তার থেকে কমে যায়। তৈরি হয় পুঁজির সংকট। সেই সংকট মেটাতেই এবার সোজাসুজি ওই পরিমাণ টাকা কেন্দ্র ব্যাঙ্কগুলোকে দিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ, কর্পোরেটগুলোকে ঋণ শোধ করার দায় থেকে মুক্তি দিয়ে সরকারের টাকা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে।
এভাবেই অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিশাল বিশাল পুঁজিপতি, মোদিভক্ত আদানি-আম্বানিরা। এরাই ভোটের সময় মোদির দলকে টাকা সাপ্লাই করেছিল, তা এখন লক্ষগুণ সুদেআসলে তুলে নিচ্ছে। সরকার কোথা থেকে টাকা পায়? তা-ও আপনার-আমার ট্যাক্সের টাকা। প্রতিটি লোক ট্যাক্স দেয়, সে যত গরিব লোকই হোক না কেন। সেই টাকা লক্ষ কোটি টাকার মালিকদের পায়ে অঞ্জলি দেওয়া হচ্ছে।
কেন এই টাকা ব্যাঙ্কগুলোকে দেওয়া হচ্ছে? দেশের অর্থমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, ব্যাঙ্কগুলোযাতে ব্যাবসা-বাণিজ্যের জন্য আরও বেশি বেশি করে ঋণ দিতে পারে, তার জন্যই ২ লক্ষ ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যাঙ্কগুলিকে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ আবার সেই খেলা শুরু হবে। আবার ঋণ, আবার নন্ পারফর্মিং অ্যাসেট, আবার খাতা থেকে সেই হিসেব হাওয়া হয়ে যাবে। বলা হচ্ছে, এতে নাকি ব্যাবসা-বাণিজ্য বাড়বে, আর তাতে বেকার ছেলেমেয়েরা কাজ পাবে। এই যুক্তি অসাড়। কেন? বলছি।
প্রথমত, নোটবাতিলের ফলে ব্যাঙ্কগুলির হাতে বিশাল পরিমাণ টাকা এসেছে। কিন্তু সেই টাকা ঋণ নেওয়ার চাহিদা তলানিতে। কেন টাকা ধার নিচ্ছে না কর্পোরেটগুলি? কারণ জিনিসপত্রের চাহিদা কম। সব রিপোর্ট বলছে, এবার উৎসবের সময় যতটা জিনিসপত্র বিক্রি হবে বলে ভাবা হয়েছিল, তার থেকে অনেক কম হয়েছে। কেন? প্রায় সবাই একমত, নোটবাতিল, হুড়োহুড়ি করে জিএসটি চালু করা এবং বহু জিনিসের উপর ২৮ শতাংশ জিএসটি চাপানোর ফলে বহু ছোটো-মাঝারি ব্যাবসা বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে দারুণ কষ্টে আছে, জিনিস কেনার ক্ষমতা কমে গিয়েছে।সাধারণ মানুষের চাহিদা না বাড়াতে পারলে জিনিস বিক্রির আর একটা রাস্তা থাকে, তা হলো রফতানি। সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ভারতের রফতানি গত কুড়ি বছরের মধ্যে সবথেকে নীচে নেমে গেছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাবসা বাড়লেই চাকরি বাড়ছে না। যেধরনের ব্যাবসা বাড়ছে, তাতে অঙ্কের হিসেবে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বাড়লেও কর্মহীনতা কমছে না, বরং লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একে বলা হচ্ছে জব-লেস গ্রোথ বা চাকরি-বাকরিহীন উন্নয়ন। এতে বিশাল বড়োলোকরা আরও বড়োলোক হচ্ছে, গরিবের ভাগে অষ্টরম্ভা। আরও আশঙ্কার কথা হলো, গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট বৃদ্ধির হারও ক্রমেই কমছে। যা একসময় ৯ শতাংশের আশেপাশে ছিল, তা এখন ৫.৭ শতাংশে নেমেছে।এর অর্থ দেশে আশানুরূপভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে না, যার কারণও নোটবাতিল এবং ভুলভাল জিএসটি বলেই অধিকাংশ অর্থনীতিবিদদের মত।
তৃতীয়ত, নতুন শিল্প, যাকে অনেক সময় সান-রাইজ ইন্ডাস্ট্রি বলা হয়, যেমন, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, তা-ও আর বাড়ছে তো না-ই, বরং কমছে। এদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প অনেকটাই নির্ভর করে পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গে ব্যাবসা করার উপর। সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ফলে সে সুযোগ কমেছে। আবার ট্র্যাডিশনাল শিল্প, যেমন, নির্মাণ শিল্প, গভীর সংকটে। সারা দেশে কয়েক লক্ষ ফ্ল্যাট তৈরি হয়ে পড়ে রয়েছে, কেনবার লোক নেই।
তাহলে কী করা দরকার? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটাও জানা। এমন শিল্প হোক, যাতে কর্মসংস্থান হয়। পরিকাঠামো বাড়ানো, গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো খাতে সরকারি অর্থ ব্যয় প্রভৃতি। তা না করে ব্যাঙ্কগুলির পুঁজি বাড়ানোর নামে যেভাবে কর্পোরেটদের পকেটে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা মোদি জমানার সবচেয়ে বড়ো আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলির অন্যতম। যেসব অসাধু মালিকদের সবথেকে ভালো থাকার জায়গা জেলখানা, তাদেরকেই জামাই-আদর করে দেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষলে কী হয়, তা মোদিবাবুর জানা না থাকলেও ভারতীয় জনতার জানা আছে। ২০১৯ সালে প্রথম সুযোগেই সেটা তারা মোদিবাবুকে জানিয়ে দেবেন।