
জেমস লং দিয়ে গেলেন কৃষকের অধিকার আর মাদার মেরির আশ্বাস যোগানো হাত
নভেম্বরের মাঝামাঝি অঘ্রান আসতেই দক্ষিনের ২৪ পরগণার চড়িয়াল খাল বরাবর মোয়া আর গুড়ের রমরমা। নির্দিষ্ট দোকানে আগাম কেক বানানোর সামগ্রীর খোঁজ নিয়ে যান আগ্রহীরা। আশ্বিনে অমন বড়সড় উৎসব পার করে, শীত নিজেই উৎসব হয়ে আসে। তেরো পার্বণের বাংলায় রাস্তায় শনি-হনুমানের নয়া পূজার উত্তর ভারতীয় বাহার আসার বহুকাল আগে, বড়দিন এসেছে এখানে। বছরভর বিপদে-আপদে, আশায় বা ভরসায় কালী-মনসার মতই মাদার মেরির থানে হত্যে দিয়েছেন বিশ্বাসী। ঠাকুরপুকুরের আশেপাশের কবরডাঙা, কালীতলা, রামচন্দ্রপুর, কাঠপোল, কেড়াপুকুর বাজারের – সর্দার, মাল, বিশ্বাস, মাখালদের পাড়ায় পাড়ায় এছবি বহুকালের।
সময়টা ১৮৬১। মে মাসে উত্তর কলকাতার ঠাকুর বাড়িতে রবিবাবুর জন্ম হয় যখন, সারা বাংলায় তীব্র হয়েছে নীল বিদ্রোহ। ইতিমধ্যে যশোরের বিষ্ণুচরণ ও দীগম্বর বিশ্বাস, পাবনার কাদের মোল্লা, মালদার রফিক মণ্ডলের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে রাঢ়ে, বৃহত্তর বাংলায়। নদিয়ার আাসাননগরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে বিশ্বনাথ সর্দারকে। অপরাধ, নীলকুঠি আক্রমণ। সেবার বর্ষায় টানা একমাস জেলে থাকলেন ঠাকুরপুকুরের বছর সাতচল্লিশের আইরিশ যাজক জেমস লং। অপরাধ মারাত্মক।
১৮৫৯ থেকে নীলচাষ নিয়ে বৃহত্তর বাংলার কৃষকের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ে। নদিয়ার চৌবেরিয়ার দীনবন্ধু মিত্র নীলদর্পণ নাটক লেখার সময় ঠাকুরপুকুরের সাহেব যাজক প্রকাশনার দায়ভার নেন। ইংরেজি অনুবাদের কাজে দিনরাত এক করেন মাইকেল মধুসূদন। আর সে বইয়ের মুখবন্ধ লিখলেন স্বয়ং যাজক। কলকাতা এড়িয়ে ঢাকায় প্রকাশনার কাজ যখন চলছে, ব্রিটেনের নাগরিক বুদ্ধিজীবী সমাজ ততদিনে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার নিয়ে ওয়াকিবহাল। কলকাতার সভায়, জমায়েতে ক্ষোভ জানানোর পাশাপাশি চিঠিপত্র মারফৎ পশ্চিমে সে ক্ষোভ আগেই পৌঁছে দিয়েছিলেন জেমস লং। কলকাতা হয়ে লন্ডনে হুলুস্হুলু হতেই এই বিদ্রোহের অন্যতম নাটের গুরু জেমস লংকে জেলে পোরাই শ্রেয় ভাবল কোম্পানির কর্তারা। একমাসের কারাবাসের মাঝে তাঁর জামিনের ১০০০ টাকা জুটিয়েছিলেন খোদ কালীপ্রসন্ন সিংহ। এসময় কলকাতা-ঢাকা সহ বৃহত্তর বাংলায় প্রতিদিন চলতে থাকে গণবিক্ষোভ-সভা। কারাগারের সামনেও হয় বিক্ষোভ।
১৮১৪ সালে আয়ারল্যান্ডে জন্মানো জেমস লং, লন্ডনে পড়াশুনো শেষ করে, রাশিয়া হয়ে চলে আসেন কলকাতায়। ২৫ বছরের সাহেব যাজক ঠাকুরপুকুরে কাজকর্ম শুরু করেই বুঝতে পারেন – প্রবাদ-প্রবচন ও বাগধারায় সাজানো কথ্য বাংলার যাদু অনন্য। ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি বাংলা শিখলেন। শিখলেন সংস্কৃত ও ফারসি। জনমানস বুঝতে আর যোগাযোগ বাড়াতে গিয়ে জড়িয়ে গেলেন বাংলার অন্তজ চাষা-কামার-কুমোর-মাঝি-জেলেদের সঙ্গে। নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে ব্যথিত জেমস লং ১৮৭২-এ কলকাতা ছাড়ার আগে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের প্রবাদ-প্রবচন নিয়ে Bengal Provervs(১৮৫১) রচনা করে গেছেন। বাংলার লোকসাহিত্য নিয়ে অবিরাম কাজের ফসল হিসেবে – ধাতুমালা, দৃষ্টান্তরত্ন, প্রবচন, জীব রহস্য, পুরাতন কলকাতা। যা তৎকালীন সময় ধরার সঙ্গেসঙ্গে বাংলার চিন্তা ও প্রকাশনাকে এগিয়ে দিয়েছিল কয়েক ধাপ। নিয়মিত সংবাদপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সাময়িকী যোগাড় করে রেখেছেন। যা তাকে বাংলা চেনাতে সাহায্য করেছে, আর ভবিষ্যতের বাংলা পেয়েছে অতীতের ধারাপাত।
১৮৭২-এ কলকাতা ছাড়ার পর ১৮৮৭তে লন্ডনে প্রয়াত হন জেমস লং। শোনা যায় পরের শতক আসতে আসতে অনেকটাই মজে যায় চড়িয়াল খাল। অনতিদূরে গাঙুর। বিশ্বাসীর বিশ্বাসে সেই পথে বেহুলার স্বর্গারোহণ। মনসার জাগ্রত ভূগোলে জেমস লং দিয়ে গেলেন কৃষকের অধিকার আর মাদার মেরির আশ্বাস যোগানো হাত। চড়িয়াল খাল বরাবর হারিয়ে যাওয়া সে গল্প ভুলে বড়দিনের আগে সব্জি বেচে ফেরার পথে কেক বানানোর বেকিং পাউডার কেনেন সজনেবেরিয়ার অনিতা সরদার, রামমাখাল চকের দশকর্মা দোকানে একবিগত ক্রিসমাস ট্রি'র দরদাম সারেন উমেশ পাত্র। মাগুরখালি, কুলেরদাঁড়ি, দড়িরচক, গোপালপুর, জুলপিয়া হয়ে দক্ষিণে, আরো দক্ষিণে ক্রমে ঘন হয় সুন্দরবন। মনসা, দক্ষিণ রায়, বন বিবির সাকিনে বাংলাভাষার প্রবাদ-প্রবচনে, গানে ঘরের মানুষ হয়ে যান মাদার মেরি বা মারিয়ম বিড়ি। বড়দিনের সকালে খোল আর করতালে কীর্তনের সুর তুলে একত্রিত যারা হন, পার্কস্ট্রিটের রোশনাইয়ে তাদের কী যায় আসে! চড়া বাজারের দরদাম সামলে শান্তিতে বাঁচার প্রার্থনা ছাড়া ফুল্লরার এ ভূমিতে কিইবা চাওয়ার! এই সামান্য চাওয়াই একদিন ঠেলে দেয় বিদ্রোহে। জেমস লং, নীলকর আর কবেকার বাংলার গল্প ততদিনে পেরিয়ে গেছে দেড়শো বছরেরও বেশি সময়।
