
বিখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী ও লেখক ডগলাস উইলিয়াম ফ্রেসফিল্ডের ‘রাউন্ড কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা’ বইতেও রয়েছে মাটিগাড়া হাটের উল্লেখ
ইংরেজরা উন্নয়নের পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসা এবং প্রশাসনিক সুবিধার জন্য উত্তরবঙ্গের তরাই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে দার্জিলিং ইমপ্রুভমেন্ট ফান্ড গঠন করেছিল। সময়টা ছিল ১৮৮০ সালের আশেপাশে। আরডিআই ফান্ডের অধীনেই এলাকার উন্নয়নের জন্য মাটিগাড়া সহ আরও কয়েকটি হাট তৈরি হয়েছিল। একশ বছরেরও বেশি প্রাচীন মাটিগাড়া হাট আজ সংস্কারের অভাবে ধুঁকছে। যে হাট এলাকার উন্নয়নে একসময় কাজে লেগেছিল সেই হাট আজ মরে যাওয়ার পথে। ফলে সেই প্রাচীন হাট সংস্কারের দাবি উঠেছে।
তরাই মহকুমার সদর দপ্তর একসময় ছিল ফাঁসিদেওয়াতে। ১৮৮০ সালের শেষদিকে তরাই মহকুমার সদর দপ্তর চলে আসে শিলিগুড়িতে। তবে অনুমান করা হচ্ছে, ডিআই ফান্ড গঠনের আগেও মাটিগাড়া হাটের অস্তিত্ব ছিল। বৃহত্তর শিলিগুড়িবাসীর গর্ব করার মত তথ্য হল, মাটিগাড়া হাট এই অঞ্চলের প্রাচীনতম হাট। প্রখ্যাত পণ্ডিত শরৎচন্দ্র দাস ১৮৭৯ সালে তিব্বত যাওয়ার সময় নেপালের গুনশার গ্রামবাসীদের কাছে মাটিগাড়া হাটের কথা শোনেন। বিখ্যাত ব্রিটিশ পর্বতারোহী ও লেখক ডগলাস উইলিয়াম ফ্রেসফিল্ডের ‘রাউন্ড কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘা’ বইতে মাটিগাড়া হাটের উল্লেখ আছে। পাশের দেশ তিব্বত, সিকিম, নেপাল, ভুটান থেকেও পসারিরা পসরা নিয়ে এই হাটে ভিড় করতেন। নির্জন দ্বীপের মধ্যে থাকা চা বাগানগুলো বা বিচ্ছিন্ন গ্রামগঞ্জগুলো যোগাযোগের পথ খুঁজে পেয়েছিল এই হাটের মাধ্যমে। শিলিগুড়ির পুরানো দিনের লোকদের মধ্যে লেখক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য সহ অনেকেই বলেন, মাটিগাড়া হাটে একসময় হাতি, ঘোড়া, উট বিক্রি হত। মাটিগাড়া হাট থেকেই দার্জিলিং ও তরাইয়ের চা, পাট, পাহাড়ের কমলালেবু কিনে ইংরেজরা শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন লাগোয়া বিভিন্ন গোডাউনে মজুত করত। পরে তা ট্রেনে করে কলকাতায় পাঠানো হত। সেই হেরিটেজ হাটের একটা সরকারি অফিস ছিল হাটের পাশেই। আজ আর তা নেই। এখন হাটবাবুর অফিস আছে বটে। তবে তা না থাকার মতনই।
যে হাটের থেকে সংগ্রহ করা টাকা থেকে এলাকার উন্নয়ন হত, আজ তারই উন্নয়ন প্রয়োজন। হাটের রাস্তা একেবারেই ভাঙা। বর্ষাকালে চলাফেরা করা দায়। হাটের আবর্জনা পরিষ্কার করার বিশেষ ব্যবস্থা নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা আবর্জনা ফেলে রাখছে নর্দমার মধ্যে। ফলে নর্দমাগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাতে জল জমে মশা বংশবৃদ্ধি করছে। হাটে নেই কোনও ছাউনি। পরিষ্কার করার লোক নেই। ফলে পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠছে।
একসময় হাটের এলাকা ছিল ৫৭.৩৩ একর। হাট ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতি অর্ধেন্দু বিশ্বাস দাবি করেন, সেই ঐতিহাসিক হাটের জমি আজ দেড় একরে ঠেকেছে। সব জমি জবরদখল হয়ে যাচ্ছে।
আজ আর সেই হাটে হাতি ঘোড়া বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় না দার্জিলিং চা-ও। তবে গরু, ছাগল, মুরগি হাঁস বিক্রি হয়। বিক্রি হয় শুঁটকি মাছ। হাটের পাশেই আছে ঝাঁ-চকচকে শপিং মল। চাঁদমনি চা বাগান তুলে দিয়ে শপিং মল আর আবাসন তৈরি হয়েছে। আর সেই শপিং মলের হাট ধরেই সেই প্রাচীন হাটে কিন্তু চিন থাবা বসিয়ে চলেছে। বিক্রি হচ্ছে চিনা পণ্য।
হিসেব বলছে, এখন হাটে এক হাজার দোকান বসে। হাট বসে মঙ্গলবার ও শুক্রবার। তবে মূল বড় হাট হল মঙ্গলবার। সকাল সাতটা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত হাট থাকে জমজমাট। তবে আগে হাট যতটা জনপ্রিয় ছিল, এখন তা নেই। আধুনিকতার ছোঁয়া হাটকে আরও বেশি করা নষ্ট করে দিচ্ছে। নেপালি, বাঙালি, বিহারি, আদিবাসী সকলের মিলন ক্ষেত্র এই হাট। তবে পুরানো নিয়ম মেনে এখনও কাঠের চৌকি, বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি হয়। তবে হারিয়ে গিয়েছে বহু সামগ্রী। একেক দিনে হাটে হাজার পাঁচেক লোকের জমায়েত হলেও কোনও টয়লেট নেই সেখানে। হাট ব্যাবসায়ী সমিতির সভাপতি অর্ধেন্দুবাবু দাবি করেন, হাটে এখন দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা কেনাবেচা হয়।
মোট পাঁচটি ব্লক হাটে। তবে বাজার থেকে হাটের চাল, ডাল, সবজির দাম একটু কম। ফলে শহরের অনেক সঞ্চয়ী মধ্যবিত্ত আজও ওই হাটে যান। গ্রামের টাটকা শাকসবজি পাওয়া যায় হাটে। হাটবিবি পুনম লামা বলেন, তাঁদের প্রাচীন অফিস ভেঙে উধাও হয়ে গিয়েছে। তাঁরা অন্যের বাড়িতে একচিলতে একটি ঘর নিয়ে অফিস করেন। আর সেখান থেকে পুরনো দিনের অনেক সরকারি জিনিস হারিয়ে গিয়েছে। হারিয়ে গিয়েছে অনেক সিন্দুকও। একটি ভাঙা সিন্দুক এখনও পড়ে আছে। ধুলো জমছে আসবাবপত্রে। নষ্ট হচ্ছে অনেক কাগজপত্র। হারিয়ে গিয়েছে অনেক ফাইল। ইতিহাস ধরে রাখারও কোনও প্রয়াস নেই। তাঁদের হিসাবে ৮০৬ জন স্বীকৃত ব্যাবসায়ী রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে দুই টাকা ও পাঁচ টাকা প্রশাসন আদায় করে। শিলিগুড়ি মহকুমা প্রশাসনের অধীনে থাকা ডিআই ফান্ডের সেই মাটিগাড়া হাটের কর্মীও প্রায় নেই। চারজনের জায়গায় দু’জন টাকা সংগ্রাহক। বাকি দুই জন অবসর গ্রহণ করায় তাদের এখন মাসে ১২০০ টাকা বেতনে কাজ করানো হচ্ছে। তবে কেউই চারমাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। গরু হাটে কিছুদিন আগেও সপ্তাহে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকার গরু বিক্রি হলেও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার নজরদারির জেরে এখন তা সপ্তাহে ৮ হাজারে ঠেকেছে। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস বলেন, তাঁরা চার বছর ধরে বারবার হাট সংস্কারের জন্য জেলা প্রাশাসনকে চিঠি দিচ্ছেন। কাজ হচ্ছে না। আর হাটের জঞ্জাল সাফ করার পুরো ব্যবস্থা তাদের নেই। ফলে সেখানে পরিবেশ খারাপ হচ্ছে। ড্রেনের ওপর হাটে দোকান হচ্ছে। বেআইনিভাবে রাতারাতি কী করে হাটের জমিতে বাড়িঘর হয়ে যাচ্ছে সেটাও বিস্ময়ের। যদিও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর সেখানে দুটি পাকা কালভার্ট তৈরি করে দিয়েছে। কিছু পাকা রাস্তাও সেখানে করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এই প্রাচীন হাট হারিয়ে যাবে নাকি এর সংস্কার হবে তা নিয়ে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
