বিরুষ্কা আর জোড়কলম

আমীর খসরু নিজের পরিচয় দিতেন একটি জোড়কলম শব্দে – হিন্দুস্তানীতুর্ক

বিরাটের বি আর অনুষ্কার উষ্কা। দুইয়ে মিলে বিরুষ্কা। শব্দ নয়, কিন্তু শব্দ হয়ে উঠেছে প্রতিবেশের কারণে। উচ্চারণ করলেই মনে আসে সফল, সুন্দর দুই নর নারী, যেন চিরকাল ভালবাসাবাসির জন্যই তৈরি এক চমৎকার জুটি।

আমার অবশ্য পাশের বাড়ির মেয়ের বিয়েতেও একই রকম মনে হয়। যে মেয়েটি বাড়ি থেকে পালিয়েছিল ভিন্নধর্মী প্রেমিককে নিয়ে, ছ'মাস পরে সে যখন স্বামীকে নিয়ে প্রণাম করতে এল, তার মুখেও দেখি একই আভা!

কিন্তু প্রেম তো আর সশব্দে ভাঙে না। নিঃশব্দে আসে, আবার নিঃশব্দেই শুরু হয় ভাঙন, আর একেবারে শেষে তুমুল কোলাহল – কুকথা, মারধোর, আদালতের বাক্যবাণ। কিন্তু বিয়ের দিন সবাই যেন জোড়কলমের গাছটি!

জোড়কলম আসলে গাছেদের পৃথিবী থেকে নেওয়া এক শব্দ। একটি গাছের অঙ্গজ কোষ থেকে আর একটি গাছ জন্মানোর ইতিবৃত্ত। নারী পুরুষ মিলে সংসার নামের প্রাচীন বৃক্ষটির পরিচর্যা করে, আশ্রয় দেয় ও নেয়। তারপর কালের নিয়মেই ঘুণ ধরে, ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ে। সে ঝড় হতে পারে বিচ্ছেদ, হতে পারে মৃত্যু।

যেমন ব্র্যা্ঞ্জেলিনা। খ্যাতি, প্রতিভা, রূপের এমন জোট কখনো টুটবে কেউ ভেবেছিল?

এই জোড়কলমে জন্মানো শব্দগুলো প্রেমের ক্ষেত্রে, শ্লেষে, হাস্যরস তৈরিতে একেবারে অব্যর্থ।  সুকুমার রায়ের কবিতাতেই গুচ্ছ গুচ্ছ – বকচ্ছপ, হাঁসজারু, হাতিমি, গিরগিটিয়া। উনি এগুলোকে ডাকতেন খিচুড়ি শব্দ বলে।

এই খিচুড়ি শব্দ আমরা বহু ব্যবহার করে থাকি। ঠান্ডা জাঁকিয়ে পড়েছে বলে আপনি লং ড্রাইভে বেরোলেন। কুয়াশায় দৃষ্টি চলে না, সঙ্গিনী বিরক্ত হয়ে বললেন, – কী স্মগ রে বাবা!

স্মোক আর ফগ মিলে স্মগ। স্টেটমেন্টটাও জোরাল হলো, আবার পরিবেশ দূষণের চিন্তাও মনকে একটু ভার করে দিল।

তারপর খিদে পেয়েছে বলে আপনি গাড়ি থামালেন এক মোটেলের সামনে। মোটর আর হোটেল মিলে হল মোটেল। খাবার দিতে দেরি হচ্ছে, তুলে নিলেন খবরের কাগজ। সেখানে ব্রেক্সিটের খবর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে এক্সিট করবে ব্রিটেন। তাই নতুন শব্দ বাজারে এল, ব্রেক্সিট।

এই শব্দগুলোকে ইংরেজিতে বলে পোর্টম্যান্টো। যার আসল অর্থ অতিকায় পেটিকা। যাতে অনেক কিছু এঁটে যায়। সত্যিই জোড়কলম শব্দের মধ্যে এঁটে যায় বিশাল ব্যঞ্জনা।

আমীর খসরুর কথা মনে পড়ছে। পদ্মাবতীর কারণে অধুনা বিখ্যাত আলাউদ্দিন খলজির দরবারের শ্রেষ্ঠ গুণী। সুফিসন্ত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য, নানা নতুন রাগ আর বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করে ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নেওয়া আমীর খসরু। 

কোন দূর সমরখন্দ থেকে এসেছিলেন তার যোদ্ধা পিতা। তারপর থেকে ভারতই তার দেশ। ১২৫৩ সালে উত্তর প্রদেশের পাটিয়ালিতে জন্মান খসরু। ভারতের মিশ্র সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদের প্রতীক আমীর খসরু নিজের পরিচয় দিতেন একটি জোড়কলম শব্দে — হিন্দুস্তানীতুর্ক। নিজের ভারতীয় পরিচয়কে অস্বীকার করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।

সাধারণ যে মানুষ-মানুষীর প্রেম ভেঙে যায় বা, খাপ পঞ্চায়েতে ভেঙে দেওয়া হয়, সেই বিয়োগান্তক মালিন্য বোঝাবার জন্য কোন জোড়কলম শব্দ আবিষ্কার হয়েছে কি? এমনিতে 'হাফসোল' বা 'ফুটিয়ে দেওয়া' এই প্রচলিত প্রকাশগুলিতে সে ঘটনার কষ্ট, অপমান, লাঞ্ছনা কোনটাই ঠিকমতো ফোটে না।

তবে ভাষা তো জীবন্ত এবং চিরবর্ধমান। তাই তাড়াতাড়ি তৈরি হোক নতুন নতুন জোড়কলম শব্দ। তাদের প্রতিবেশে ভাসুক বিরহান্তরিতদের ম্লান মুখ। কারণ শব্দ তো কেবল আনন্দই দেয় না, দুঃখের পরিপুর্ণ প্রকাশও তো তারই দায়। 

Developed by DXDasia