“গুরুদেব আমাকে বরণ করে নিলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে”- নন্দলাল বসু

সাহিত্য-শিল্প জগতে রবীন্দ্র-নন্দলাল ঠিক জুটির মতো

চলচ্চিত্র ও শিল্প সমালোচক সত্যজিৎ চৌধুরী একবার বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার বিচার অর্থহীন হয়ে পড়ে, তেমনি নন্দলালের পর্বে পর্বান্তরে বিস্তৃত কাজের সমীক্ষা এড়িয়ে ভারতীয় আধুনিকতার ধারণা দাঁড় করানো যায় না।” তাঁর এই কথার একটা ভিত্তি রয়েছে। সাহিত্য-শিল্প জগতে রবীন্দ্র-নন্দলাল ঠিক জুটির মতো। তাঁদের এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন। 

নন্দলাল বসুর জন্মদিনে গুরুদেব তাঁকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, “কল্যাণীয় শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসু,/ রেখার রহস্য যেথা আগলিছে দ্বার/ সে গোপন কক্ষে জানি জনম তোমার।/ সেথা হতে রচিতেছ রূপের যে নীড়,/ মরুপথ শ্রান্ত সেথা করিতেছে ভিড়।” অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর একটি ছবি এঁকেছিলেন আপনমনে। নন্দলালও পরিকল্পনা করেছিলেন একটি ছবি এঁকে দেবেন। তাঁর এতদিনের সঙ্গী, চলার পথের অনুপ্রেরণা এবং সমালোচককে উদ্দেশ্য করে হাতের সূক্ষ্ম রেখায় তিনি অমোঘ করে রাখবেন তাঁর একান্ত গুরুদেবকে। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ এঁকে ফেলায় আর কিছু আঁকলেন না নন্দলাল। সেদিন নন্দলালের জন্মদিনে গুরুদেবের পাঠানো কবিতাখানিই হয়ে উঠেছিল একমাত্র সম্বল। 

১৯১৪ সালের এপ্রিল মাসে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে আনুষ্ঠানিকভাবে পদার্পণ করলেন নন্দলাল। ১ মে তাঁকে বিশেষভাবে সংবর্ধনা জানালেন রবীন্দ্রনাথ। সেই অনুষ্ঠানে নন্দলালকে উৎসর্গ করে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই কবিতায় লেখা ছিল, “শ্রীমান নন্দলাল বসু পরম কল্যাণীয়েষু,/ তোমার তুলিকা রঞ্জিত করে ভারত-ভারতী-চিত্ত।/ বঙ্গলক্ষ্মী ভাণ্ডারে সে যে যোগায় নূতন বিত্ত।/ তোমার তুলিকা কবির হৃদয় নন্দিত করে, নন্দ!/ তাই তো কবির লেখনী তোমায় পরায় আপন ছন্দ।”

এই অভিবাদনের পর নন্দলালের অবস্থা কেমন ছিল? তিনি লিখেছিলেন, “এই অভিনন্দনের পরে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতির ঘটনা হল। গুরুদেব আমাকে বরণ করে নিলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে। …সহসা আমার মনে হল। আমাতে যেন আমি নেই। আমার দেহটা আছে বটে, তবে অতি স্বচ্ছ হয়ে গেছে। …কবির ভেতর দিয়ে মহর্ষির আশীর্বাদ যেন আমাকে ছুঁয়ে গেল। আমি যেন শান্তিনিকেতনের আশ্রমের অন্তরে প্রবেশ করলুম।”

Developed by DXDasia