একই নামে কুড়ি-পঁচিশটা সোনার দোকান, বাকিটা ইতিহাস

এই গল্প এককালের বিখ্যাত স্বর্ণকার লক্ষ্মীনারায়ণ সেনের

কলকাতা বিস্ময়ের শহর। তার পায়ে পায়ে প্রশ্ন আর পাশাপাশি সাজানো রয়েছে উত্তর। এমন এক অবাক হওয়ার মতো বিষয় ছড়িয়ে রয়েছে চৌরঙ্গী রোডে। রবীন্দ্রসদন মেট্রোর শেষ গেট (টালিগঞ্জ দিয়ে গেলে) থেকে এলগিন রোড মোড় পর্যন্ত লক্ষ্মীবাবুর সোনার দোকান। একই নামে অন্ততপক্ষে বারো থেকে তেরোটি দোকান। কোনওটির নাম ‘লক্ষ্মীবাবুকা আসলি সোনে চাঁদি-কা দুকান’ কোনওটি ‘আসলি লক্ষ্মীবাবুকা সোনে চাঁদি-কা দুকান’ আবার কোনোটি কেবল ‘লক্ষ্মীবাবুকা সোনে চাঁদি কা দুকান’ অথবা ‘লক্ষ্মীবাবুকা দুকান’। একই বাড়ির নিচে পাঁচ-ছ’টি একই নামের দোকান। কেন? ভাবলে মনে হতেই পারে কোনও এককালের বিখ্যাত স্বর্ণকার লক্ষ্মীবাবুর শরিকেরা ক্রমশ ছত্রাখান হয়ে গিয়ে ওই একই নামে স্বাধীনভাবে খুলেছে নিজেদের দোকান। একই পরিবার তাই রয়ে গেছে একই পেশায় একই ব্যবসায়, পাশাপাশি। অথচ জানা যাচ্ছে ছবিটি তা নয় একদমই। আসুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক কে এই লক্ষ্মীবাবু। কেনই বা তাঁর নামে পাশাপাশি এতগুলি দোকান, প্রমাণ দিতে মরিয়া যে কে আসল লক্ষ্মীবাবুর দোকান। 

ঘটনা মোটামুটি দেড়শো বছর আগের বলে জানা যায়। হুগলির মানুষ লক্ষ্মীনারায়ণ সেন। বাস করতেন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম অংশে। ব্রিটিশদের অনুরোধে সে জায়গা ছেড়ে দিতে হয় তাঁদের। বদলে ওঁকে বাছতে দেওয়া হয় অন্য কোনও জায়গা। লক্ষ্মীবাবু বেছে নেন চৌরঙ্গী এলাকা। এই এলাকা তখনও প্রায় জঙ্গল হলেও সেই মুহূর্তে কালীঘাট যাওয়ার একমাত্র রাস্তা ছিল এই জঙ্গলের পথ। লক্ষীনারায়ণবাবু নিজের বাড়িতে খোলেন একটি দোকান। ধীরে ধীরে সেই দোকান হয়ে ওঠে দর্শনার্থীদের সোনা-রূপোর গয়না জমা রেখে মন্দিরে যাওয়ার দোকান। ডাকাতি এড়াতেই মানুষ ধীরে ধীরে ভরসা করতে শুরু করেন লক্ষ্মীবাবুর উপর। এইসমস্ত শরনার্থীরা মূলত উত্তরপ্রদেশ, উড়িষ্যা, বিহার এলাকার বাসিন্দা। এরপর ধীরে ধীরে লক্ষ্মীবাবু আসেন সোনা রূপোর ব্যবসায়। ক্রমশ নিজেই হয়ে ওঠেন এক প্রতিষ্ঠান। তাঁর নাম দিয়ে নাম হয় লক্ষ্মীবাবুর সোনা রূপোর দোকান। 

আরও পড়ুন
Gun-গুলি মোর

লক্ষ্মীবাবুর উত্তরপুরুষদের মতে তাঁর এই অসামান্য খ্যাতি অর্জনের পর সেই এলাকার অনেকেই নেমে পড়েন সোনার ব্যবসায়। তাঁরা এসে লক্ষ্মীবাবুকে অনুরোধ করেন তাঁর নামটি নিজেদের দোকানে ব্যবহারের জন্য। সহজ সরল সেই যুগের মানুষ লক্ষ্মীবাবু আগুপিছু না ভেবেই রাজিও হয়ে যান এই অনুরোধে। এরপরই শুরু হয় বিপত্তি। একই নামে একই এলাকায় হয়ে দাঁড়ায় প্রায় পঁচিশটি আলাদা দোকান। পারমুটেশন, কম্বিনেশনে যাদের সবারই নাম ওই এক – লক্ষ্মীবাবু, সোনা-চাঁদি, আসলি দুকান। এই বিভ্রাটের মধ্যেই চাপা পড়ে যায় লক্ষ্মীবাবুর আসল দোকানটি। দূরদর্শিতার অভাবে কোনো নথিপত্র না থাকায় প্রমাণ অথবা কোনো মামলাও হয় না বিষয়টি নিয়ে। অনেকেই কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় শাখাও খুলে বসেন ওই একই নামে। পরবর্তীকালে লক্ষ্মীনারায়ণবাবুর নাতিরা বহু কষ্টে বার করেন ট্রেড লাইসেন্স।

তখনকার সেই কুড়ি-পঁচিশটি দোকান এখন এসে ঠেকেছে বারো তেরোটিতে। তবু এই হলমার্কের যুগে এসেও এতগুলি পরিবার লক্ষ্মীবাবুর নাম ভাঙিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে রয়েছে। হয়তো দূরদর্শিতার অভাব ভাবছি আমরা যাকে, তা-ই ওনার কাছে ছিল স্বপ্ন। হয়তো এই দিন দেখতে পেয়েই রাজি হয়েছিলেন লক্ষ্মীবাবু তাঁর নাম ভাঙাতে দিতে। সাদা ফটফটে দোকান, তার মাথার উপর সবুজ বোর্ডে লেখা ‘লক্ষ্মীবাবুকা আসলি সোনে চাঁদিকা দুকান’। এভাবেই ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠেন লক্ষ্মীবাবু। এভাবেই মানুষের বিশ্বাস, ভরসা জিতে যায় দুঃসময়ের সমস্ত দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধিকে হারিয়ে।

Developed by DXDasia