ভিন্ন ধারার ডাক্তার – ২

কবিরাজ হয়ে যদি জীবন অতিহাবাহিত করতে না পারি, তাহলে পাঁচন বেচেই পয়সা রোজগার করব

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে রাজ্য জুড়ে যখন খবরের শিরোনামে প্রায়শই ‘ভুয়ো ডাক্তার’, তখন চিকিৎসক দিবস উদযাপনের মাসে চিকিৎসা ও চিকিৎসক বিষয়ক আলোচনায় উঠে আসে নবীন-প্রাচীন একাধিক ডাক্তারের নাম, চিকিৎসার নৈতিকতা সংক্রান্ত বিস্তর প্রশ্ন, বৃহত্তর ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, পশ্চিমি চিকিৎসার প্রভাব প্রভৃতি প্রসঙ্গও। এই পরিসরে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রইলেন উনিশ শতকের দুজন চিকিৎসক, যারা আদ্যন্ত বিজ্ঞানমনস্ক, এবং প্রাথমিক পর্যায়ে পশ্চিমি চিকিৎসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ সত্বেও বেছে নিয়েছিলেন তথাকথিত ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল সিস্টেম’ অর্থাৎ সমান্তরাল চিকিৎসাপদ্ধতিকে। আজ শেষ কিস্তি।

যামিনী ভূষণ রায় (১ জুলাই ১৮৭৯ – ১১ অগস্ট ১৯২৬)
উনিশ শতকের শেষভাগে আরও এক চিকিৎসককে আমরা দেখতে পাই, যিনি প্রথাগত পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষিত হয়েও আয়ুর্বেদ সাধনায় মনোনিবেশ করেন। বিস্মৃতির অতলে থাকা এই চিকিৎসকের নাম যামিনী ভূষণ রায়, যিনি যামিনী কবিরাজ নামেই স্বনামধন্য ছিলেন। ১ জুলাই ডাক্তার বিধান রায়ের সঙ্গে সঙ্গে এই যামিনী কবিরাজেরও জন্মদিন। অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলার পয়োগ্রামে যামিনী ভূষণের জন্ম। বাবা ছিলেন বাংলার জনপ্রিয় কবিরাজ কবিচিন্তামণি শ্রী পঞ্চানন রায়। শৈশবে শিক্ষার জন্য যামিনী ভূষণকে পাঠানো হয় কলকাতার স্কুলে। ভবানীপুরের সাউথ সাবার্বান হাই স্কুল থেকে মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে তিনি বিদ্যালয়ের পঠনপাঠন শেষ করেন। এরপর বি.এ পড়ার জন্য নিজেই ভর্তি হন সংস্কৃত কলেজে। স্নাতক স্তরের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর ডাক্তারি শিক্ষার প্রতি অনুরাগ জন্মায়। বি.এ পড়াকালীন তিনি ভর্তি হযে যান কলিকাতা মেডিকেল কলেজে। সমন্তরালভাবে বাবার কাছে চলতে থাকে আয়ুর্বেদ শিক্ষা। ১৯০৫ সালে যামিনী ভূষণ এম.বি (ব্যাচেলর অব মেডিসিন)পাশ করেন এবং ফাইনাল পরীক্ষায় গোল্ড মেডেল পান। ইতিমধ্যে সংস্কৃতে স্নাতকোত্তর পাঠের জন্য তিনি ভর্তি হন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘গাইনোকলজি ও মিডওয়াইফারি’-তে যামিনী ভূষণ বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন।

কিন্তু ১৯০৬ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, পাশ্চাত্য চিকিৎসার অভ্যাস তাঁর জন্য নয়, অতএব পিতার পরম্পরা ও বাংলার আয়ুর্বেদের ঐতিহ্যকেই তিনি বহন করবেন। সহপাঠী ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষকরা সম্ভাবনাময় সুচিকিৎসক যামিনী ভূষণকে পশ্চিমি চিকিৎসায় থেকে যেতে পরামর্শ দেন। কিন্তু ততক্ষণে তাঁর শিক্ষালাভ শুরু হয়ে গেছে প্রখ্যাত কবিরাজ মহামহোপাধ্যায় বিজয়রত্ন সেনের কাছে। যামিনী ভূষণ তাঁর তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের বলেছিলেন – কবিরাজ হয়ে যদি জীবন অতিহাবাহিত করতে না পারি, তাহলে পাঁচন বেচেই পয়সা রোজগার করব। এই সময় তিনি বগলা মাড়োয়ারি হাসপাতালে আয়ুর্বেদ চিকিৎসক হিসাবে মাসে চল্লিশ টাকা রোজগার করতে শুরু করেন যা সমকালীন সময়ে বেশ বড় অঙ্কের উপার্জন ছিল। ব্রিটিশ শাসক বরাবর ভারতীয় ঐতিহ্য বহনের ব্যাপারে ঔদাসীন্য দেখিয়ে এসেছিল। ফলে আয়ুর্বেদের পরিসরে উন্নততর কাজকর্মের জন্য ডাক্তার রায় আদৌ কোনও সরকারি আনুকূল্য পাননি। তিনি একাধারে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা করতেন বিনামূল্যে, অন্যদিকে জমিদার, এমনকী ইন্দোর কিংবা গোয়ালিয়রের রাজপরিবারের কাছ থেকে রোগী দেখে পারিশ্রমিক নিতেন হাজার টাকা পর্যন্ত, যা তাঁর রোগীরা সানন্দে দিতেন। এইভাবে ডাক্তার রায় অর্থ সংগ্রহ করে ‘বৈদ্যরাজ ফার্মেসি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন, যেখানে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আধুনিক পদ্ধতিতে আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করতে শুরু করেন এবং ‘ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন’-এর ওপর জোর দেন।

১৯১৫ সালে যামিনী ভূষণ মাদ্রাজে সংগঠিত সপ্তম সর্বভারতীয় আয়ুর্বেদ কংগ্রেসের সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। সে সময় দক্ষিণ ভারতে ভ্রমণকালে তিনি মাদ্রাজ আয়ুর্বেদ কলেজের পরিকাঠামোয় মুগ্ধ হয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন কলকাতাতেও এমন কোনও প্রতিষ্ঠান বানানোর, যা পরবর্তী প্রজন্মকে আয়ুর্বেদ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারবে। ১৯১৬ সালে কলকাতায় ফিরে এসে, ২৯ নম্বর ফড়িয়াপুকুর স্ট্রিটে তিনি একটি বাড়ি ভাড়া নেন এবং অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ কলেজ ও হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয় মহাসমারোহে। যামিনী ভূষণ স্বয়ং ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। ক্রমশ এই কলেজ-হাসপাতালের ক্রিয়াকলাপ মহাত্মা গান্ধীকে আকৃষ্ট করে। দীর্ঘ ন’বছরের প্রতীক্ষার পর গান্ধীজী কলকাতায় এসে রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের একটি স্বতন্ত্র স্থানে অধুনা-খ্যাত জে.বি.রায় স্টেট আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিলান্যাস করে যান। এই প্রতিষ্ঠান ২০১৬ সালে তাদের শতবর্ষ উদযাপন করল। এই কলেজ এখনও পূর্ব ভারতের একমাত্র সরকারি আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠান যেখানে স্নাতক স্তরে সাড়ে চার বছরের আয়ুর্বেদ পাঠক্রম পড়ানো হয়।

যামিনী ভূষণ পাতিপুকুরে হাসপাতাল তৈরির জন্য বারো বিঘা জমি দান করেন, যেখানে বর্তমানে পাতিপুকুর টি.বি হাসপাতাল অবস্থিত। হাসপাতালের শিলান্যাস করেছিলেন চিকিৎসক ও রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। চিকিৎসা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি যামিনী ভূষণের জীবনে চলতে থাকে আয়ুর্বেদের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বই লেখার কাজও। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত যামিনী ভূষণ ছিলেন অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ মহাবিদ্যালয়ের জন্য নিবেদিত প্রাণ। ১৯২৬ সালের অগস্ট মাসে তিনি তাঁর সঞ্চয়ের দু’লক্ষ টাকা কলেজের উন্নয়নের জন্য দান করেন। এর অব্যবহিত পর তাঁর অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ঘটে, মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়সে।

এই একবিংশ শতকের প্রথম দশকে দাঁড়িয়ে মহেন্দ্রলাল ও যামিনী ভূষণদের মতো উদারচিত্ত চিকিৎসকদের ইতিহাসকে প্রেক্ষাপটে রেখে আমরা এমন এক দেশ, এমন এক সমাজব্যবস্থা আকাঙ্ক্ষা করতেই পারি, যেখানে দেশের প্রতিটা মানুষ সমস্ত রকম চিকিৎসার সুবন্দোবস্ত পাবে। তৈরি হবে এমন কোনও পরিকাঠামো, যেখানে একাধিক মেডিকেল সিস্টেমের মধ্যে থেকে নাগরিকরা বেছে নিতে পারবেন তাঁদের পছন্দসই ও যথোপযুক্ত চিকিৎসার ধারা। এবং, যেখানে ‘সেন্ট্রাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ান মেডিসিন’ তাদের পাঠক্রমে বহুদিন আগেই আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি ও ইউনানির সঙ্গে সংযুক্ত করেছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহুবিধ অত্যাবশ্যকীয় বিষয়, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘কিওর’-এর সঙ্গে সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে ‘প্রিভেনশন’-এর ওপরেও, যেখানে পশ্চিমি চিকিৎসার ধারক বাহকেরা ক্রমশ ওয়াকিবহাল হতে চাইছেন অন্যান্য মেডিকেল সিস্টেম সম্পর্কে, সেখানে এই দেশে, এক ছাদের নিচে একাধিক চিকিৎসার ধারার সহাবস্থান যে নেহাত ইউটোপিয়া নয়, সেকথা ভাবার সময় বোধ করি এসেছে।

Developed by DXDasia