ভারতের প্রথম কৃষক আন্দোলনে রক্ত আর ঘামে ভিজেছিল বাংলার মাটি

সেই সময়কার কথা, যখন বাংলা ভাগাভাগি হয়ে যায়নি

বর্তমান ভারতের কৃষক আন্দোলন মনে করিয়ে দেয় অনেককিছুই। মনে করিয়ে দেয়, ভারতে এই আন্দোলনের যাত্রাপথ। এই বাংলাতেই রয়েছে তার শিকড়। সেই সময়কার কথা, যখন বাংলা ভাগাভাগি হয়ে যায়নি, ভারতে একাধিক কৃষক বিদ্রোহ চলছে, তাদের দাবি জানাচ্ছে। ঔপনিবেশিক যুগে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ এতটাই তীব্র হয়েছিল যে, বাংলার কৃষকরা ব্রিটিশদের বাধ্য করেছিল নতুন আইন পাস করাতে এবং সারা ভারতে সেই প্রথম কৃষক বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।

১৭৭৭ সাল, ফরাসী সাহেব লুই বোনার্ড ভারতে নীল রোপণ করে ভারতীয়দের সঙ্গে নীল-এর পরিচয় করান। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম নীলকর। হুগলির চন্দননগরের কাছে তালডাঙ্গা ও গোয়ালপাড়ায় নীল চাষ শুরু করেন তিনি। বাংলা তখন নবাবদের অধীনে, ইউরোপে নীল রঙের চাহিদা থাকায় নীল রোপণ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে। বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম এবং উত্তর ২৪ পরগনার বৃহৎ অংশে অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে নীল চাষ। নীলকররা কৃষকদের খাদ্য-ফসলের পরিবর্তে নীল রোপণ করতে রাজি করিয়েছিল। তারা খুব চড়া সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে, যা আমরা ‘দাদন’ বলেই জানি। একবার একজন কৃষক ঋণ নিলে তাকে সারাজীবন ঋণে ডুবে থাকতে হত, শুধু তাই নয়, তার পরবর্তী প্রজন্মকেও সেই ঋণের বোঝা টানতে হত। নীলকররা যা দাম ধার্য্য করেছিল, তা বাজারমূল্যের মাত্র ২.৫% ছিল। নীলচাষ করে কোনওভাবেই লাভের মুখ দেখতে পায় না কৃষকরা। কৃষকরা নীলকরদের কাছ থেকে কখনই নিরাপদ ছিল না। যে সব কৃষকরা নিজেদের সর্বস্ব বন্ধক রাখত, নীলকরদের কথা মানতে রাজি না হলে তাদেরকে দেউলিয়া করার পন্থা অবলম্বন করেছিল। সরকারী বিধি ছিল নীলকরদের পক্ষে, এমনকি স্থানীয় জমিদাররা তাদের নিজেদের স্বার্থে নীলকরদের পক্ষ নিয়েছিল। এই মারাত্মক নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে কৃষকরা বিদ্রোহ শুরু করে।

মধ্যবিত্ত বাঙালিরা কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেই বিদ্রোহ আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছিল। যখন দীনবন্ধু মিত্র তাঁর নাটক ‘নীলদর্পন’ মঞ্চস্থ করায় তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নাটকটি নিষিদ্ধ বলে ঘোষনা করে, সেইসময় হরিশচন্দ্র মুখার্জী তাঁর পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু প্যাট্রিয়ট’-এ গরীব কৃষকদের দুর্দশার যথাসম্ভব বর্ণনা দিয়েছিলেন। ১৮৫৯ সালে প্রথম বিদ্রোহের ঝড় ওঠে নদিয়ার গোবিন্দপুর আর চৌগাছা গ্রাম থেকে। সেখানে তাঁদের নেতৃত্ব দেন বিষ্ণুচরণ এবং দামোদর বিশ্বাস। তারপর সেই ঝড় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান, পাবনা, খুলনা এবং নরাইলে। কয়েকজন নীলকরকে জনতার আদালতে দাঁড় করিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নীলের গুদামে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অনেক নীলকর ধরা না পড়ায় পালিয়ে যায়। নীলকরদের পক্ষপাতী জমিদারদের ওপরেও কৃষকদের লক্ষ্য ছিল।

কিন্তু, ব্রিটিশরা নির্মমভাবে কৃষকদের সেই বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা করে। ব্রিটিশ সরকার এবং জমিদারদের বিশাল সেনাবাহিনীর প্রকোপে নিষ্ঠুরভাবে খুন হয় বহু কৃষকই। ফাঁসিতে চড়ানো হয় বিশ্বনাথ সর্দারের মতো নেতাদের। নদিয়ার বিশ্বাস ভাইযুগল, পাবনার কাদের মোল্লা এবং মালদার রফিকুল মণ্ডল -এরা ছিল আন্দোলনের জনপ্রিয় নেতা।ঐতিহাসিক যোগেশ চন্দ্র বগল এই বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম অহিংস বিদ্রোহ বলে বর্ণনা করেছেন, যা পরে মহাত্মা গান্ধীর দ্বারা সফলভাবে গৃহীত হয়েছিল (আর সি মজুমদারের ‘বাংলার ইতিহাস’-এ তাই বলেছেন)। সরকারের উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল কৃষকদের সেই বিদ্রোহ, যার ফলে অবিলম্বে ১৮৬০ সালে নিয়োগ করা হয় ‘ইন্ডিগো বা নীল কমিশন’। কমিশনের রিপোর্টে ই ডাব্লুউ এল টাওয়ার উল্লেখ করেছে যে, ‘মানুষের রক্তের দাগ ছাড়া নীলের একটা কণাও ইংল্যাণ্ডে পৌঁছাবে না।’ শেষপর্যন্ত, ১৮৬২ সালে নীলকরদের নিপীড়ন পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য ‘নীল আইন’ কার্যকর হয় বাংলার কৃষক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।        

Written by
Developed by DXDasia