বিশ্বকাপের মরশুমে ‘দেশীয়’ পরিচয় গুলিয়ে ফেলাই বাঙালির দস্তুর
সেই কবে নীহাররঞ্জন গুপ্ত বলেছিলেন, বাঙালির চরিত্র বেতলতার মতো। সে যাই পায়— বেজাতের, বেরঙের বা বেঢঙের—সবই ধারণ করে নেয়। বলা ভালো হজম করে নেয়। এমনিতে পেট পাতলা জাতি হলেও এই বহুবিচিত্র রুচিকে গিলে তৃপ্তিতে ঢেঁকুর তুলতে আর অসুবিধে হয় না। পণ্ডিতেরা তার ভোকাবুলারি ছানবিন করেছেন, নৃতত্ত্বে টর্চ ফেলেছেন। দেখা গেছে, বঙ্গভূমিতে পা রাখা প্রায় কোনও জাতিকেই সে ছাড়েনি। পর্তুগিজ হার্মাদ বা পশ্চিম ভারতীয় বর্গি— এ ভূখণ্ডে এল ডাকাতি করতে। তারা যা লুট করবার করল, বাঙালিরা তাদের থেকে লুটে নিল শব্দ, পরব, সংস্কৃতির নানা রস। সে রস মিষ্টি হোক বা তেতো—বাঙালি নিজেকে কখনই বঞ্চিত করেনি তার থেকে। তার হৃদয় অগাধ। ভূগোল ছোট বা মাঝারি, তার ভিতরের জায়গা অপার। কাউকেই সে ফেলে না। জাস্ট নিজের ভিতরে নিয়ে নেয়। তবে, এসবই প্রাক বিশ্বযুদ্ধ সময়ের কথা। বিশ্বযুদ্ধের পরে আরেকটা নতুন ফেনোমেনা দেখা গেছে তার সামাজিক জিনে। যেসব জাতি তদ্দিনে কাঁটাতারে বিভক্ত ভঙ্গ বঙ্গদেশে পা রাখেনি, তাদেরও দিব্য গ্রহণ করে নিতে শুরু করেছে সে।
লেখার শুরুতেই এই এত্তবড় ঢপ কী দেখে বিশ্বাস করবেন? না না, আপনাদের বারো মাসে তেরো পাব্বনের ক্লিশে উদাহরণের দিকে মোটেও ঠেলব না। আপনারা বরং বিশ্বকাপের দিকে তাকান। সেই মাধ্যমিকে ভাব-সম্প্রসারণ আসত বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যে কবিতা, তার বিচ্ছিরি অনুকরণ করে বলা যায়— একবার বিশ্বকাপের দিকে তাকাও/ একবার নিজের দিকে। বিশ্বকাপ বলতে ফুটবলের বিশ্বকাপ। খেলা এমনিতে অনেক আছে, এ কথা বুক ধড়ফড়, পিলে রোগে ভোগা বাঙালিমাত্রেও বিশ্বাস করে বৈকি। কিন্তু বিশ্বকাপ বলতে সে ফুটবলই বোঝে। মাঝে কিছুকালের জন্য অবশ্য কোনও এক জনৈক গঙ্গোপাধ্যায় বংশের সন্তানের জন্য তার মতিভ্রম হয়েছিল। এখন আবার ব্যাক টু দ্য ট্র্যাক।
যাহোক, যুগপৎ বিশ্বকাপ ও নিজেদের দিকে তাকালে দেখবেন, আপনারাই কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ হালে ফ্রান্স, হাল-তরয় স্পেন বা হাল-তময় পর্তুগাল, ইতি-উতি কেউ কেউ জার্মানি বা (ঔপনিবেশিক প্রভুর প্রতি থেকে যাওয়া মোহে?) ইংল্যান্ড। এই পোড়া দেশে একুশ শতকীয় বিশ্বগ্রামের যুগেও জাতীয়তাবাদের পারদ রোজ চড়ছে। বাংলার মাটি কোনও এক কালে কোনও এক পক্ষের দুর্জয় ঘাঁটি থাকলেও, সেই ক্রমবর্ধমান জাতীয়তার পারদের ভিতর ইদানিং এই পোড়া ভূখণ্ডও আছে। কে, কতটা ভারতীয়, কে কত সহজে দেশদ্রোহী—এসব চক্করে ইদানিং সেও মাঝেমাঝে মাথা ঘামায়। এবং তারপরে বিশ্বকাপ এলেই পাড়ার মোড়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেনের পতাকা টাঙিয়ে রাখে। মেসি বা রোনাল্ডো লেখা জার্সি পরে, মুখে নানা দেশের পতাকা এঁকে উদমা হৈ-হল্লা করে। কত বন্ধুত্ব এই কদিন ভেঙে যায়, কত শত্তুরকে ভাতৃভাবে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। প্রেমিকার ফোন এলে বিরক্তি হয়, মোটা মাইনের অফিস ছেড়ে দিতে সাধ হয় অফিস টাইম আর খেলার সময় সমাপতিত হলে। কে আর তখন দক্ষিণের ঘটি বা শিকড় উপড়ে আসা ঢাকাইয়া বাঙাল! সবার ভিতরে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ সত্য, তাহার ওপরে নাই। থুড়ি আছে। মারাদোনা বা পেলে। মেসি, নেইমার বা রোনাল্ডো। বুঝলেন না? পাগল না মাড়োয়ারি ভাই?
আরও পড়ুন
একটি ‘মনোহর’ আখড়ার গপ্পো
মোদ্দায় বিশ্বকাপের মরশুমে ‘দেশীয়’ পরিচয় গুলিয়ে ফেলাই বাঙালির দস্তুর। সে তখন হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া আর্জেন্টাইন, নয় তো লুঙ্গিপরিহিত ব্রাজিলিয়ান। আর, এই ‘আইন্ডেন্টিটি’ তীব্র আবেগময়। আমাদের পাড়ার তপুদা হল্যান্ডের সাপোর্টার। হল্যান্ডের সমর্থক আবার কেউ হয় নাকি! এ এমন দেশ, যার খেলা ভালোবাসতে হয়, কিন্তু সমর্থন নৈব নৈব চ। অনেকটা সিনেমা পরিচালনায় অপর্ণা সেনের মতো। সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল সেনের ভক্তকুল স্বাভাবিক। এমনকি, ঋতুপর্ণর সিনেমার অন্ধ অনুরাগীও বাস্তব। কিন্তু অপর্ণা সেনের সিনেমা ভালো লাগার, বেজায় ভালো লাগার, ফ্যান হওয়ার নয়। এই বাজারেও তপুদা হল্যান্ডের সমর্থক, অতএব প্রান্তিক। তাকে সবাই খচায়, মজা করে, খোঁটা দেয়। তপুদার ভিতরের অস্তিত্বটাও এই হল্যান্ড-মার্কা হয়ে গেছিল ক্রমশ। প্রতিভাবান, কিন্তু অর্জন নেই। ভালো ছাত্র, চাকরি নেই। তা এই তপুদা একবার বেজায় ক্ষেপে গেল গোপাদা অ্যান্ড কোং-এর ওপর। তারা কট্টর ব্রাজিল। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল-হল্যান্ড মুখোমুখি। তপুদাকে সবাই বলেছিল ব্রাজিল হুহা জিতবে। তপু দা আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সাহস পায়নি। খোঁচা হজম করে গুম হয়ে ছিল। হল্যান্ড গেল জিতে। আজীবন শান্ত তপুদা একটা অদ্ভুত চাপা গর্জন করতে করতে বাড়ি থেকে বেরোল হাতে থান ইঁট নিয়ে। গোপাদার দোকানের কাচ ভাঙবে। সে যাত্রা বাকিরা তাকে শান্ত করেছিল। আর, এই ঘটনায় তপুদাকে পরোক্ষ সাপোর্ট দিয়েছিল পলাশরা। যারা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। এরপর, ২০১৪-র সেমিফাইনালে যখন হল্যান্ড-আর্জেন্টিনা পড়ল, তখন এই সমীকরণও গুলিয়ে গু। আর অন্য সেমিফাইনালে ৭-১-এর বীভৎস ধাক্কার পরে পাড়ার একটা বড় অংশে অঘোষিত অশৌচ চলেছিল দিন তিনেক।
মাঝেমাঝে মনে হয়, ভারত বিশ্বকাপে খেলে না বলে বাঙালির অন্তত কোনও অভাববোধ নেই। সে দিব্যি আছে। পেলে বল নিয়ে দৌড়োলে তার ভিতরের শোষিতের জিনে হাওয়া লাগে। কালো পেলের জয়, তারই জয়। গ্যারিঞ্চা স্টেশনে মাল পৌঁছে দিতে দিতে পায়ে ড্রিবল বুনে ফেললে সে মনে করে, এই পোড়া দেশের একজনই সমস্ত না পাওয়াকে কাটিয়ে কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে গোলের দিকে। সাদা চামড়ার ক্রুয়েফের টার্ন তার শিল্পবোধকে মুগ্ধতায় নির্বাক করে তোলে। জার্মান তো আসলে বাঙালদের মতোই। ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’ টাইপ। এবং মারাদোনা। একটা আপাদমস্তক বিতর্কিত, খ্যাপাটে বেঁটে জাদুকর। যিনি হাত দিয়ে গোল করে সেই প্রতারণা ভুলিয়ে দেন পরের গোলে। বাঙালি একে ভালো না বেসে পারে? ফলে এতদিনের ব্রাজিলিয়ান সাম্রাজ্যেরও প্রতিদ্বন্দ্বী জন্ম নিয়ে নেয়। প্রায় আড়াআড়ি বিভাজন। আর, বাকিটা ভাগাভাগি করে দখলে রাখে জার্মানি, কখনও জিদানের ফ্রান্স বা স্পেনের অলৌকিক টিকিটাকা এবং ইপিএলের হইহই বাজারে ইংল্যান্ড। বাঙালি বোষ্টুমের জাত। ‘সেবা’ মতে সাধনা আর মধুর রসে সাধনা তাদের হৃদয়ে সমাপতিত। এই দখলদারির তত্ত্ব সে ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেয়। দখল আবার কী? উপনিবেশের দাসত্ব আর মুগ্ধতার অনুরাগ এক নাকি? আবেগের নাম ফুটবল। আর তারই মহোৎসব বিশ্বকাপ।
বঙ্গবাসীর কাছে এই কদিন সত্যিই— দেশ একটা বিমূর্ত শব্দ।