মনীষী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-র অজানা দিক
মুহাম্মদ লুৎফুল হক
ইংরেজ শাসনামলে বাঙালিকে অসামরিক জাতি হিসেবে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, সরলাদেবীসহ আরও অনেকে লেখনী, যুদ্ধে যোগদানের আগ্রহ, অন্যান্য কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অসামরিক জাতির কলঙ্ক ঘোচানোর চেষ্টা করেন। এতে বিশেষ ফল লাভ না হলেও প্রথম মহাযুদ্ধকালে বাঙালির জন্য সেনাবাহিনীতে যোগদানের সুযোগ আসে। বাঙালির প্রবল সামাজিক আন্দোলনের ফলস্বরূপ গঠিত হয় ‘বাঙালি পল্টন’, যার নাম ছিল ‘ফর্টিনাইনথ্ বেঙ্গলি রেজিমেন্ট’। যেসব বাঙালি নেতার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং প্রচেষ্টার ফলে বাঙালি পল্টন গঠন হয়েছিল, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
১৯১৬ সালে গঠিত বাঙালি পল্টনের সফলতার জন্য বাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সর্বাত্মক সহযোগিতা দেন। তাঁরা এর সফলতার জন্য কলকাতায় ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি’ নামের একটি বেসামরিক সংস্থা গঠন করেন। বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটির প্রধান দায়িত্ব ছিল বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা, সৈনিক ভর্তিতে সরকারকে সহযোগিতা করা, এর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা ইত্যাদি। প্রাথমিকভাবে বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমিটি প্রতি জেলায় একজনকে পল্টন গঠনে সহযোগিতা করার দায়িত্ব দেয়। রাজশাহীতে পল্টন গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, তাঁর নাম ১৯১৬ সালের ২৯ আগস্ট দ্য বেঙ্গলি পত্রিকায় প্রকাশ পায়।
আরও পড়ুন
বারীন ঘোষের ‘জেলভাঙার চক্রান্ত’
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রাজশাহীতে বাঙালি পল্টন গঠনে সহযোগিতা করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যকেও বাঙালি পল্টনে যোগদানের অনুমতি দেন। মনবাহাদুর সিংহ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র দত্তক পুত্র ছিলেন। ১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে মনবাহাদুর কলকাতায় এসে বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। চাকরিকালে মনবাহাদুর ভারতীয় কমিশন পান এবং সুবেদার (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ) পদে উন্নীত হন।
প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে বাঙালির সামরিক ইতিহাস নিয়ে রাজেন্দ্রলাল আচার্য ‘বাঙালির বল’ নামের একটি গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থে বাঙালি পল্টনসহ বাঙালির বিভিন্ন সময়ের সামরিক অর্জন বা কৃতিত্ব তুলে ধরেন। গ্রন্থে অক্ষয়কুমারের মন্তব্য সংযোজন করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, ‘যিনি এই বহু তথ্যপূর্ণ বৃহৎ গ্রন্থ আদ্যন্ত পাঠ করিবেন, তিনিই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিবেন, ইহাতে জানিবার ও ভাবিবার কথার অভাব নাই। কি সেকালে কি একালে কোনো কালেই বাঙ্গালীর বাহুবলের অভাব থাকা স্বীকার করা যায় না। বিগত জগদ্ব্যাপী মহাযুদ্ধেও বাঙ্গালী বাহুবলের পরিচয় দিয়া সমগ্র সভ্য সমাজের নিকট পুনঃ পুনঃ প্রশংসা লাভ করিয়াছে। …যাঁহারা দেশের লোক, দেশের অভ্যুত্থানের জন্য আগ্রহপূর্ণ, তাঁহারা অবশ্যই এরূপ গ্রন্থের সমাদর করিতে ক্রটি করিবেন না। এই শ্রেণীর গ্রন্থ সঙ্কলনের প্রয়োজন আছে। একখানি গ্রন্থে সে প্রয়োজন পর্যাপ্তরূপে সিদ্ধ হইয়া যায় নাই।’
(ঋণ – প্রথম আলো)