
প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা ১ : হিয়া মুখোপাধ্যায়
সে বছর প্রেমের মড়ক লেগেছিলো। আকাশ বাতাস মুখরিত করে অসময়ের আগমনীর মতো শুধুই প্রেম বাজছিলো রাত দিন এক করে। আর সময়টাকেও সংশয়াতীতভাবে বসন্ত হতেই হতো। প্রেমের ওরকম সংক্রামক আবহাওয়ার মধ্যে গা সামলে চলতে চলতেই, এরো-র মনে খচ করে একটা প্রেম ঢুকে পড়ে। কেউ একটা কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার বনের মধ্যে দাঁড়িয়ে হ্যামিলটোনিয়ান স্পেসের মেকানিক্স বুঝিয়ে উঠতে চাইলে, এরোর যে কী হয়…কী হয়…! রোগগ্রস্তের মতো ফস করে সে বলে ফ্যালে- ‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই/ দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই/ তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই/ শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই।’ হ্যামিলটন মোটেই চমৎকৃত হয় না। সে গম্ভীর মুখে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘না না, তোকে আমি মোটেই সেই চোখে দেখি না!’ কৃষ্ণচূড়ার এমন ঘোরতর আশকারার নিচে এমন একটা ঘোর ড্রামাটিক প্রেম নিবেদন এভাবে জলে যাওয়ায় এরোর ভারি মন খারাপ হয়।
সে ভগ্নোমনোরথে গুটিগুটি পায়ে ক্যান্টিনে এসে দাঁড়ায়। দ্যাখে সেখানেও আজব সব লিলিলিলি চলছে। উজ্জ্বল চেহারার কারা জানি সব গিটারে একসাথে বোল তুলেছে ‘আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি/ তুমি অবসর মতো বাসিও।’ এরো ভাবে খুব তো ভয়ানক দাবি নয়! অবসরের খুচরো মুহূর্তটুকু তো তার মতো নিতান্ত এলেবেলে কারো জন্য বরাদ্দ করাই যেত! গিটার কাঁধে এক ঝাঁকরাচুলো এসে তার চটক ভাঙায়। জিজ্ঞাসা করে, ‘কফি খাবি?’ আর কী আশ্চর্য, তৎক্ষণাৎ সে ঝাঁকরাচুলোর প্রেমে পড়ে যায়! সে দ্যাখে নিজেরই অজান্তে সে ফের বিড়বিড় করে উঠছে, ‘সংকোচে জানাই আজ/ একবার মুগ্ধ হতে চাই’।
ঝাঁকরাচুলো মুহূর্তেই উদাস হয়ে যায়। বলে- ‘কিন্তু আমি যে তমুককে কথা দিয়েছি রে…’। ক-এর কানে আর ঢোকে না কিছু। এবার বেমালুম বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে উঠে সে এক ছুট্টে ক্যান্টিন, পোর্টিকো, বাস্কেটবল কোর্ট, উত্তর কলকাতার অলি গলি, খালপাড়, হরিজন বস্তি, বে আক্কেলে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার বন-এই সব পেরিয়ে ঘরে এসে খিল তোলে আর বালিশে মুখ গুঁজে দেয়। সূর্যাস্তের ঠিক মুখে জানলায় চোখ পড়লে দ্যাখে বাইরে তখনো আজগুবি কালবৈশাখীর মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রেম। কবিতায়, গল্পে, গানে এত এত চর্চা প্রেম নিয়ে! অথচ সবই শুধু ইন্ধনমূলক! এই যে এরোর এখন বিশ্রী কষ্ট হচ্ছে; সত্যি বলতে কী, মরে যাওয়ার সময়ও বোধহয় এরকমই কষ্ট হয়- এই নিদারুণ, অস্তিত্ব এফোঁড় ওফোঁড় করে দেওয়া মনখারাপ নিয়ে এখন সে কোন শিল্পের কাছে যাবে? ‘যদি আরো কারে ভালোবাসো/ যদি আর ফিরে নাহি আসো…’? দূর দূর! কিছুতেই না! উলটে প্রেমাষ্পদর টাইফয়েড বা ওলাওঠা হলে খানিকটা স্বস্তি পেতো এরো। তার মনে পড়ে, কোথায় সে জানি শুনেছিলো, কবিদের প্রেম ভেঙে গেলে তারা দর্শনের দিকে ঝোঁকে। সেই দমবন্ধ বসন্তের সন্ধেয় ল্যাপটপের নীলচে আলোর সামনে বসে ক ভাবে, এবার একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলতে হবে! ভারি তো প্রেম!
তরুণ কার্ল মার্ক্সও নাকি জেনির প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে চার চারটে ডায়রি ভরিয়ে কবিতা লিখে প্রেম নিবেদন করেছিলেন? বিপ্লব এলেও সবাই যখন রাস্তায় ফূর্তিতে লংমার্চ করবে তখনো বুঝি একা ঘরে পাশবালিশ জড়িয়ে এরো ফ্যাঁচফেঁচিয়ে কাঁদবে একা একা?
বায়োলজিতে সে কি শেখেনি? সবই পিটুইটারি গ্রন্থি? সবই ডোপামাইন, অক্সিটোসিন…? মস্তিষ্কপ্রসূত কেমিক্যাল লোচা? নেহাত দাঁড়িপাল্লা একদিকে হেলে পড়েছে বসন্তের দোষে! সে কি পারবে না কোনো একটা পালটা যুক্তি খুঁজে বের করতে? সে দ্যাখে দার্শনিকরা সেই কবে থেকে প্রেম সম্পর্কে গালভরা, শক্তপোক্ত অথচ আখেরে ভারি ভালো ভালো কথা লিখে গেছেন। সেই প্লেটো থেকে শুরু! আদিতে নাকি মানুষের দুটো করে মাথা, চারটে হাত আর চারটে করে পা ছিলো। দেবরাজ জিউস নাকি ভেবেছিলাম দু-দুটো মাথা আর চার চারটে হাত পা ওয়ালা মানুষ কালে কালে দেবতাদের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে! তাই হিংসুটে প্রেমিকের মতোই তিনি মানুষকে মাঝবরাবর চিরে দিলেন দুই ভাগে। সে ইস্তক এক এক ভাগ তাদের অন্য ভাগকে খুঁজে চলেছে হন্যে হয়ে। খুঁজে পেলেই প্রেম হয়ে যায়! তাহলে যারা ক-কে ফিরিয়ে দিলো? নির্ঘাত খাপে খাপে এঁটে বসবে না বলেই? তাহলে ভুল জিগ স পাজলের টুকরোর জন্য বুঝি কারো এত কষ্ট হয়? সে পড়ে আরবি মতে প্রেমের সাতটি স্তর-দিলকশি বা আকর্ষণ, উনস বা অনুরাগ, ইশক বা ভালোবাসা, আকিদত বা শ্রদ্ধা, ইবাদত বা পূজা আর সবশেষে মউত বা মৃত্যু। কিন্তু সে যে সোজা স্টেপ জাম্প করে মউতে এসে পৌঁছেছে! সে দ্যাখে অ্যালান বাদিউ তার ‘ইন প্রেইজ অফ লাভ’ বইতে বলছেন- “Love without risk is an impossibility, like war without death.” কিন্তু যুদ্ধে যারা হেরে গেল তারা? সে দেখছে স্লাভয় জিজেক বলছেন- “Love feels like a great misfortune, a monstrous parasite, a permanent state of emergency that ruins all small pleasures. But I am not happy when I am not in love.” বাহ! তাহলে তো মিটেই গেলো!
আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা : ভালোবাসা
এমন বিশ্রী, দমবন্ধ একটা বসন্তে এরো স্রেফ প্রেমে দাগা খেয়ে মরে গেলেও দর্শনশাস্ত্রের কিচ্ছুটি যায় আসবে না! এমনকি ‘রোম্যান্টিক লাভ’ নামক জন্তটাকে স্রেফ পুঁজিবাদী ধাপ্পা হিসেবে ওড়াতে গিয়েও দ্যাখে এমা ওয়াল্ডম্যানের মতো দাপুটে অ্যানার্কিস্ট নেত্রীও বলে গেছেন বিয়ে টিয়ে বুর্জোয়া চক্রান্ত হলেও, প্রেম আসলে নিখাদ মুক্তি! তরুণ কার্ল মার্ক্সও নাকি জেনির প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে চার চারটে ডায়রি ভরিয়ে কবিতা লিখে প্রেম নিবেদন করেছিলেন? বিপ্লব এলেও সবাই যখন রাস্তায় ফূর্তিতে লংমার্চ করবে তখনো বুঝি একা ঘরে পাশবালিশ জড়িয়ে এরো ফ্যাঁচফেঁচিয়ে কাঁদবে একা একা? এ কোনদেশি মুক্তি? এরো ভাবে, সবটাই চক্রান্ত। তলে তলে সব্বাই একজোট হয়ে একটা নিঘিন্নে জিনিসকে অকারণে মাথায় তুলেছে। সে ভাবে, আর কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক, প্রেম আসলে মানবমুক্তির এক ও অভ্রান্ত শত্রু। প্রেমে পড়লে মানুষের কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়। সারাদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে মহম্মদ রফি অথবা এনরিকে ইগলেসিয়াস শুনতে ইচ্ছে করে। ক্লাস টেস্টের পড়া মাথায় ওঠে। খিদে টিদেও পায় না বিশেষ। ঘুমও না। সাধে প্রেমে কেউ ওপরে ওঠে না! সবটাই নিম্নগামী। সবটাই পতন। মনে মনে একটা জবরদস্ত নামও ঠিক করে ফেলে সে- ‘অ্যান্টি লাভ স্কোয়াড’।
প্রেমে পড়লে মানুষের কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়। সারাদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে মহম্মদ রফি অথবা এনরিকে ইগলেসিয়াস শুনতে ইচ্ছে করে। ক্লাস টেস্টের পড়া মাথায় ওঠে। খিদে টিদেও পায় না বিশেষ। ঘুমও না।
এরো ঠিক করে, অ্যান্টি লাভ স্কোয়াডের ম্যানিফেস্টোও এই তাকেই লিখে ফেলতে হবে। মোজেসের ঈশ্বরদর্শনও তো এভাবেই হয়েছিলো! আর প্রফেটদের তুচ্ছ অক্সিটোসিন হর্মোনের জন্য ঘুম নষ্ট করার মানে হয় না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করতেি করতে, মাথার মধ্যে প্রেমের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে ভোরের দিকে কখন জানি ঘুমিয়ে পড়ে এরো। তারপর সক্কাল সক্কাল ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়ে। বাতাসে তখনো গুজবের মতো প্রেম ভাসছে। হাল্কা গোলাপি পর্দায় ঘেরা আলোর নিচে জোড়ায় জোড়ায় দম্পতি গুটগুটুর করছে গোটা শহর জুড়ে। অসহ্য! করুক গে যা করার। যিশু ক্ষমা করে দিয়েছিলেন না সব্বাইকে? কবি বলেননি ‘অন্ধজনে দেহ আলো?’। এরো সবাইকে বুঝে নেবে। কলেজের গেটে আচমকাই তাস-এর সঙ্গে মোলাকাত। মনকেমন করা চোখমুখ। চোখের নিচে কালি। বাঁ হাতের নখ খুঁটছে বাদবাকিদের হইহল্লার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে। কী হয়েছে জিগাতে বলে ‘প্রেম খুব খারাপ জিনিস বুঝলি।’ মুহূর্তেই এরোর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বিপ্লবে লেনিনেরও তো একজন ট্রটস্কির দরকার পড়েছিলো! সে বলে ‘অ্যান্টি লাভ স্কোয়াডের ম্যানিফেস্টো লিখবি আমার সাথে?’
আর তারপর? অদৃশ্য অর্কেস্ট্রার কেউ একটা দূরে কোথাও পিয়ানোর বোতামে চাপ দেয়। একটা অশ্রুত সিম্ফনি বেজে ওঠে আপনা থেকেই। আর ষড়যন্ত্রমুলক সেই বসন্তের সকালে এরো আর তাসের অজান্তেই ওদের মধ্যেও দ্রুতগামী রেলগাড়ির মতো একটা জলজ্যান্ত প্রেম ঢুকে পড়ে।
____
প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা | হিয়া মুখোপাধ্যায় | Valentine's Day | ভ্যালেন্টাইন্স ডে

