ভারত-চিনের মধ্যে শিক্ষণীয় এক সাঁকো তৈরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও তান-য়ুন-শান

ভারত ও চিনকে মননের কেন্দ্রে রেখে বইও লিখেছিলেন চিনা ভবনের কর্ণধার তান

সেই কোন পুরোনো সময়ের কথা! চিন দেশের থেকে কত পর্যটক এসেছেন ভারতবর্ষের রাজা রাজরার দরবারে। উদ্দেশ্য শুধুই মনের খোরাক পাওয়া— নির্ভেজাল জ্ঞান অর্জন। দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই যে মননের বিনিময়, মনের সেতু— তা বুঝি অনন্ত! সেই কারণে যখন বিশ্বভারতীকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ এক আশ্চর্য নতুন জ্ঞানচর্চা ও বৌদ্ধিক বিনিময় শুরু করলেন, তখন ইতিহাস আবার পুনরাবৃত্ত হল যেন! ভারত ও চিনের মধ্যে বিনিসুতোর মালার মতোই এলেন এক জ্ঞানতাপস— তান-য়ুন-শান। আজকের কথকতা তাঁকে নিয়ে। 

তান-য়ুন-শান ছিলেন চিন ভবনের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ। প্রতিটি মানুষের জন্ম মুহূর্তেই তাঁর গোটা জীবনের কর্মপ্রবাহের গতি নির্দিষ্ট হয়ে যায়, এ পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকারই লোকবিশ্বাস। কাকতালীয় কিনা জানি না, ১৯০১ সালটি বিশ্বভারতী ও তান-য়ুন-শান উভয়েরই জন্মসাল। সুদূর চিন দেশে যে ছেলেটি জন্ম নিয়েছিলেন, কর্মসূত্রে তিনি ঠিক গিয়ে পৌঁছবেন ভারতবর্ষের এক লালমাটির গ্রামে— শান্তিনিকেতনে। এইসব কাহিনি বাস্তব, এই সব গল্প ছুঁলে জেগে ওঠে ঘুমন্ত অতীত। বিশ্বভারতী গড়ে ওঠার দিনগুলি খুব সহজ ছিল না। দেশ বিদেশের বহু দরদী মানুষ এসে হাত লাগিয়েছিলেন বিশ্বভারতী নির্মাণ ও সৃষ্টির কাজে। বিশ্বের সঙ্গে ভারতবর্ষের যোগসাধন যেন মস্ত যজ্ঞের পর্ব চলছিল বিশ্বভারতীতে। বিদেশ থেকে আসা বন্ধুরা রবীন্দ্রনাথের চোখে ‘পরম বন্ধু, পরম হিতৈষী।’ কারণ এঁরা সকলেই নিজেদের প্রিয়জন ছেড়ে ভারতের প্রান্তে খ্যাতিহীন প্রান্তরে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। সকলেই পরম পণ্ডিত। প্রাপ্তির আশা তেমন কিছু ছিল না। যা ছিল তা ওই এক বিনিসুতোর বন্ধন। নিজেদের দেশেও কোনো সম্মান লাভের আর সুযোগ ছিল না তাঁদের। এই ত্যাগস্বীকার আবার অনেকের সন্দেহের বিষয়ও ছিল। তবু নিরলস ভঙ্গিতে কাজ করে গেলেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথ কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে বলেছিলেন, ‘এ কাজের বেতন তাঁরা নিলেন না, দুঃখই নিলেন।’ তবে কখনও কখনও দুঃখ সুখের চেয়েও মূল্যবান। তা বুঝতে গেলে জীবনের খররৌদ্রে এসে দাঁড়াতে হয়। তান-য়ুন-শানের ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল।

কুনফুশীয় এক পরিবারের ছেলে তান। দর্শনের শিক্ষক বাবা এবং বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগী মা তাঁর মনে কিছু বিশিষ্ট মূল্যবোধ বুনে দিয়েছিলেন। চিনা ক্ল্যাসিকস অধ্যয়ন, পাশ্চাত্য দর্শনের গবেষণা, নিউ লিটারেচার সোসাইটি, নিউ লিটারেচার ম্যাগাজিনের সৃজন, মাও সে তুঙের আদর্শে ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া এইসব বিচিত্র কর্মকাণ্ড তো তাঁর ছিলই। কিন্তু এরপর স্নেহময় পিতা মাতার মৃত্যু তাঁকে জীবনের প্রখর বাস্তবের সামনে এনে দাঁড় করালো। জীবন ও জীবিকা তখন এক প্রায়োজনিক তাৎপর্য নিয়ে তানের সামনে এসেছে। চিনা ভাষা পড়াতে তিনি এসে পড়েছেন সিঙ্গাপুরে। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। এই সময় পত্র পত্রিকার সূত্রেই রবীন্দ্রনাথের চিনসফরের কথা শুনেছিলেন তান-য়ুন-শান। মনে মনে খুব ইচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার। প্রবল মনের টানে দেখা হল সিঙ্গাপুরেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে যেন আধ্যাত্মিক ভারতের প্রতীকে ধরা দিলেন। তাঁর উৎসাহ দেখে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীতে চিনা ভাষা শেখানোর ডাক দিয়ে যান। একবছর পর ১৯২৮ সালে তান-য়ুন-শান সত্যিই পৌঁছে গেলেন ভুবনডাঙার খোলা আকাশের চাঁদোয়ার তলায় রবীন্দ্রনাথের সেই স্বর্গলোক, বিশ্বভারতীতে। 

এর আগে ১৯২১ সাল থেকেই বিশ্বভারতীতে চিনা ভাষা চর্চা হত। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ চিন সফরে গিয়ে ‘চু চেন তান’ উপাধি পেয়েছিলেন, যার অর্থ ‘মেঘমন্দ্রিত প্রভাত’! বিশ্বভারতীতে চিনা বইয়ের সংগ্রহ ছিল। চিনা ত্রিপিটক, চতুর্বিংশ রাজবংশের ইতিহাসগ্রন্থমালা ইত্যাদি। তান-য়ুন-শান যখন জোড়াসাঁকোয় পৌঁছলেন, তখন সেই রাতেই প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের উদ্যোগে সত্যজীবন পালের সঙ্গে শান্তিনিকেতন পৌঁছান। আসলে তাঁর জীবনের গন্তব্যই তাই ছিল। প্রথম শান্তিনিকেতন দেখেই কবিতা লিখে ফেললেন তান। তানের অধ্যাপনা বিশ্বভারতীর বিদেশি ভাষা চর্চার ভিতকে মজবুত করল আরও। পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে তাঁদের জ্ঞান ও মনীশা আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠছিল। চিন দেশ ও ভারতবর্ষের মধ্যে তিনি সাংস্কৃতিক সাঁকোর মতো কাজ করেছেন। বিশ্বভারতীর আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি চিনে একটি এবং বিশ্বভারতীতে একটি পরিষদ স্থাপন করতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথেরও তাই ইচ্ছে ছিল। এছাড়াও বিশ্বভারতীর জন্য চিনা বই সংগ্রহের কাজও তিনি করেছিলেন। এরপর বিশ্বভারতীতে সত্যি প্রতিষ্ঠিত হল চিনা ভবন। মহাত্মা গান্ধি, জওহরলাল নেহেরুও এই সাধু উদ্যোগের প্রশংসা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সবসময় চেয়েছিলেন ভারত ও চিনের সম্পর্কের উন্নতি। প্রতিটি কাজের একজন নিয়ন্ত্রক থাকেন। বিশ্বভারতীর চিনভবনের নিয়ন্ত্রক ছিলেন তান-য়ুন-শান। ১৯৩৭ থেকে ১৯৬৭ চিনা ভবনের কর্ণধার ছিলেন তিনি। বহু দূর থেকে ছাত্ররা বিশ্বভারতীতে এসে চিনা ভাষার চর্চা করে গিয়েছেন। চিনভবনের গ্রন্থাগারে অসংখ্য চিনা বই ও পুঁথি আছে। ত্রিপিটকেরও অনেক সংস্করণ আছে। ভারত ও চিনকে মননের কেন্দ্রে রেখে বইও লিখেছিলেন তান। ভারতবর্ষ, বলা ভালো শান্তিনিকেতনকে তীর্থের মতোই পবিত্র ভাবতেন তান-য়ুন-শান। মনে হয় অভিভাবক হারিয়ে সেই তরুণ তান অন্তরের আরাধ্য দেবতা বুদ্ধদেবকে খুঁজে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। হয়তো তাই বিশ্বভারতীর জন্য কাজ করা, তাঁর কাছে পুজো।

একটি মানুষ তাঁর জীবনের সুবর্ণ রঙের মুহূর্তগুলি কাটিয়ে দিলেন ভারতবর্ষে। জীবনের অন্ত্যপর্বে বুদ্ধগয়ায় ‘বিশ্ব বৌদ্ধ কেন্দ্র’ সৃজনের কাজে মেতে ছিলেন। সন্তানদের নামে পরশ রেখেছেন বাঙালি অক্ষরমালার, দেশিকোত্তম উপাধি পেয়েছেন বিশ্বভারতী থেকে— তাঁর অবশ্যই দুটি দেশ চিন এবং ভারতবর্ষ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তরের দেবতা।

গ্রন্থ ঋণঃ
রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia