দঃ দিনাজপুরে দুই বাংলার মিলনমেলা, অনিঙ্ক আচার্যের ক্যামেরায় ধরা পড়ল ভিন্ন ‘কাঁটাতার’

কাঁটাতার ভেদ করে বিভিন্ন জিনিস নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন দুই বাংলার মানুষ

বি সুভাষ মুখোপাধ্যায় (Subhash Mukhopadhyay) একদা লিখেছিলেন, “আমরা যেন বাংলাদেশের চোখের দুটি তারা/ মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে থাকুকগে পাহারা/ দুয়োরে খিল, টান দিয়ে তাই/ খুলে দিলাম জানলা/ ওপারে যে বাংলাদেশ/ এপারেও সেই বাংলা।”

দেশভাগের (Partition) পঁচাত্তর বছর পরেও এই কবিতা বাংলা সাহিত্যকে যেমন প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে, তেমনই লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি মুহূর্তের জীবনের সারসত্য হয়ে থেকেছে এইকটা বাক্য। বাংলা দুটো নয়, একটাই৷ কিন্তু ভূগোলের মানচিত্র এঁকে দিয়েছে অন্য এক গল্প। যে গল্পে মিশে আছে কষ্ট, যন্ত্রণা, ব্যথা আর স্বজনদের প্রতি পিছুটান। এসব ঘোচবার নয়। কারণ বাংলা একটাই। ‘কাঁটাতার’ শব্দটির মধ্যে কেউ কেউ রোম্যান্টিসিজম খুঁজে পান। যদিও এ শব্দের মধ্যে আছে রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া বিধান। শুধুমাত্র দেশ নয়, ভিটে ছাড়া যন্ত্রণার কিসসা। তাই এখনও দক্ষিণবঙ্গ (South Bengal) থেকে উত্তরবঙ্গে (North Bengal) বাস করা বহু ‘বাঙাল’ অধিবাসী শিকড়ের টান অনুভব করেন। বর্ডারের আশেপাশে বাড়ি হলে পলকহীন তাকিয়ে থাকেন বাংলাদেশের ট্রেনের দিকে। দেশ ভাগ হয়ে গেলেও ভালোবাসা আজও অক্ষত।

এখন বলব দক্ষিণ দিনাজপুর (Dakkhin Dinajpur) জেলার তালমন্দিরা মিলনমেলার কথা। যে সম্প্রীতির উৎসবে পাশে থাকার বার্তায় জড়ো হন দুই বাংলার প্রায় কয়েকশো মানুষ। মাঝখানে কাঁটাতার। বছরের এই একটা দিন আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে পলকের দেখা হয়, বিভিন্ন দ্রব্য-উপহার দেওয়া নেওয়া হয়। ছবিগুলো দেখলে বুঝবেন, কীভাবে জিনিসগুলি ছুঁড়ে ছুঁড়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। 

তথ্যনির্ভর এই ছবিগুলি তুলেছেন দক্ষিণ দিনাজপুর বালুরঘাটের (Balurghat) তরুণ ফটোগ্রাফার অনিঙ্ক আচার্য (Aninko Acharjee)। আশ্চর্য এই জমায়েত প্রসঙ্গে তিনি জানাচ্ছেন, “এটি এমন একটা জায়গা, যেখানে আগে যখন কাঁটাতার ছিল না, তখন দু-পারের মানুষ একে অপরের সঙ্গে এসে দেখা করতেন। কাঁটাতার হবার পর বছরের একটা দিন দুই বাংলার মানুষ মিলিত হন। জিনিসপত্র আদান প্রদান করেন। চাল, ডাল থেকে ফল, জামাকাপড় সবকিছুই দেওয়া নেওয়ার রীতি আছে।”

তালমন্দিরা নামক এক বিস্তীর্ণ এলাকাতে এই মিলনমেলা হয় প্রতি বছর। যদিও জমায়েতের নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। দক্ষিণ দিনাজপুর ছাড়াও মালদা ও উত্তর দিনাজপুর থেকেও মানুষের জমায়েত হয়।

কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, বাংলাদেশ-দিনাজপুরের অনেকেরই এপার বঙ্গে বিয়ে হয়েছে, তাঁরাও আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। দুই দেশের এই দুই অঞ্চলের মানুষই আর্থিকভাবে পিছিয়ে। অতএব, পাসপোর্ট-ভিসা এতকিছুর ঝামেলায় জড়ানো তাঁদের পক্ষে ঝক্কির। জমায়েতে গেলে দেখা যায়, পুববঙ্গের আত্মীয়কে সদ্যোজাত কোনো বাচ্চার মুখ দেখাতে নিয়ে গেছেন। আর যিনি মুখ দেখছেন, বাচ্চাটির উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিচ্ছেন সামান্য উপহার। এ তো বাঙালিদের চিরাচরিত রেওয়াজ।

কথিত আছে, কোনো এক পীরবাবার আখড়ার জন্য এই অঞ্চলে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। একসময় ডাকাতের উপদ্রব থেকে বাঁচতে ঘটা করে কালীপুজোও হত। দেশভাগের আগে দুই বাংলার মানুষ জড়ো হতেন সেই পুজোয়। দেশভাগের পরে কালীপুজো সরে যায় ত্রিকুল এলাকায়। এখন তালমন্দিরা নামক এক বিস্তীর্ণ এলাকাতেই এই মিলনমেলা হয় প্রতি বছর। যদিও জমায়েতের নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। দক্ষিণ দিনাজপুর ছাড়াও মালদা ও উত্তর দিনাজপুর থেকেও মানুষের জমায়েত হয়। কিছুদিন আগেই এই জমায়েতের সাক্ষী হন ফটোগ্রাফার অনিঙ্ক আচার্য। অসম্ভব এই মুহূর্তগুলি বন্দি করেন ক্যামেরায়। তিনি বলেন, করোনার কারণে এবছর পাহারা বেশ কড়া ছিল। কাঁটাতারের খুব কাছে কাউকেই যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। অনেকেই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে শেষমেশ স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেই বাড়ি ফেরেন।

অনিঙ্ক জানাচ্ছেন, “ওঁদের মতো আমারও খুব মনখারাপ করছিল। বর্ডারের কাছাকাছি থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে আমারও আত্মিক যোগাযোগ আছে। এই মিলনমেলায় গিয়ে দেখলাম, কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে অজস্র মানুষের আর্তনাদ। কাঁটাতারের ওপারেই চেনা মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তাঁদের জড়িয়ে ধরার কোনো উপায় নেই।”

মিলনমেলায় আসা দক্ষিণ দিনাজপুরের এক বয়স্ক ভদ্রলোক স্বজনদের খুঁজে না পেয়ে জানান, “হায়রে বাড়ির লোকগুলোকে খুঁজে পেলাম না! আপেল আনসিলাম। বাংলাদেশের লোকই খাক। একটাও ফিরাইয়া নিয়া যাবো না… খাক আমার দ্যাশের লোকই খাক।” এবং খাবারের প্যাকেট ছুঁড়ে দেন ওপারের উদ্দেশ্যে।

দেশভাগের রাজনীতিটা ছিল শাসক শ্রেণি ইংরেজ আর কিছু ধূর্ত রাজনীতিবিদদের। যারা ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করেছে। একই খেতের ফল, একই নদীর জল ও বৃক্ষের ছায়ায় বেড়ে ওঠা মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত অবিশ্বাস, ভাঙন ও ঘৃণা ছড়িয়েছে। এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প থেকে আজও মুক্ত হয়নি ভারত-বাংলাদেশ। তাই দেশভাগের বেদনায় ব্যথিত কবি অন্নদাশঙ্কর রায় (Annadashankar Roy) লিখেছিলেন, “তেলের শিশি ভাঙল বলে/ খুকির পরে রাগ করো/ তোমরা যে সব বুড়ো খোকা/ বাংলা ভেঙে ভাগ করো/ তার বেলা?”

অনিঙ্কর তোলা ছবিগুলি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় আরেকটি গান। যে গান ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায় অচিরেই। গীতিকার ও গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায় (Pratul Mukhopadhyay)। গানে তিনি বলেছেন, “দুজনে বাঙালি ছিলাম/ দেখরে কি কাণ্ডখান…/ তুমি এখন বাংলাদেশি/ আমারে কও ইন্ডিয়ান।”

আলোকচিত্রঃ অনিঙ্ক আচার্য

এই প্রতিবেদনের কোনো ছবি প্রকাশকের পূর্ব লিখিত অনুমতি ব্যতিরেকে ফটোকপি, রেকর্ডিং বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক বা যান্ত্রিক পদ্ধতি-সহ যেকোনো উপায়ে পুনরুৎপাদন, বিতরণ বা প্রেরণ করা যাবে না। অন্যথায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ©2022 P&M COMMUNICATIONS. ALL RIGHT RESERVED.

Developed by DXDasia