একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর হাত ধরেই পথ চলা শুরু করেছিল ‘অমৃতাঞ্জন’ মলম

ব্যথার জায়গায় নিমেষেই স্বস্তি পেতে ভরসা জোগায় অল্প একটু ‘অমৃতাঞ্জন’

মাথাব্যথা কিংবা শরীরের কোনো পেশির ব্যথা থেকে নিমেষে মুক্তি পেতে ভারতীয়দের একমাত্র ভরসা ছিল অমৃতাঞ্জন। ছোট কাঁচের বয়ামে, হলদে প্যাকেটের মোড়ক, ঢাকনা খুললেই নাকে এসে লাগবে এক অদ্ভুত গন্ধ, এরই নাম অমৃতাঞ্জন। ব্যাথার জায়গায় একটু লাগিয়ে নিলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো উপশম মিলবে। বাইরে থেকে মলমের প্যাকেটটি দেখতে হয়তো আহামরি নয় কিন্তু এর গুণ ছিল সত্যিই ‘আহামরি’। একটুখানি মলম মানেই ব্যাথা থেকে মুক্তি, তাই প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অমৃতাঞ্জন ভারতীয় পরিবারের অপরিহার্য অংশ হয়ে টিকে থেকেছে। কিন্তু লক্ষাধিক প্রাণকে ছুঁয়ে যাওয়া এই বেদনা উপশমকারী মলমের আবিষ্কার হয়েছিল যাঁর হাত ধরে,  তাঁর জন্ম যে আমাদের কলকাতাতেই, সে কথা আমরা ক’জনই বা জানি?

প্রাথমিক পর্যায়ে অমৃতাঞ্জন মলমের একটি বয়াম ১০ আনা দামে বিক্রি শুরু করেন নাগেশ্বর। শুরুর দিকে যেন হট কেকের মতো বিক্রি হয়ে যায় এই বামটি।

কাশিনাধুনি নাগেশ্বর রাও ওরফে নাগেশ্বর রাও পান্তুলু গারু, ১৮৬৭ সালের ১ মে অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষ্ণা জেলার পেসারামিল্লি গ্রামে বুচ্চাইয়া এবং শ্যামলম্বার পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। নিজের গ্রাম থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন তিনি এবং পরবর্তীকালে মছলিপত্তনম থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এরপর ১৮৯১ সালে তিনি মাদ্রাজ চলে যান, সেখানেই মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজ থেকে স্নাতক হন। এই সময়ে, নাগেশ্বরর রাও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পার্টিতে যোগদান করেন। এই সময় নাগাদই তিনি একটি অপথেকেরি ব্যবসার জন্য কলকাতা চলে আসেন। কলকাতাতে এসেই তিনি ওষুধ তৈরির প্রাথমিক বিষয়গুলি হাতে-কলমে শিখেছিলেন।

যদিও কয়েক বছর পর, তিনি মুম্বাই চলে আসেন এবং একটি স্বনামধন্য ইউরোপীয় সংস্থা উইলিয়াম অ্যান্ড কোম্পানিতে চাকরি নেন। কিন্তু এরপর তিনি আবারও কলকাতায় ফিরে যেতে চান এবং শেখা চালিয়ে যেতে চান। তাঁর মধ্যে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ছিল যে কলকাতায় এপোথেকেরি কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে ভবিষ্যতে আরও ভালো অবস্থানে দাঁড় করাতে পারবে। এরপর তিনি গাছ এবং রাসায়নিকের প্রাকৃতিক নির্যাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। আবিষ্কার করলেন, ‘অমৃতাঞ্জন’ নামক শক্তিশালী ব্যাথার মলম। হলুদ রঙের, তীব্র গন্ধযুক্ত এই মলম ব্যাথার জায়গায় লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি অথচ এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। শুরুতে বিনামূল্যে এই মলমের বয়াম বিতরণ করা শুরু করেন। একটি সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে বিপুল শ্রোতাদের মধ্যে তাঁর মলম ছড়িয়ে দেন। এই অনুষ্ঠানে মলমের অভূতপূর্ব ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখে নাগেশ্বর রাও অভিভূত হয়েছিলেন। এবং এই ঘটনার পর ব্যবসায়িক ভাবে এই মলম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। সময়টা ১৮৯৩ সাল, বোম্বেতে একটি বড়ো মাপের বাম তৈরির কারখানা স্থাপন করেন নাগেশ্বর রাও। আর সেই কারখানার হাত ধরেই জন্ম হয় বিখ্যাত অমৃতঞ্জন লিমিটেড-এর। একদিন কলকাতার মাটিতে যে ধারণা এবং শেখার ইচ্ছের জন্ম হয়েছিল, সেটাই এবার ডানা মেলে গোটা দেশের মধ্যে আত্মপ্রকাশের সুযোগ খুঁজে পেল।

প্রাথমিক পর্যায়ে অমৃতাঞ্জন মলমের একটি বয়াম ১০ আনা দামে বিক্রি শুরু করেন নাগেশ্বর। শুরুর দিকে যেন হট কেকের মতো বিক্রি হয়ে যায় এই বামটি। ফলে সহজেই তাঁর ব্যবসাও ফুলে ফেঁপে উঠতে শুরু করে। এবং কমদিনের মধ্যেই তিনি কোটিপতি হয়ে যান। নাগেশ্বর রাও ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক এবং দূরদর্শী। ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি ভারতীয়দের কল্যাণকর কাজেও অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নাগেশ্বরের সম্পৃক্ততা এবং তাঁর লেখা জাতীয়তাবাদী প্রবন্ধ দেখে তাঁকে ‘দেশোদ্ধারক’ বা জনগণের উত্থানকারী আখ্যা দেওয়া হয়। এমনকি ১৯৩৭ সালের নভেম্বরে, তেলেগু নেতারা অন্ধ্র রাজ্যের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে তাঁর বাসভবনে একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে দেশভাগের দোলাচল পাশাপাশি একটি সদ্য স্বাধীন দেশের নানাবিধ সমস্যার কারণে পরিকল্পনাটি বাতিল করতে হয়। অবশেষে ১৯৫২ সালের ১৯ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজন করা হয় সেই বৈঠকের।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ততদিনে এই বৈঠকের যিনি মধ্যমণি সেই নাগেশ্বর রাও আর ছিলেন না। ১৯৩৮ সালের ১১ এপ্রিল মারা যান তিনি। তাই আফসোস এটুকুই যে অমৃতাঞ্জন মলমকে ঘিরে দেখা স্বপ্নের বাস্তব চিত্রায়ণটুকু দেখে যেতে পারলেন না সৃষ্টিকর্তা নাগেশ্বর রাও।

 

প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে

Developed by DXDasia