এশিয়ার প্রাচীনতম শিক্ষক সংগঠন

মাধ্যমিক হোক বা উচ্চ-মাধ্যমিক। প্রস্তুতির জন্য এবিটিএ টেস্ট পেপারের বিকল্প আজও তৈরি হয়নি পশ্চিমবঙ্গে। ইটের মতো আকারের বইগুলোকে ঘিরে পরীক্ষার্থীদের উৎসাহ-উদ্দীপনার শেষ থাকে না। তবে এবিটিএ-কে কেবল একটি প্রকাশনা সংস্থা ভাবলে বড়ো ভুল হবে। এশিয়ার প্রাচীনতম শিক্ষক সংগঠন এটি। এবছর যার শতবর্ষ পূর্ণ হল।

সেই ব্রিটিশ আমলের কথা। অসহযোগ আন্দোলনে তখন সারা দেশ উত্তাল। তারই মধ্যে লাগু হল মন্টেগু-চেমসফোর্ড শাসন সংস্কার, যা প্রস্তাবিত হয়েছিল ১৯১৯ সালে। নতুন আইনে শিক্ষকদের ওপর নেমে আসে দমননীতি। সক্রিয় রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছিলেন বহু শিক্ষক। তাঁরা চাইছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে। ১৯২১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ২২ জন শিক্ষক জোট বাঁধলেন। তৈরি হল ‘নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি’ (‘অল বেঙ্গল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা সংক্ষেপে ‘এবিটিএ’)। 

প্রথম সভাপতি ঈশানচন্দ্র ঘোষ এবং প্রথম সম্পাদক মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত জান-প্রাণ লড়িয়ে দিয়েছিলেন সংগঠনটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রংপুরের গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাইস্কুলে সেবছরই প্রথম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। হাজির ছিলেন ১০০ জন শিক্ষিক। সভাপতির আসন গ্রহণ করেন বিজ্ঞানাচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। ক্রমশ শিক্ষকদের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে এবিটিএ। শিক্ষাব্যবস্থা যাতে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়ে আরও ভাবনাচিন্তা শুরু করে। তাঁদের দাবি মেনে প্রথম গড়ে ওঠে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট। 

ব্রিটিশ প্রশাসন একবার সিদ্ধান্ত নেয়, সরকারি স্কুলগুলি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবিটিএ-র ডাকে বাংলার সমস্ত স্কুলে একযোগে প্রতিবাদ শুরু হয়। তাকে সমর্থন জানায় ইংল্যান্ডের শিক্ষক সংগঠনগুলি। শেষ পর্যন্ত ভারত সচিব স্যামুয়েল এই স্কুল বন্ধ করার সিদ্ধান্তের নিন্দা করতে বাধ্য হন। দেশভাগের অশান্ত সময়ে শিক্ষকদের দাবি আদায়ের জন্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা এই সংগঠনের সম্মেলনে ধর্মঘটের ডাক দেন। 

ভারতবর্ষ স্বাধীন হল। শিক্ষকদের দফায় বেতন বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে এবিটিএ-র আন্দোলন। ১৯৫২ সালে তাঁদের শিলিগুড়ি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সম্মেলনে গৃহীত হয় নতুন গঠনতন্ত্র। বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে শিক্ষকদের ন্যূনতম বেতনের দাবিতে এবিটিএ-র আহ্বানকে সমর্থন জানিয়ে সলিল চৌধুরী লিখলেন, “পথে এ বার নামো সাথী, পথেই হবে পথ চেনা” গানটি। এসপ্ল্যানেডে হাজার হাজার শিক্ষকের পাশে দাঁড়ালেন সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, নাট্যব্যক্তিত্ব খালেদ চৌধুরীর মতো বিশিষ্টজনেরা। ১৯৫৪ সালের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আট জন নিহত হন। আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবন্দি হন জ্যোতি বসু।

একের পর এক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে এবিটিএ। রাজ্য অফিসের ঠিকানা কয়েকবার পাল্টেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আয়োজিত হয়ে চলেছে বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে ছাত্র-সহায়তা শিবির হয় নিয়মিত। এখন সারা রাজ্যে এবিটিএ-র প্রায় ৬৬ হাজার সদস্য। পড়ুয়া এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্বার্থে নিরলস অবদান রেখে চলেছে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি।
 

Developed by DXDasia