October 24, 2017 | 12:00 PM

আমাদের আয়ুর কয়েক দশক

চার বছর আগের কথা। ব্যাঙ্গালোরে সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা ।বৃষ্টি ছিল, হাওয়া ছিল। আমার ঘরের টিভিটা চলছিল। মন অস্থির ছিল আমার, ঘরের কাজ করতে করতে একটা চাপা অস্বস্তিতে বারবার শোবার ঘরে এসে টিভির পর্দায় চোখ রাখছিলাম। কেমন যেন ওই বৃষ্টি, ওই দু:খী আকাশ সঙ্কেত পাঠাচ্ছিল …আজকেই সেই দিন। বৃষ্টি যেন সুরের ধারার মতোই অঝোরে ঝরছিল সেদিন। এবং আমার সব আশঙ্কা, ভয়, বেদনাকে সত্যি করে দিয়ে অমৃতলোকে চলে গেলেন মান্না দে।

আসলে এই দিনটি যে আসবে, সে তো জানাই ছিল।শুধু জানতাম না ঠিক কবে। আমরা সকলেই জানি, কেউই থাকে না। আসা যাওয়ার গল্প তবু কিছুতেই কেন যেন মানতে পারি না আমরা।সব সময়েই প্রিয় মানুষদের ক্ষেত্রে ভাবি যে তাঁরা অশেষ পরমায়ু নিয়ে এসেছেন। এমনকী যখন দেখি, এঁরা ফুরিয়ে গেছেন, কলসির জল ঠেকেছে প্রায় তলানিতে, ঢালার পরে সেই স্ফটিক -জলে মিশেল পড়েছে বালিকাদার, তখনও আমরা সেই জলটুকুই ছেঁকে নিতে চাই, চাতক পাখির মতো অনন্ত তৃষ্ণা বুকে নিয়ে। যখন দেখি আমরা নতুন কিছুই আর পাচ্ছি না, তখনও কিন্তু প্রার্থনা করে যাই এঁদের উপস্থিতি হোক ত্রিমাত্রিক। এই সব অলোকসামান্য প্রিয় মানুষজনের দ্বিমাত্রিক অস্তিত্ব যে সহ্যই হয় না! তবু মেনে নিতে হয়। অবচেতন মন বেদনায় বিধুর হয়ে বলে, সয়ে যাবে ঠিক কিছুদিন পরে।

আমারও সয়ে গেছে। এই তো আজ চার বছর পূর্ণ হল মান্না দে প্রয়াত। মান্না দে …আমার বালিকাবেলার ভোর, কিশোরীকালের সকাল, যৌবনের রোদেলা দুপুর পেরিয়ে এই মধ্যবয়সের বিপন্নতা বুকের মধ্যে গোপনে লুকিয়ে রেখে যাঁর মায়াবী কণ্ঠের জাদুতে আমি আচ্ছন্ন থাকি আজও।

ব্যাঙ্গালোরে শেষ লাইভ অনুষ্ঠান শুনেছিলাম তিনি প্রয়াত হওয়ার কয়েক বছর আগে। আম্বেদকর ভবনে। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহ। মানুষটি অসুস্থ, কণ্ঠের যেই সোনালি আভিজাত্য গোধূলির ছায়া মেখে মলিন, শ্রোতাদের মনেও জাগছে না সেই সোনার কাঠি রুপোর কাঠি ছোঁয়ার রোমাঞ্চ। কিছুই প্রায় ছিল না, তবু অনেক কিছু ছিল। শ্রোতাদের মনসিজ স্মৃতিসুখের উত্তাল উন্মাদনা ছিল। এই মানুষটির হাত ধরে আমরা পেরিয়েছি আমাদের আয়ুর কয়েক দশক। শুধু সেই নুয়ে পড়া কৃতজ্ঞতাতেই আমাদের মন থেকে সেই সন্ধেতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল অপ্রাপ্তির যত ছেঁড়া ছেঁড়া দু:খ।রয়ে গিয়েছিল হালকা মিষ্টি নিমফুলের গন্ধ।

সেই অনুষ্ঠানের শেষ গান ছিল, ‘কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই…। ‘ মান্না দে যেদিন চলে গেলেন, আমি যেন ওই গানটিই আকাশে বাতাসে শুনতে পাচ্ছিলাম। সে ছিল থ্রী মাস্কেটিয়ার্সের গল্প। আসলে তো চার বন্ধু। মান্না-কিশোর-রফি-মুকেশ। থ্রী তো নয়, ফোর। আমরা যে কেন ভাবি…তিনজন! কিশোর -রফি-মুকেশ তো কতদিন আগেই চলে গেছেন অন্য গন্তব্যে। চার বছর হল, চতুর্থ জনও আর নেই ।

ঠিক এভাবেই চলে গিয়েছিল গানের চরিত্র নিখিলেশ-মঈদুল-ডিসুজা। চার বছর হল, তাদের আড্ডাও নিশ্চয়ই জমজমাট হয়ে উঠেছে চতুর্থ বন্ধুর উপস্থিতিতে। টেবিল চাপড়ানো তর্কে, গল্পে, গানে।

না:, আজ আর মন খারাপের দিন নয়। কারণ আমি জানি, নি:সঙ্গ মানুষটি এখন পুরোনো মেজাজে, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে, গন্ধর্বলোকে। গানের আসরে। সুরের সাম্পানে।