April 23, 2021 | 12:00 PM

ম্যাজিক দেখে মনে মনে এক জাদুকরের শিষ্য হয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ

গড়পার রোডের বাড়িতে সুকুমার রায় যখন প্রয়াত হন, সত্যজিতের বয়স তখন আড়াই বছর। সেই বাড়িতে আরও কয়েক বছর ছিলেন সত্যজিৎ। ৬ বছরের কাছাকাছি বয়সে মায়ের সঙ্গে উত্তর কলকাতা ছেড়ে চলে গেলেন ভবানীপুরে মামার বাড়িতে। তাঁর মামা-মাসিরা চার ভাই, তিন বোন। সত্যজিতের জন্মের আগেই ছোটোমামা মারা যান। বড়ো ও মেজোমামা পাটনা এবং লখনৌতে ব্যারিস্টার ছিলেন। তৃতীয় মামা অর্থাৎ সোনামামার বাড়িতেই উঠেছিলেন সত্যজিৎ রায়।

সেখানে অনেক নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর। গ্রীষ্মকালের দুপুরে শোয়ার ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে দিলে খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে আলো আসত। সেই আলোতে দিনের একটা বিশেষ সময়ে বিপরীত দিকের দেওয়াতে গিয়ে পড়ত রাস্তার উল্টো ছবি। স্টিরিওস্কোপ নামে এক আশ্চর্য যন্ত্র ছিল বাড়িতে। দু’টো ছবিকে সেই যন্ত্রে পাশাপাশি রেখে দেখলে মনে হবে একই ছবি, আর দৃশ্যটা জীবন্ত। ম্যাজিক ল্যানটার্নও তাঁর খুব প্রিয় ছিল। হয়তো বা ফিল্মের প্রতি সত্যজিতের আকর্ষণ এই মজার যন্ত্রটি থেকেই শুরু হয়েছিল। 

চার বছর বয়সী সত্যজিৎ 

ভবানীপুরের বকুলবাগানের বাড়িতে থাকাকালীন সত্যজিৎ মাঝে মাঝে সিনেমা, সার্কাস, ম্যাজিক, কার্নিভ্যাল ইত্যাদি দেখার সুযোগ পেতেন। এম্পায়ার থিয়েটার অর্থাৎ এখনকার রক্সিতে একবার শেফালো নামের এক সাহেবের ম্যাজিক দেখতে গিয়েছিলেন। ম্যাজিশিয়ানের দলে মাদাম প্যালার্মো নামের এক জাদুকরী ছিলেন। তিনি একেবারে বোবা সেজে ম্যাজিক দেখালেন। সত্যজিৎ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ম্যাজিক দেখে।

কোনো বিয়েবাড়িতে এক বাঙালির ম্যাজিক দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, শেফালো সাহেবের কারসাজি কিছুই না এঁর কাছে। স্টেজে আলোর খেলা, যন্ত্রপাতি আর জাদুকরের বকবকানিতে লোকের চোখ-মন ধাঁধিয়ে যায়। ফলে সহজ হয়ে যায় ম্যাজিক দেখানো। আর এখানে ম্যাজিক দেখানো হচ্ছে প্যান্ডেলের নিচে ফরাসের ওপর বসে। চারদিকে নিমন্ত্রিতরা রয়েছেন।

জাদুকর ফরাসের ওপর দেশলাই কাঠি ছড়িয়ে দিলেন। সামনে খালি বাক্সটা রেখে “তোরা আয় একে একে” বলে ডাকতেই কাঠিগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে বাক্সে ঢুকে পড়ল। একজনের হাতে এক প্যাকেট তাস ধরিয়ে দিয়ে আরেকজনের হাত থেকে লাঠি নিলেন। তার ডগা বাড়িয়ে দিলেন তাসের দিকে। বললেন, “আয়রে ইস্কাপনের টেক্কা!” প্যাকেট থেকে ইস্কাপনের টেক্কা বেড়িয়ে লাঠির ডগায় আটকে থরথর করে কাঁপতে লাগল। এভাবেই জাদুর খেলা চলছিল। 

কয়েকদিন পর বকুলবাগান এবং শ্যামানন্দ রোডের মোড়ে সেই জাদুকরের সঙ্গে সত্যজিতের দেখা হয়। বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বয়স ভদ্রলোকের, গায়ে ধুতি এবং শার্ট। খুবই সাধারণ চেহারা, কিন্তু গুণের তুলনা নেই। সত্যজিতের তখন ম্যাজিকের শখ, মনে মনে সেই জাদুকরের শিষ্য হয়ে গিয়েছেন। ভদ্রলোকের কাছে ম্যাজিক শিখতে চাইলেন। জাদুকর বললেন, “নিশ্চয়ই শিখবে”। তারপর পকেট থেকে এক প্যাকেট তাস বের করে রাস্তাতেই একটা মামুলি ভেলকি শিখিয়ে দিলেন। হঠাৎ দেখা হওয়ায় ঘাবড়ে গিয়ে ঠিকানাও নিতে সত্যজিৎ ভুলে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

এর কিছু পরে ম্যাজিকের বই কিনে হাতসাফাইয়ের বেশ কয়েকটা জাদু শিখেছিলেন সত্যজিৎ। কলেজ জীবন পর্যন্ত তাঁর ছিল ম্যাজিকের নেশা। পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে ম্যাজিক। 

তথ্যসূত্র – যখন ছোট ছিলাম, সত্যজিৎ রায়।

ছবিসূত্র – The Society for the Preservation of Satyajit Ray Archives