
“আমি পলায়নকারী নই। আমি নির্জনতার মধ্যে যাচ্ছি কারণ, আমি নিজেকে আবিষ্কার করতে চাই, আর চাই কোনও সুপ্ত প্রেরণাকে সুযোগ দিতে, যা কিছু তৈরির অপেক্ষায় রয়েছে”…
এই চিঠিতে এমন একজনের সূক্ষ বেদনা আর হতাশা প্রতিফলিত হয়েছে, যাঁকে শান্তিনিকেতনের মতো জায়গায় নীতি পুলিশের শিকার হতে হয়েছিল। তিনি আর কেউ নন, রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ। দীর্ঘকালীন বন্ধু ও একসময়ের সহকর্মী লিওনার্ড এলমহার্স্টকে চিঠিতে এই কথাগুলোই লিখেছিলেন তিনি। কিন্তু কেন?
এই চিঠির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশটিতে ছিল একটি প্রস্ফুটিত প্রেমের গল্প, যা ‘অতিরঞ্জিত’ করে রটানো হয়েছিল গোটা আশ্রমে। শুধু তাই নয়, এই ঘটনার জেরে রথীন্দ্রনাথকে আশ্রম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। রথীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর প্রেম-আবেগ নিয়ে আশ্রমবাসীরা যে মিথ্যা জট পাকাতে শুরু করেছিলেন, তা বন্ধ করতে। তাই ‘নিঁখোজ’ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, ভুলে যেতে চেয়েছিলেন সবকিছু। কয়েক বছর আগে কিছু দুর্লভ-অপ্রকাশিত চিঠি এবং ফটোগ্রাফ নিয়ে রবীন্দ্র-গবেষক নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বই(‘আপনি তুমি রইলে দূরে: সঙ্গ নিসঙ্গতা ও রথীন্দ্রনাথ’) প্রকাশিত হয়, যেখানে রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের এমন একটি অধ্যায় আলোকিত করা হয়েছে, যা সযত্নে আড়ালে রাখা হয়েছিল। এই বই থেকে প্রকাশ্যে আসে, রথীন্দ্রনাথের ‘বিরল’ প্রেমের কাহিনী কীভাবে ‘বিতর্কিত’ হয়ে উঠেছিল এবং তাঁকে শান্তিনিকেতন ছেড়ে যেতে হয়েছিলো।
‘আপনি তুমি রইলে দূরে: সঙ্গ নিসঙ্গতা ও রথীন্দ্রনাথ’ বইতে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ নয় বছর এবং মীরা দেবীর সাথে তাঁর বিতর্কিত সম্পর্কের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে, যাঁকে তিনি সপ্রেমে ‘মীরু’ সম্বোধন করতেন। মীরা দেবী ছিলেন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী। রথীন্দ্রনাথ তাঁর একটি চিঠিতে লিখেছেন: “আমি চাইছি আমার বাকি দিনগুলি শান্তিতে কাটাতে এবং মীরুই সবটা।” ‘ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি’র একজন উজ্জ্বল কৃষিবিদ হওয়ার পাশাপাশি, রথীন্দ্রনাথ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র জীবিত সন্তান, যিনি বিশ্বভারতী এবং শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের দর্শন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রচুর কাজ করেছিলেন। তিনিই ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য।
রথীন্দ্রনাথ দেরাদুনের দিকে চলে যান কারণ, তাঁর এবং মীরার মধ্যে সম্পর্কের যে গুজব রটেছিল, তাকে ‘কলঙ্ক’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আশ্রমিকরা ‘নীতি পুলিশি’র মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থেই প্রাকৃতিক আবেগকে ডুবিয়ে, দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ভিতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেছিল।
৬৫ বছর বয়সে, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। স্ত্রী প্রতিমা দেবীকে এবং শান্তিনিকেতনের বাড়ি ছেড়ে, মীরা (তখন তার বয়স তিরিশ) এবং তাঁর আড়াই বছরের শিশু(জয়ব্রত)কে সাথে নিয়ে দেরাদুনে থাকার জন্য চলে যান। এখানেই রথীন্দ্রনাথ তাঁর শান্তিনিকেতনের বাড়ির প্রতিরূপ হিসেবে ‘মিতালী’ নামে একটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত, ন’বছর তাঁরা একসাথে ছিলেন। নির্মল চন্দ্র প্রায়শই রথীন্দ্রনাথের দত্তক কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের সাথে দেখা করতে যেতেন।
নির্মল চন্দ্র কীভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ‘রথী-দা’ ও তাঁর স্বামীর জন্য মীরার অনুভূতি ঠিক কী ছিল, তা এখনও পরিষ্কার নয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রথীন্দ্রনাথকে ভুলে গিয়েছিল বিশ্বভারতী। রথীন্দ্রনাথও একজন প্রতিভাবান শিল্পী ছিলেন, প্রায়শই তিনি মীরাকে আঁকতেন। ১৬ বছর বয়সে শিশুপুত্র নিয়ে প্রতিমা দেবী যখন বিধবা হয়েছিলেন, তখন তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন রথীন্দ্রনাথ। তাঁদের পরিণয় সমস্ত দিক থেকেই সুখের ছিল, তবে নবজাত বিশ্বভারতী দেখাশোনার কাজে দীর্ঘ সময় তাঁকে জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে দূরে থাকতে হত। মীরা রথীন্দ্রনাথের চেয়ে একত্রিশ বছর ছোট ছিলেন এবং সেইসময় তাঁদের দু’জনের মধ্যে একটি সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যদিও শান্তিনিকেতন-সম্প্রদায় খুবই বিরক্ত হয়েছিল এই সম্পর্কে এবং প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু মীরার স্বামী বা প্রতিমা দেবী কেউই তেমন আপত্তি করেননি।
আশ্চর্যের বিষয়, ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুও এটিকে ভালো চোখে দেখেননি, শুধু তাই নয়, মীরা ও তাঁর স্বামীকে বিশ্বভারতী থেকে বহিষ্কার করার দাবি জানিয়েছিলেন রথীন্দ্রনাথের কাছে। তবে, রথীন্দ্রনাথ তাঁর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পদত্যাগ করেন এবং মীরাকে নিয়ে সবকিছু ছেড়ে দেরাদুনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দুই পরিবারেরই সৌহার্দ্যপূর্ণ শর্ত ছিল, নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ হওয়া চাই। ১৯৬১ সালে মারা যান রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মীরাও তাঁকে অনুসরণ করে কয়েক বছর পর প্রয়াত হন। ঠিক এখানেই এই প্রেমের ‘সত্যি’ গল্পটি শেষ হয় অথবা হয় না, কারণ এই ক্ষণস্থায়ী বিশ্বে প্রেম সর্বদা বিরাজমান। কেউ না দিলেও, রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকলে হয়তো এই সুন্দর সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিতে পারতেন।
