
শিবনাথ শাস্ত্রী
কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনি ডিরোজিওর শিষ্যগণ ও লাহিড়ী মহাশয়ের যৌবন-সুহৃদগণের মধ্যে সৰ্ব্বাগ্রগণ্য ব্যক্তি। ১৮১৩ সালে কলিকাতার ঝামাপুকুর নামক স্থানে বর্ত্তমান বেচুচাটুৰ্য্যের স্ত্রীটে মাতামহের আলয়ে ইহার জন্ম হয়। ইহার মাতামহের নাম রামজয় বিদ্যাভূষণ। বিদ্যাভূষণ মহাশয় কলিকাতার তৎকালপ্রসিদ্ধ ধনী, যোড়াসাঁকো নিবাসী, শান্তিরাম সিংহের ভবনে সভাপণ্ডিত ছিলেন। এই শান্তিরাম সিংহ মহাভারত-প্রকাশক সুবিখ্যাত কালীপ্রসন্ন সিংহের পিতামহ। কৃষ্ণমোহনের পিতার নাম জীবনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহার নিবাস ২৪ পরগণায় নবগ্রাম নামক গ্রামে ছিল। জীবনকৃষ্ণ কুলীন ব্রাহ্মণের সন্তান ছিলেন; এবং বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের দুহিতা শ্ৰীমতী দেবীর পাণিগ্রহণ করিয়া শ্বশুরালয়েই বাস করিতেন। সেখানে তাঁহার কৃষ্ণমোহন ব্যতীত আর দুইটা পুত্র ও একটী কন্যা জন্মে। পুত্র দুইটির নাম ভুবনমোহন, ইনি সৰ্ব্বজ্যেষ্ঠ, সৰ্ব্বকনিষ্ঠ কালীমোহন। ইনি কৃষ্ণমোহনের পদবীর অনুসরণ করিয়া পরে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়াছিলেন। কন্যাটীর শিবনারায়ণ দাসের লেন নিবাসী হরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সহিত বিবাহ হইয়াছিল। তাঁহার পুত্র মন্নুলাল চট্টোপাধ্যায় পরে গবর্ণমেণ্টের অধীনে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন।
বংশবৃদ্ধি হওয়াতে জীবনকৃষ্ণের শ্বশুরালয়ে বাস করা ক্লেশকর হইয়া উঠিল। তিনি ক্রমে শ্বশুরালয় ত্যাগ করিয়া গুরুপ্রসাদ চৌধুরির লেনে একটী স্বতন্ত্র আবাসবাটী নিৰ্ম্মাণ পূৰ্ব্বক তাহাতে বাস করিতে লাগিলেন। তিনি কুলীনের সন্তান, সেরূপ বিদ্যাসাধ্য কিছুই ছিল না, সুতরাং তাঁহাকে অতি ক্লেশে নিজ পরিবার প্রতিপালন করিতে হইত। এরূপ শুনিয়াছি, পতিপরায়ণ স্বধৰ্ম্মনিরতা শ্ৰীমতী দেবী গৃহকাৰ্য্য সমাধা করিয়া বিশ্রামার্থ যে কিছু সময় পাইতেন, সেই সময়ে কাটনা কাটিয়া, বেটের দড়ি পাকাইয়া, পৈতার সুতা প্রস্তুত করিয়া কিছু কিছু উপার্জ্জন করিতেন, তদ্দ্বারা পতির সংসারযাত্রা নিৰ্ব্বাহ করিবার পক্ষে অনেক সহায়তা হইত। সে সময়ে ভারতবন্ধু হেয়ার কালীতলাতে স্কুল সোসাইটীর অধীনে একটী পাঠশালা স্থাপন করিয়াছিলেন। ১৮১৮ কি ১৮১৯ সালে শিশু কৃষ্ণমোহন সেই পাঠশালাতে ভৰ্ত্তি হইলেন। হেয়ার তাঁহার পাঠশালাগুলির তত্ত্বাবধানকার্য্যে কিরূপ মনোযোগী ছিলেন, তাহা অগ্রে বর্ণনা করিয়াছি। তিনি অল্পদিনের মধ্যেই কৃষ্ণমোহনের প্রতিভার পরিচয় পাইয়া, তাঁহাকে ১৮২২ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত স্কুল সোসাইটীর স্কুলে, বর্ত্তমান সময়ে তন্নামপ্রসিদ্ধ হেয়ার স্কুলে, লইয়া গেলেন। ১৮২৪ সালে যখন মহাবিদ্যালয় বা হিন্দুকালেজ নবপ্রতিষ্ঠিত সংস্কৃত কলেজের নবনিৰ্ম্মিত গৃহে প্রতিষ্ঠিত হইল, তখন কৃষ্ণমোহন স্কুলসোসাইটীর অবৈতনিক ছাত্ররূপে হিন্দুকলেজে প্রবেশ করিলেন।
এই সময়ে বিদ্যা শিক্ষা বিষয়ে তাঁহার যেরূপ মনোযোগ ছিল, তাহা শুনিলে আশ্চৰ্য্যান্বিত হইতে হয়। কোনও দিন তাঁহার উদরে অন্ন যাইত কোনও দিন বা যাইত না, কিন্তু সেজন্য কেহ তাঁহাকে বিষণ্ণ বা স্বকার্যসাধনে অমনোযোগী দেখিতে পাইত না। এমন কি তিনি স্বীয় জননীর সহিত এই নিয়ম করিয়াছিলেন, যে একবেলা তিনি রন্ধন করিবেন, সে সময়ে মা নিজ শ্রমের দ্বারা অর্থোপার্জ্জন করিবার চেষ্টা করিবেন। তিনি স্কুল হইতে আসিয়া রন্ধনকার্য্যে নিযুক্ত হইতেন; অথচ বিদ্যালয়ে কেহই তাঁহাকে শিক্ষা বিষয়ে অতিক্রম করিতে পারিত না। ডিরোজিও হিন্দুকালেজে পদার্পণ করিবামাত্র অপরাপর বালকের ন্যায় কৃষ্ণমোহনও তাঁহার দিকে আকৃষ্ট হইলেন। তিনি তখন প্রথম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। ডিরোজিও তাঁহাকে স্বীয় শিষ্যদলের মধ্যে অগ্রগণ্য বলিয়া বরণ করিয়া লইলেন। একাডেমিক এসোসিএশন যখন স্থাপিত হইল, তখন কৃষ্ণমোহন তাঁহার যুবকসভ্যগণের মধ্যে একজন নেতা হইয়া দাড়াইলেন। ১৮২৮ সালে তাঁহার পিতা বিষম কলেরা রোগে অকালে কালগ্রাসে পতিত হন। ১৮২৯ সালে নবেম্বর মাসে তিনি হিন্দুকালেজ হইতে উত্তীর্ণ হইলেই হেয়ার তাঁহাকে নিজ স্কুলের দ্বিতীয় শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। ১৮৩১ সালে বাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুর Reformer “রিফরমার” নামে এক সংবাদ পত্র বাহির করেন; তাহার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া উক্ত বৎসরের মে মাসে বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় Inquirer নামে এক কাগজ বাহির করেন। এই কাগজে তৎকালোচিত রীতি অনুসারে হিন্দুধৰ্ম্ম ও হিন্দুসমাজের প্রতি কটূক্তি বর্ষণ করিতে ক্রটী করিতেন না। এই হিন্দুধৰ্ম্ম ও হিন্দুজাতিবিদ্বেষ তাঁহার অন্তরে বহুদিন ছিল। ১৮৫০ সালে তিনি একখানি বিদ্রূপপূর্ণ পুস্তিকা রচনা করিয়াছিলেন, তাহাতে রাধাকান্ত দেবকে গাধাকান্ত নামে অভিহিত করিয়াছিলেন।
১৮৩০ সালে আলেকজাণ্ডার ডফ এদেশে আসিলেন, এবং কালেজের সন্নিকটে বাসা লইয়া খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম প্রচার আরম্ভ করিলেন। ইহার বিবরণ পূৰ্ব্বে দিয়াছি; এবং ঐ সকল বক্তৃতা শুনিতে যাওয়াতে হিন্দুকালেজের ডিরোজিওর শিষ্যগণ কালেজকমিটীর কিরূপ বিরাগভাজন হইয়াছিলেন তাহাও কিঞ্চিৎ বর্ণনা করিয়াছি। কৃষ্ণমোহন বন্ধুগণ সমভিব্যাহারে, ঐ সকল বক্তৃতা শুনিতে যাইতেন এবং তদ্ভিন্ন ডফ ও ডিয়ালটির (Dealtry) বাসায় গিয়া তর্কবিতর্ক করিতেন। তৎপরে ১৮৩১ সালের আগষ্ট মাসে যে ঘটনা ঘটিলে তাঁহাকে গৃহ হইতে তাড়িত হইতে হয় তাহার বিবরণ অগ্ৰেই দিয়াছি।
কৃষ্ণমোহন গৃহ হইতে তাড়িত হইয়া দক্ষিণারঞ্জনের ভবনে সে রাত্রে আদরে গৃহীত হইলেন। তিনি এই ভবনে ঠিক কতদিন ছিলেন তাহা বলিতে পারি না। বোধ হয় তাঁহাকে কয়েক দিনের মধ্যেই এই আশ্রয় স্থান পরিত্যাগ করিয়া স্বতন্ত্র বাসা করিতে হইয়াছিল। কারণ দক্ষিণারঞ্জনের বন্ধুগণ তাঁহার ভবনে আসিলে, তাঁহার পিতা বিরক্ত হইতেন, এজন্য পিতাপুত্রে মধ্যে মধ্যে ঘোর বিবাদ উপস্থিত হইত। একবার দক্ষিণারঞ্জনের পিতা স্বীয় পুত্রের অনুপস্থিতিকালে তাঁহার কোনও বন্ধুকে অপমান করাতে দক্ষিণারঞ্জন পিতৃগৃহ ছাড়িয়া গিয়াছিলেন, তখন ডিরোজিও তাঁহাকে বুঝাইয়া নিবৃত্ত করেন। এই বন্ধু হয়ত কৃষ্ণমোহন।
আরও পড়ুন
বাংলা গদ্যের ‘অস্থির রূপটিকে স্থির’ করেছিলেন যিনি
যাহা হউক, গৃহ হইতে তাড়িত হইয়া কৃষ্ণমোহন ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। কিন্তু তাঁহার উৎসাহ কিছুতেই মন্দীভূত হইল না। তিনি দ্বিগুণ উৎসাহের সহিত তাঁহার Inquirer পত্রিকা চালাইতে লাগিলেন; এবং অসংকোচে ডফ ডিয়েলটি, প্রভৃতি খ্ৰীষ্টীয় প্রচারকদিগের ভবনে গতায়াত এবং তাঁহাদের সহিত পানভোজন করিতে লাগিলেন। এইরূপে এক বৎসর কাটিয়া গেল। ১৮৩২ সালের ২৮ আগষ্টের ইন্কোয়ারারে সংবাদ বাহির হইল, যে হিন্দুকালেজের অন্যতম ছাত্র ও কৃষ্ণমোহনের বন্ধু মহেশ চন্দ্র ঘোষ খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মাবলম্বন করিয়াছেন। কলিকাতা সমাজে তুমুল আন্দোলন উঠিল। তৎপরবর্ত্তী অক্টোবর মাসের ১৭ই দিবসে কৃষ্ণমোহন স্বয়ং খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইলেন। তিনি গৃহ-তাড়িত হওয়ার পর কিছু দিন কতিপয় ইউরোপীয়ের সহিত খুব মিশিতেন। তন্মধ্যে কাপ্তেন কৰ্ব্বিন (Captain Corbin) নামে একজন সেনাদল-ভুক্ত কৰ্ম্মচারী প্রধান ছিলেন। তাঁহার ভবনে তিনি তাঁহাদের সহিত সমবেত হইয়া খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম সম্বন্ধীয় গ্রন্থ সকল পাঠ করিতেন। এতদ্ভিন্ন সে সময়ে কর্ণেল পাউনি (Colonel Powney) নামক একজন খ্ৰীষ্টভক্ত কর্ণেল কলিকাতাতে ছিলেন, তাঁহার ও তাঁহার বন্ধুগণের সহিত সমবেত হইয়া কৃষ্ণমোহন একবার ষ্টীমার যোগে সাগর দ্বীপে গিয়াছিলেন। অনেকে অনুমান করিয়াছেন তাঁহার খ্ৰীষ্টীয়ধৰ্ম্ম গ্রহণ ইহাদেরই প্রভাবে।
যাহা হউক ইহার পরে কৃষ্ণমোহনের জীবনে সংগ্রামের পর সংগ্রাম উন্নতির পর উন্নতি চলিতে লাগিল। তাঁহার প্রণয়িনী বিন্ধ্যবাসিনী দেবী প্রথমে তাঁহার সহচারিণী হইতে চান নাই। অবশেষে অনেক দিন অপেক্ষা করার পর ১৮৩৫ খ্ৰীষ্টাব্দে আসিয়া তাঁহার সঙ্গে যোগ দিলেন। ১৮৩৭ সালে কৃষ্ণমোহন খ্ৰীষ্টীয় আচার্য্যের পদে উন্নীত হইলেন। তাঁহার প্রথম আচার্যোর কার্য্য তাঁহার বন্ধু মহেশ চন্দ্র ঘোষের মৃত্যু উপলক্ষে। ১৮০৯ সালে তাঁহার কনিষ্ঠ সহোদর কালীমোহনকে নিজধৰ্ম্মে দীক্ষিত করিলেন। ঐ সালেই তাঁহার জন্য হেদুয়ার কোণে এক ভজনালয় নিৰ্ম্মিত হইল। তিনি সেখানে থাকিয়া তাঁহার অবলম্বিত ধৰ্ম্ম যাজন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। এইখানে অবস্থান কালে সুপ্রসিদ্ধ প্রসন্নকুমার ঠাকুরের একমাত্র পুত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম অবলম্বন করেন; এবং তাঁহার কন্যা কমলমণিকে বিবাহ করেন।
১৮৪৫ সাল হইতে গবৰ্ণর জেনেরাল লর্ড হার্ডিঞ্জ বাহাদুরের প্ররোচনায় তিনি “সৰ্ব্বার্থ সংগ্রহ” নামে জ্ঞান-গর্ভ মহা-কোব স্বরূপ গ্রন্থ সকল প্রণয়ন করিতে আরম্ভ করেন। তাঁহার কার্য্যে প্রীত হইয়া, ১৮৪৬ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জ তাঁহাকে একখান এলফিনষ্টোন প্রণীত ভারতবর্ষের ইতিহাস উপহার দিয়াছিলেন। ১৮৫১ খ্ৰীষ্টাব্দে মহাত্মা বাটন বা বেথুনের মৃত্যু হইলে তাঁহার নামে যে সভা স্থাপিত হয়, কৃষ্ণমোহন তাহার সভাপতি নিৰ্ব্বাচিত হন। ১৮৫২ সালে তিনি বিশপ কালেজের অধ্যাপকের পদে মনোনীত হইয়া শিবপুরে গিয়া বাস করেন। ১৮৬১-৬২ সালে হিন্দু ষড়দর্শন বিষয়ে প্রভূত গবেষণাপূর্ণ এক গ্রন্থ প্রকাশিত করেন। ১৮৬৮ সালে শিবপুরে তাঁহার, জীবনের সুখ দুঃখের সঙ্গিনী বিন্ধ্যবাসিনী দেবীর মৃত্যু হয়। ঐ ১৮৬৭-৬৮ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নিযুক্ত হন। ১৮৭৫ সালে Aryan Witness “আৰ্য্য শাস্ত্রের সাক্ষ্য” নামে এক পুস্তক প্রকাশ করেন। ১৮৭৬ সালে লর্ড নৰ্থব্রুকের পরামর্শে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁহাকে ডাক্তার উপাধি প্রদান করেন। ১৮৭৮ সালে তিনি ভারতসভার সভাপতিরূপে মনোনীত হন। ১৮৮০ সালে কলিকাতার অধিবাসিগণ তাঁহাকে মিউনিসিপালিটীতে আপনাদের প্রতিনিধিরূপে বরণ করেন। মিউনিসিপালিটীতে সকলে তাঁহাকে নিৰ্ভীক সত্যনিষ্ঠ ও অধৰ্ম্ম-বিদ্বেষী লোক বলিয়া জানিত। তিনি স্বকৰ্ত্তব্য-সাধনে কখনই অপরের মুখাপেক্ষা করিতেন না। এইরূপে চিরদিন তিনি স্বদেশে বিদেশের লোকের আদরসম্ভ্রম পাইয়া সকলের সম্মানিত হইয়া কাল কাটাইয়া গিয়াছেন। ১৮৮৫ সালে কৃষ্ণমোহন স্বৰ্গারোহণ করেন!
(ঋণ – শিবনাথ শাস্ত্রী লিখিত ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’);