
এরপরে এসে পড়ে আরও কিছু কথা। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আধার কার্ডের পরিসীমা সঙ্কুচিত হয়েছে, ঠিক। কিন্তু দুটো বিষয় এখনও ভাবার— প্রথমত, ব্যাঙ্ক সমেত যেসব বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যেই নাগরিকদের তথ্য জবরদস্তি সংগ্রহ করে ফেলেছেন, সেই তথ্যের বিযুক্তি কীভাবে হবে, অথবা সম্পূর্ণভাবে হবে কি? এই বিষয়ে রায়ে কোনও উল্লেখ নেই। সুনির্দিষ্টভাবে সরকারি নজরদারি ছাড়া শতকরা একশোভাগ কীভাবে আমরা নিশ্চিত হব যে, আমাদের আধার সংশ্লিষ্ট তথ্য অন্য কোনও কাজে লাগানো হচ্ছে না যাতে ব্যক্তি অধিকারের পরিসর লঙ্ঘিত হয়? কী সেই পদ্ধতি যা সুনিশ্চিত করতে পারে নাগরিকের এই অধিকার? এখনও এর কোনো উত্তর নেই। ব্যাঙ্ক, বীমা, ই-ওয়ালেট কোম্পানি, মোবাইল সংস্থারা কি নতুন করে আধার বিযুক্তিকরণের জন্য ক্যাম্প করবেন, নোটিশ দেবেন?
শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই আধার নিয়ে আদালতে কিছুটা কানমলা খেয়ে, কেন্দ্রের সরকার ভাবনাচিন্তা করতে আরম্ভ করেছেন কীভাবে নতুন একটা আইন নিয়ে এসে আধার কার্ড-এর তথ্য বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার আইনি বন্দোবস্ত করা যায়। প্রসঙ্গত, আধার আইনের ৫৭ নং ধারায় এই সংস্থান ছিল যা আদালত বাতিল করেছেন, তার মানে তো এই দাঁড়ায় যে কেন্দ্রের সরকারের নিজস্ব ভাবনার অভিমুখ আদালতের রায়ের অভিমুখের বিপ্রতীপ! সম্প্রতি কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রী এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমেও বিবৃতি দিয়েছেন। আর কেন্দ্রীয় সরকারের সামনে সুস্পষ্ট আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও ইতিমধ্যে আরও একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। প্রখ্যাত ই-কমার্স সংস্থা ফ্লিপকার্ট, অতি সম্প্রতি তাদের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ একটি অফার চালু করার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন, যাতে গ্রাহকের আধার কার্ডের তথ্য সংস্থাকে দিলে তারা গ্রাহককে ষাট হাজার টাকা অবধি পণ্যে ধারে ও সুবিধেজনক কিস্তিতে কেনাকাটা করতে দেবেন। অর্থাৎ আবার সেই আধারের তথ্যের প্রতি বাড়তি আগ্রহ এবং তার বিনিময়ে উপঢৌকনের প্রস্তাব। সন্দেহ কি বাড়ছে না কমছে? প্রসঙ্গত বলা দরকার সম্প্রতি ওয়ালমার্ট ভারতে ফ্লিপকার্টের অধিকাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছেন। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় ফ্লিপকার্ট রাতারাতি এই অফার বাতিল করে দিয়েছেন এবং তাদের কর্তারা জানিয়েছেন, দেশের আইন মেনেই তারা ব্যাবসা করবেন। প্রশ্ন হল, ওই বিশেষ অফার চালু করার সময় কি তারা দেশের আইন বা আদালতের রায় বিষয়ে নিতান্তই অজ্ঞ ছিলেন, যদি তাই হয়, তাহলে বড় বিপদের কথা। তাছাড়া আইন যাতে তাদের অনুকূলে থাকে তার ব্যবস্থা সরকার নিজেই করার কথা ভাবছেন। সোনার সঙ্গে সোহাগা মিশলেও কি এত ফুর্তি হয়?
আরও পড়ুন
এখনও গেল না ‘আধার’- ১
পরের সমস্যা হল, সরকারি প্রকল্পে ভর্তুকি পেতে আধারকে আদালত একদিকে যেমন বৈধতা দিয়েছেন অন্যদিকে আধার না-থাকার অজুহাতে কাউকে প্রকল্পের সুবিধে থেকে বঞ্চিত না-করার নির্দেশও দিয়েছেন। আপাতভাবে এই বক্তব্যকে স্ববিরোধী মনে হতে পারে, তবে কার্যত তা নয়। তারা বলতে চেয়েছেন, যারা বর্তমানে আধার কার্ড পেয়েছেন তারা সরকারি প্রকল্পের সুবিধে পেতে ওই কার্ড ব্যবহার করবেন আর যারা এখনও আধার কার্ড পাননি, তারা ইতিমধ্যে নতুন আধার কার্ড তৈরি করে নেবেন, যতদিন না নতুন কার্ড তারা পাচ্ছেন প্রকল্পের সুবিধে থেকে তাদের বঞ্চিত করা যাবে না। এই বক্তব্যের মধ্যে তাহলে একটা অংশের মূল কথা এই যে নাগরিকদের নতুন আধার কার্ড তৈরির একটা ধারাবাহিক ব্যবস্থা আধার কর্তৃপক্ষ বা সরকারকে রাখতেই হবে, নতুবা নাগরিকরা আধার কার্ড নতুনভাবে তৈরি করাবেন কোথা থেকে? তাছাড়া, ভোটার কার্ডের মতোই আধার কার্ড তৈরি ও তার সংশোধন একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। দেশের নাগরিকরা ঠিকানা বদল করবেন, মোবাইল নম্বর পাল্টে নিতে পারেন, নতুন জন্ম ও মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে, হিন্দু মহিলাদের বিবাহসূত্রে পদবী পরিবর্তন হবে— এগুলো চলতেই থাকবে; তাই একটা নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন যাতে নাগরিকরা এই সুবিধেগুলো হাতের নাগালে পান। ভোটার তালিকার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন রাজ্যের প্রশাসনিক পরিকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণভাবে নাগরিকদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে প্রতিবছর সংশোধন ও পরিমার্জনার কাজ করেন। যে কোনও ভোটার তার নিজের বুথে বছরের নির্দিষ্ট সময়, এমনকি রবিবার বা অন্য ছুটির দিনেও ভোটকর্মীদের পেয়ে যান ও নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে নেন। নতুন ভোটারকার্ড তৈরির জন্য প্রতিটি ব্লক, পুরসভা ও মহকুমা কার্যালয়ে স্থায়ী ছবি তোলার কেন্দ্র আছে, সেখানে যে কেউ গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে নিজের কার্ড তৈরি করে নিতে পারেন। কিন্তু আধারের ক্ষেত্রে এইরকম ব্যবস্থা কি হয়েছে?
উত্তর না এবং না। ২০১৬ সালে আধার আইন চালু হওয়ার পরে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সারা দেশে বেশ কিছু বেসরকারি এজেন্সিকে আধারের কার্ড তৈরির বরাত দেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজ্যের জেলা প্রশাসন, পুরসভা, গ্রাম পঞ্চায়েত ওইসব এজেন্সির মাধ্যমে আধার কার্ড তৈরির কর্মসূচি নেন, অনেক জায়গায় ক্যাম্প করে একসঙ্গে প্রচুর নাগরিকের আধার তৈরি হতে থাকে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায়, ডাকঘরে ওইসব এজেন্সিকে অস্থায়ী অফিস করার সুযোগ দেওয়া হয়, কেউ কেউ নিজেদের লাইসেন্স থাকার সুবাদে ব্যক্তিগতভাবেও অফিস তৈরি করে পরিষেবা দিতে থাকেন, যার পোশাকি নাম ‘আধার সেবা কেন্দ্র’। কিন্তু এর সবটাই এককালীন ব্যাপার। আধার-মামলা বিচারাধীন থাকার সময়েই যে কোনও কারণেই হোক গত মার্চ (২০১৮)-এর পরে কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদিত এজেন্সির বেশিরভাগেরই আর লাইসেন্স নবীকরণ করা হয় না। ধীরে ধীরে অনেক অফিস গুটিয়ে যায়, ব্যাঙ্ক ডাকঘরে পরিষেবা বন্ধ বা অনিয়মিত হয়ে যায়। কোথাও কোথাও রাজ্য সরকারকে আধার কার্ডের রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজ করার অনুরোধ করা হয়, সব রাজ্যের সরকার তাতে সম্মত হতে চাননি। তার পরেও জুন (২০১৮) অবধি কিছু কিছু এজেন্সিকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তারপর তাও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আধার কার্ড নতুন করে তৈরি অথবা সংশোধনের ব্যবস্থার সীমানা ঠিক এই মুহূর্তে অত্যন্ত সঙ্কুচিত যার বিপরীত প্রতিক্রিয়া বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ নীরব।
হ্যাঁ, এখন আধার কার্ডের প্রয়োজনীয়তা সমস্ত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ আধার তৈরি বা সংশোধনের সরকারি পরিকাঠামো উপযুক্ত না থাকায়, এই বিষয়টি নিয়ে চালু হয়েছে সম্পূর্ণ কালোবাজারি। সরকার-নির্দিষ্ট এজেন্সিগুলি অকেজো, ব্যাঙ্কে, ডাকঘরে নতুন কার্ড তৈরি ও সংশোধনের কাজ ধীরগতি অথচ প্রতিক্ষেত্রে সমস্ত জায়গায় আধার কার্ড চাওয়া হচ্ছে, বাধ্য হয়ে নাগরিকরা এইসব অস্বীকৃত এজেন্সির কাছে চড়া দাম দিয়ে পরিষেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। পাড়ায় পাড়ায় গোপনে অনেক সাইবার কাফেতে এই কাজ হচ্ছে, যারা প্রকাশ্যে কোনও বিজ্ঞাপন দেন না কিন্তু কাজটা করেন, সরকারের নির্ধারিত পরিষেবা মূল্য নিতে তাদের বয়েই গেছে, রসিদ ছাড়া যার যেরকম মর্জি টাকা নেওয়া হচ্ছে। হিসেবমতো এই পরিষেবার সঙ্গে জি এস টি যোগ আছে, ফলে রশিদ ইত্যাদি না দেওয়ার ফলে সরকার করের অংশ পাচ্ছেন না।
বিষয়টা বাড়তি ভাবনার সঞ্চার করে কারণ সরকারি প্রকল্পের ভর্তুকি পেতে যখন আদালতও আধার কার্ডকে স্বীকৃতি দিলেন তখন তার একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নির্মাণের প্রশ্ন এসেই যায়। সরকারি প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধে-ভর্তুকি মূলত পান প্রান্তীয় মানুষজন যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন, ফলে নতুনভাবে আধার কার্ড তৈরি যদি তাদের হাতের নাগালে এবং ন্যায্য মূল্যে না পাওয়া যায় (প্রথমবার আধার কার্ড তৈরির ক্ষেত্রে কোনও মূল্য লাগার কথা নয়) তাহলে তাদের কী হবে? এই ভাবনা কিন্তু ভাবতেই হবে, নইলে আধার কার্ডের মাধ্যমে যোগ্য উপভোক্তাকে চিহ্নিত করতে গিয়ে আসলে প্রকৃত উপভোক্তা যদিই সরকারি সুবিধার বাইরে থেকে যায় তাহলে সব মিলিয়ে একটা প্রকল্প হাস্যকর শুধু নয়, আদপে তা সাধারণ জনতার অধিকারবিরোধী হয়েই দাঁড়াবে। অবশ্য, আমাদের নয়াদিল্লির সরকারের আদলের সঙ্গে এইসব বিশেষণ খাপে খাপে বসে যায়। শোনা যায়, শিশু ও নারীদের জন্য পুষ্টি প্রকল্পে উপভোক্তাদের নাম তাদের আধারের সঙ্গে সংযোগ করে আসাম সরকার নাকি প্রচুর উপভোক্তাকে বাতিল করে দিয়েছেন। এই রাজ্য সেই ‘সাফল্যের পথে’ হাঁটেনি বলে নয়াদিল্লির সভায় রাজ্যের আধিকারিকরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে ভর্ৎসিত হয়েছেন! কী বলবেন??
(সমাপ্ত)