
শতাব্দীর এক পাদ অতিক্রান্ত হয়ে এল। বাবরি মসজিদের অস্তিত্ব এখন শুধু ইতিহাসের পাতায়। বাস্তবের মসজিদটি ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। যারা ভেঙেছিল তাদেরই উত্তরসূরীরা এবার ঘোষণা করেছে আর এক বছরের মধ্যেই রামমন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হবে অযোধ্যায়। বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের দাবি এখন আর বিশেষ শোনা যায় না। শোনা যায় তাজমহল এবং তৎকেন্দ্রিক ইতিহাসকে অকিঞ্চিৎকর প্রমাণের প্রয়াস। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টরিক্যাল রিসার্চ তাজমহল যে হিন্দু স্থপতি এবং শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত তা প্রমাণের জন্য গবেষণায় অনুদান দেওয়ার কথা বিবেচনা করে। এখনও পর্যন্ত তাজমহলের ইতিহাসই শুধু হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির লক্ষ্য, মূল স্থাপত্যটি নয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই ইতিউতি শোনা যাচ্ছে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর আত্মগর্বী জঙ্গি হিন্দুত্বের সেই স্বরও: ইয়ে তো সির্ফ ঝাঁকি হ্যয়, মথুরা কাশী বাকি হ্যয়। এই স্বরও এখনও পর্যন্ত ২৫ বছর আগেকার সেই গগনভেদী নিনাদে পরিণত হয়নি। কিন্তু হবে না, কে বলতে পারে? হলে কতদিনে কীভাবে হবে, তাই বা কে বলতে পারে? ২৫ বছর আগে জাতি হিসাবে আমরা ভুল করেছিলান। তার বহু মূল্য দিতে হয়েছে; এখনও হচ্ছে। ২৫ বছর আগেকার বাবরি মসজিদের শিক্ষা যদি এবার আমরা কাজে না লাগাই, তবে তা হবে আমাদের চূড়ান্ত লজ্জার কারণ। প্রমাণ হবে জাতি হিসাবে আরা শুধু ইতিহাস–বিস্মৃত নই; আমরা ইতিহাস–নিরক্ষর। অতীতের থেকে শিক্ষা নেওয়ার বোধ, ক্ষমতাই নেই আমাদের।
বাবরি মসজিদ কাণ্ড স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার মতোই একটি মোড়–নির্ণায়ক ঘটনা। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এটাকে দেশের শাসন ক্ষমতা দখলের পথে একটা যুগান্তকারী ঘটনা এবং সেই সম্ভাবনার আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত হিসাবে দেখে। সেকুলার রাজনীতি এটাকে দেশে আইনের শাসন বলবৎ রাখতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার একটি চূড়ান্ত নজির হিসাবে দেখে। এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই হোক বা মধ্যবর্তী অন্য কোনও অবস্থান থেকে, এই বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই যে একটি ঐতিহাসিক সৌধকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিল একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য চরিতার্থ করতে। আধুনিক সভ্য জগত তালিবানদের হাতে বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস এবং বাবরি মসজিদ ভাঙাটাকে হুবহু একই দৃষ্টিতে দেখে এবং বর্বরতা বলে। আজ ভারতে নতুন করে এই ধরনের বর্বরতার বন্দনা শোনা যাচ্ছে এবং তার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সেই কারণেই বাবরি মসজিদের কাহিনীর কিছু দিকের উপর নতুন করে আলোকপাত করা জরুরি।
প্রথমেই মনে করা দরকার এই কথাটা যে ওই ঘটনায় একটি নির্বাচিত, বৈধ রাজ্য সরকার পরিকল্পনা করে সংবিধান তথা দেশের শীর্ষ আদালতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। উত্তরপ্রদেশে কল্যাণ সিংহের নেতৃত্বে বিজেপি সরকার দিনের পর দিন সুপ্রিম কোর্টে এফিডেভিট দাখিল করে বলেছিল, তারা আদালতের নির্দেশ পালন করবে, বিতর্কিত জমিতে কোনও নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না, করসেবা যা হবে তা প্রতীকী পূজা মাত্র। বাস্তবে দুদিন আগে থেকেই সারা দেশ থেকে আসা হাজার হাজার করসেবক বিতর্কিত এলাকায় জমায়েত হলেও রাজ্য সরকার বাধা দেয়নি। ঘটনার দিন সকালে যখন পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখা গেল, তখন রাজ্য সশস্ত্র বাহিনী পিএসি(প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্টাবুলারি) নিঃশব্দে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। কাছেই জেলা শহর ফৈজাবাদে যথেষ্ট কেন্দ্রীয় বাহিনী মজুত থাকলেও রাজ্য সরকার ম্যাজিস্ট্রেট না দেওয়ায় সেই বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ করতে পারেনি। সমস্ত ভারতীয় নাগরিক তথা সারা বিশ্বের ইতিহাসের ছাত্রদের সৌভাগ্য যে ওই দিনের ওই জায়গার ঘটনাবলির অনুপুঙ্খ বিবরণ লিখে গিয়েছেন তিনি, যাঁর থেকে ভাল সামগ্রিক চিত্রটা কেউ জানে না, জানা সম্ভব নয়। ঘটনার ১৪ বছর পর ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘অযোধ্যা: ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২’ বইতে পি ভি নরসিংহ রাও ওই দিন সকাল সাড়ে নয়টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ঘটনার মিনিট ধরে ধরে বিবরণ দিয়ে গিয়েছেন। দেখা যায়, বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে আইন অনুসারে, বিধি মেনে, আদালতের নির্দেশ পালনের জন্য রাজ্য সরকারকে বলা হচ্ছে এবং রাজ্যের দিক থকে বারবার মুখে ‘করছি, করব’ বলেও আদতে কিচ্ছু করা হচ্ছে না। নমুনা:
বেলা ২.২০। কেন্দ্রীয় বাহিনী ইন্দো টিবেটান বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) তিনটি ব্যাটালিয়ন ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েও ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। রাজ্য সরকারের ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের ফিরে যাওয়ার লিখিত নির্দেশ দিয়েছে। রাজ্য সরকারের নির্দেশ হল, কোনওভাবেই যেন গুলি না চালানো হয়।
বেলা ২.২৫। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজ্য পুলিশের ডিজি–কে বললেন কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করতে। ডিজি জানান, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ গুলি চালানো যাবে না, অন্যভাবে বাহিনীকে ব্যবহার করা যেতে পারে। স্বরাষ্ট্রসচিব অবিলম্বে তাই করার জন্য রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিতে বললেন।
বেলা ২.৩০। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজ্যের মুখ্যসচিবকে একই কথা বললেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষাসচিবকে বললেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জন্য হেলিকপ্টার পাঠাতে।
এর পরেও রাজ্য সরকার কিছুই করেনি। বেলা সাড়ে তিনটের পর থেকেই অযোধ্যা থেকে সাম্প্রদায়িক হামলার খবর আসতে থাকে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়ি বেছে বেছে জ্বালানো হতে থাকে, প্রতিটি এমন বাড়ি জ্বালানোর জন্য ৫০ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। বেলা সাড়ে চারটার মধ্যে মসজিদের সম্পূর্ণ কাঠামো ভেঙে পড়ে। রাতেই রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করে কল্যাণ সিংহের সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানি তার তাৎক্ষণিক পরিণতি। দেশে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর লেখা বই থেকে এটা পরিষ্কার যে, কেন্দ্রীয় সরকার অক্ষরে অক্ষরে সংবিধান তথা আইনের অনুশাসন মেনে চলেছিল। এবং সেইভাবে চললে একটি আইন না মানতে বদ্ধপরিকর প্রমত্ত রাজ্য সরকারকে বাগে আনা কেন্দ্রের পক্ষে সম্ভব নয়। একমাত্র পথ রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করে সংবিধানের ৩৫৬ ধারা অনুসারে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি। সেটাও করে যায় ‘ইতিমধ্যেই রাজ্যে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে’ এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তবেই; আইনের শাসন ভেঙে পড়তে পারে এই আশঙ্কায় নয়। কেন বাবরি মসজিদ ভাঙার আগেই ৩৫৬ দারা জারি করা হয়নি, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রাও ওই যুক্তিই দিয়েছেন। তাঁর জায়গায় ইন্দিরা গান্ধীর মতো কোনও প্রধানমন্ত্রী থাকলে অন্য কিছু করতেন কিনা সে প্রশ্ন আলাদা। কিন্তু সংবিধানের অনুজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালনে রাও ভুল কিছু করেননি। মনে রাখা দরকার, তখন কেন্দ্রে কংগ্রেসের আর উত্তরপ্রদেশে বিজেপি–র সরকার। এবার দুই জায়গাতেই বিজেপি–র।
৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার পরিকল্পনা বিজেপি–র শীর্ষ নেতৃত্বের ছিল না। ঘটনার পর লালকৃষ্ণ আদবানি, অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রমুখ নেতাদের কথাবার্তা থেকে তাই প্রমাণ হয়, যদি তাঁরা অসত্য না বলে থাকেন। তবে হাতে শাবল, গাঁইতি, হাতুড়ি নিয়ে ভাঙার কাজটা বাস্তবে যারা করেছিল, তাদের পিছনে নিশ্চিতভাবেই কারও না কারও গোপন পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনার ফল আত্মস্থ করে নিতে কিন্তু বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব দেরি করেনি। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজেপি–র দফতরে দলের মুখপাত্র কে আর মালকানি বলেছিলেন, ‘অবশ্যই আমরা চেয়েছিলাম যে ওই ধাঁচাটা না থাকুক; কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম সেটা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হোক। অবৈধভাবে কাজটা করা হয়েছে, এতেই আমাদের আফশোষ।’
ববরি মসজিদ ধ্বংসের পিছনে কোন সরকার, কোন দলের, কোন সংগঠনের দায় কতটা তা অন্য প্রসঙ্গ। ঘটনা হল, জাতি হিসাবে আমরা বাবরি মসজিদকে রক্ষা করতে পারিনি। তাজমহলের পিছনে হিন্দু মন্দিরের ইতিবৃত্ত খোঁজার চেষ্টায় আমরা তেমনই অশনিসঙ্কেত দেখছি। তাজমহলের মার্বেলের গায়ে এখনও আঁচড় পড়েনি, কিন্তু তার গৌরবের, তাকে নিয়ে দেশের গর্বের অঙ্গে কালি ছেটানো শুরু হয়ে গিয়েছে। এ খুনের আগে বদনাম দেওয়ার প্রক্রিয়া নয় তো? বাবরি মসজিদ জাতি হিসাবে আমাদের কোনও শিক্ষা দিয়েছে কিনা, তার পরীক্ষা এবার।