Demonetization এর একমাস

আমরা মাঝারি থেকে বড় মন্দার দিকে এগোচ্ছি

বিমুদ্রায়ণের একমাস। ভারতীয় বা মার্কিন অর্থনীতিবিদদের অভিমত অনুসারে বিমুদ্রায়ণে কালো টাকা খুব বেশি ধরা যায় না, কালো ব্যবসা বন্ধ হয় না, বরং অর্থনীতি তুমুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হয়েছেও তাই। টাকার অভাবে বাজারে চাহিদা কম, সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান না কমলেও অসংগঠিত ক্ষেত্রে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন, আমাদের ৯০% কর্মী কিন্তু এই অসংগঠিত ক্ষেত্রেই আছেন। এফএমসিজি বা দ্রুত বহমান ভোগ্যপণ্য ক্ষেত্রে ২০% বিক্রি কমে গেছে, কাজেই এই পণ্যের উৎপাদন আর কর্মসংস্থানও কমতে বাধ্য। রিয়েল এস্টেটে বড় শহরগুলোয় ৪০% কেনা সংক্রান্ত অনুসন্ধান আর বিক্রি কমেছে, বেঙ্গালুরুতে সেটা ৬০%, কাজেই এখানেও দেশ জুড়ে কর্মী ছাটাই হচ্ছে, আরও হবে। কার্ডে কেনাবেচা চললেও ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাবেচা ৪০-৫০% কমে গেছে, মানুষ খরচ কমিয়েছে, টাকায় হোক, কার্ডে হোক, কাজেই এখানেও কর্ম সংকোচ। বিক্রি কমেছে দুচাকা আর চারচাকার গাড়ির, খুচরো স্তরে ৩০-৫০%, এমনকি টাটার কমার্শিয়াল গাড়ি বিক্রিও কমেছে ১৭%। কমেছে মোবাইল বিক্রি, স্মার্ট ফোন বিক্রি, ২৫%, সোনা, ধাতু শিল্প, সার বিক্রি, কৃষি যন্ত্র বিক্রি।

কাজেই আমরা মাঝারি থেকে বড় মন্দার দিকে এগোচ্ছি। আগামী এক দেড় বছর এটা থাকবে।

কিন্তু সেখানেই শেষ হবে বলে ভাবার কোন কারণ নেই। ব্যাংকের হাতে এখন অনেক টাকা, আমানতে আর ঋণশোধে। হাতের ৫০০/১০০০ এ ঋণ শোধ করেছে অনেকেই যারা এখন করত না। আমানতের টাকা আবার ধীরেধীরে জনতা তুলে নিলেও ব্যাংকের হাতে টাকা রয়ে যাবে। মন্দার বাজারে আগামী একবছর ভাল ঋণও ব্যাংকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হবে না। আর সেই বাজে ঋণের ছায়া পড়বে পরের বছরগুলোতে। অন্যদিকে বিমুদ্রায়নণর ফলে মানুষের ব্যাংকব্যবস্থায় আস্থা কমে গেছে। ব্যাংকে টাকা রাখবে মানুষ কম। এতেও ব্যাংকের স্বাভাবিক ছন্দে চলা খুব সহজ হবে না। আরও একটা বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংকব্যবস্থা। বিমুদ্রায়নণর ধাক্কায় কৃষি আর ছোট শিল্পে যে ক্ষতি হয়েছে তাতে গত একবছর যে ঋণ দেওয়া হয়েছে তার অনেকটা অনাদায়ী হয়ে পড়তে পারে। স্বাভাবিক ভাবেই মোদী সরকারের ওপর চাপ থাকবে এই ঋণ মকুব করে দেওয়ার। ২০১৯ এর ভোটের দিকে তাকিয়ে সেটা করে ফেললে ব্যাংকের হাতে প্রচুর টাকা (মকুব হওয়া পরিমাণ টাকা ছাপানোর কারণে) চলে আসবে, কিন্তু মন্দার বাজারে এটা মুদ্রাস্ফীতির দিকে নিয়ে যাবে অর্থনীতিকে। আর মকুব না করলে অনাদায়ী ঋণের চাপে ব্যাংকগুলো ধুকতে থাকবে। বিমুদ্রায়ণ এভাবে ভারতীয় অর্থব্যবস্থায় এক ভয়ানক অবস্থা নিয়ে এল, দাবার জুগসোয়াঙ্গের মত, এগোলেও বিপদ, পেছলেও বিপদ।

যারা ভাবছেন কাগজের টাকা থেকে সবুজ টাকা, মানে বৈদ্যুতিন কেনাবেচায় চলে গেলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে তারা দুটো বাস্তবতা ভাবেননি, একে তো পৃথিবীর অন্যতম পশ্চাৎপদ আমাদের গ্রাম আর বস্তি। কিন্তু তারচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনীতিকে দ্রুত ই-কমার্সে নিয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ, মোবাইল, ইন্টারনেট ব্যবস্তা করা আর তার জন্য যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করতে হবে সেটা যেমন  পরিবেশগত ভাবে অবৈজ্ঞানিক, তেমনি আচমকা সেদিকে সরকারি খরচ করে অর্থনীতিকে নিয়ে গেলে যে কৃত্রিম আর্থিক স্ফীতি জন্ম নেবে প্রকল্প শেষ হলেই তার অবলুপ্তিতে অর্থনীতি হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

বিমুদ্রায়নণর আগে এই পুরো চিত্রটা সরকার ভাবেনি, দায়িত্বে থাকা অর্থনীতিবিদদের দল ভাবেনি, এটা একটা রীতিমত স্ক্যান্ডাল, এই অপদার্থ অর্থনীতিবিদদের আমাদের দেওয়া করের টাকায় পোষা হয়!

ইতিমধ্যেই অর্থনীতির যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, মার্কিন অর্থনীতি কিভাবে আগামীদিন চলবে সেগুলোও ভাবা হয়নি। কালো টাকা বিশেষ ধরা পড়েনি, নতুন টাকাও নকল হতে শুরু করেছে। সবুজ টাকা, নানা ভোটমুখী প্রকল্প দিয়ে ক্ষতে মলম লাগাবে সরকার, একাধিক ভয়ানক প্রস্তাব শোনা যাচ্ছে, একেকটা আরেকটার চেয়ে বেশী অবৈজ্ঞানিক। এসব নিয়ে ভারতীয় অর্থনীতি আর সমাজ এক উটকো বিপত্তির মুখে। এক দুর্বল সরকারের ক্ষতিকর মনিটারি আর অক্ষম ফিসক্যাল নীতি আবারও প্রমাণ করল ত্রিশ বছর আগে অধ্যাপক কৌশিক বসু যা বলেছিলেন, ধনতান্ত্রিক গণতন্ত্রে সরকার তার নীতি দিয়ে ভালর চেয়ে খারাপ করে বেশী।

একেই বলে সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়।

এখনো পর্যন্ত ভারতের মানুষ ভয়ে হোক, দেশপ্রেমের লাড্ডু খেয়ে হোক সব সহ্য করছে, কাজ হারিয়ে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ ফিরে গেছে কয়েক হাজার মজদুর, গুজরাট আর গাজিয়াবাদ থেকে ফিরে যাচ্ছে বিহার, পশ্চিমবঙ্গের দেশগাঁয়ে। মন্দা আরও তীব্র আকার নিলে ভয় বা ভক্তি কিছু দিয়েই এদের ক্ষোভ আটকে রাখা যাবে না। সেই পরিস্থিতি সরকার কি ভাবে সামলাবে সেটাই দেখার। ক্ষতি যা হয়ে গেছে সেটা সহজে মেটার নয়। সরকারের কল্যানরাষ্ট্র গঠনের কোন সদিচ্ছাও নেই। কাজেই আগামী দিনে হয় পশ্চাৎপদ দারিদ্র বা উন্মাদ জাতীয়তাবাদ, এই দুই বিকল্প পড়ে থাকছে ভারতবাসীর সামনে।

Developed by DXDasia