
সরকারি-বেসরকারি রাজ্যের সব স্কুলে বাংলা পড়ানো আবশ্যিক করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অচিরেই প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই নির্দেশ কার্যকরী করতে হবে। সোমবার রাতে বাড়িতে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে একথা ঘোষণা করলেন শিক্ষামন্ত্রী। জানালেন, এ রাজ্যের সব বোর্ডের স্কুলগুলিকেই এই নির্দেশ মানতে হবে।
এতদিন বেশিরভাগ বেসরকারি ইংরাজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে দুয়োরানী ছিল বাংলাভাষা। ‘ঐচ্ছিক’ হিসেবে কোনও রকমে সিলেবাসে নিজের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রেখেছিল। অভিভাবকদের প্রভাবে পড়ুয়ারা ইংরেজির পাশাপাশি বেছে নিচ্ছিল হিন্দিকে। বাংলা পড়ে থাকছিল অবহেলায়। নতুন নিয়ম চালু হলে বাঙালি- অবাঙালি নির্বিশেষে সবাইকেই বাংলা পড়তে হবে, শিখতে হবে। ভারতের বেশকিছু রাজ্যে সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষা স্কুলে আবশ্যিক থাকলেও এ রাজ্যে সে চল ছিল না। আইন হলে এ চিত্রটা পালটানোই স্বাভাবিক।
মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনের কথা, যেদিন ইউনেস্কো বাংলাভাষা দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করল। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। সারা পৃথিবীর বাংলা ভাষাপ্রেমীরা গর্বিত হয়েছিলাম ২১ শে ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হতে দেখে। কিন্তু কেবল গর্বিত হলেই তো হবে না, কিছু কাজ সব সময়েই বাকি থেকে যায়। তাই আমরা পথে নেমেছিলাম ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কলেজস্কোয়ার থেকে মিছিল গিয়েছিল কার্জনপার্ক পর্যন্ত। দাবি ছিল রাজ্যের সমস্ত দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা লেখা আবশ্যিক করতে হবে এবং সরকারি কাজের ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। তখনও রাজ্যে পাঁচতারা বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলব্যবসা জাঁকিয়ে বসেনি। তবু বাংলা ভাষা পড়ানোর দাবি তখনও উঠেছিল। ভাষা ও চেতনা সমিতির মঞ্চে ধর্মতলায় প্রতীকী অনশনে বসেছিলাম আমরা। বাংলাকে নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকার অপমান থেকে বাঁচাতে, নাকি নিজেরাই বাঁচতে চেয়েছিলাম, ‘আত্মলাঞ্ছনা’-র হাত থেকে?
হাইডেগার বলেন, ভাষা হল সত্তার আবাসগৃহ। ভাষাকে ঘিরেই সত্তার চেতনার বিকাশ, আমার আমি হয়ে ওঠার লড়াই। সেদিনের মিছিলে এই লড়াইয়েই আমাদের সঙ্গে পা মিলিয়েছিলেন সবিতা জয়সওয়াল। তিন-চার পুরুষ ধরে কলকাতায় থাকা সবিতা বাংলায় কবিতা লিখতেন বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে। বলছিলেন, বাড়িতে অনেক সময় বাবা-জ্যাঠারা হিন্দিতে কথা বললেও সংস্কৃতিতে আদ্যোপান্ত বাঙালি। বাংলা লিখতে ও পড়তেও পারেন। কিন্তু এখানেই শেষকথা নয়, সবিতাকে ছোট থেকে হাতে ধরে বাংলা বই পড়িয়েছেন যত্ন করে। বলেছেন, যেখানে আমাদের ব্যবসা, যে বাংলা আমাদের অন্ন যোগায়, সেখানকার ভাষা অবশ্যই শেখা উচিত। সবিতা বলেছিলেন, তোমাদের মতো বাংলাভাষা আমার মায়ের ভাষা নয়, বাংলা আমার নিজের ভাষা। বাংলাভাষাই আমার ‘দেশ’।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সেদিন বেরিয়েছিল মিছিল। এরপরই বাংলার একটি ‘প্রথম শ্রেণির দৈনিক’ সুনীলকে ‘বাংলাবাজ’ অভিধায় ভূষিত করে। নিয়তির পরিহাস এমনই ওই দৈনিকেই দীর্ঘদিন চাকরি করতেন তিনি।
২০০০ থেকে ২০১৭। সময়টা নেহাত কম নয়। সামনেই আসছে ১৯ মে। বাংলাভাষাকে মর্যাদা দেওয়ার লড়াইয়ের আরেক ঐতিহাসিক দিন। এর আগে রাজ্যসরকারের এমন নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েও বলতে হয়, কাজ কিন্তু এখনও অনেক বাকি। আজকের কলকাতা শহর সহ রাজ্যের বহু দোকানের সাইনবোর্ডে নেই বাংলা। আজও অনেক বাঙালি পরিবারের সন্তান বাংলাভাষা উচ্চারণ করতে হীনমন্যতা বোধ করেন, আজও রাজ্যের উচ্চশিক্ষার পীঠস্থানগুলিতে অনেক বিষয়ের গবেষণাপত্র অ-লিখিত ফরমানে বাংলাভাষায় লেখা নিষিদ্ধ। এই বাঁধগুলোকে ভাঙার লড়াই চলছে, আমাদের রাস্তায় নামতে হবে।
বাংলা আমার মায়ের ভাষা বলার মধ্যে যে স্মৃতি মেদুরতা আছে, তাকে জিইয়ে রেখেই বলতে হয় বাংলা আমার নিজের ভাষা। বাংলাভাষাই আমার ‘দেশ’।
গ্রাফিক্স সৌজন্যে -রয়াল