July 11, 2017 | 12:00 PM

বাংলার পীর-৩

“যে জাতি ভারতের শাসক হউক না কেন, হিন্দু-মুসলমানকে এদেশে পাশাপাশি বাস করিতেই হইবে। তল্পিতল্পা গুটাইয়া হিন্দুরা এদেশ ছাড়িয়া কোনদিন সিন্ধুর কূলে আবার ফিরিয়া যাইতে পারিবে না। অথবা মুসলমানদের পক্ষেও ইসলামী জাহাজে বাচ্চা – কাচ্চা লইয়া আরব সাগর পাড়ি দেওয়াও সম্ভবপর নহে। সুতরাং এদেশে যখন বাস করিতেই হইবে তখন উভয়ের স্বার্থের কিঞ্চিৎ হরণ পূরণ করিয়া সাম্প্রদায়িকতার দানবকে হত্যা করা উচিত।”

কথাগুলো মৌলানা রুহুল আমিনের। যে বসিরহাটে এত হিংসা ছড়িয়ে পড়ল, তারই সাঁইপালায় মৌলানা রুহুল আমিনের বাড়ি। বাড়ির সামনে মাজার। পরবর্তীতে তিনি পীরত্ব লাভ করেন। হিন্দু – মুসলমান সবাই তাঁর রওজায় যান। দোওয়া চান। তেল -জল পড়া নিয়ে আসেন। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা মানুষের মুখেমুখে। তাঁর প্রতি মানুষের অগাধ ভক্তি। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা বাংলাদেশেও ছড়িয়ে রয়েছে। তিনি ছিলেন ফুরফুরা শরিফের দাদা পীর হজরত আবুবক্কর সিদ্দিকীর প্রধান শিষ্য। দাদা পীর তাঁর পান্ডিত্যের প্রশংসা করতেন। ফুরফুরার পীর সাহেব দেশ – বিদেশ যেখানেই যেতেন, তাঁর সঙ্গী হতেন প্রিয় শিষ্য মৌলানা রুহুল আমিন। তিনি ছিলেন ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সুন্নতল জামায়াত পত্রিকায় তিনি ইংরেজদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, “ভারতকে আর পদানত করিয়া রাখা চলিবে না। তাহারা জাগিয়াছে এবং সে জাগরণের পরিনাম বড় সহজ নহে। সুতরাং ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া গতি কি। “জাতীয় নেতাদের তিনি বলছেন, “ব্যক্তি চরিত্র উন্নত না হইলে জাতীয় চরিত্রও উন্নত হইতে পারে না।”

‘ইসলামের কল্যাণ কোন পথে’ তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হজরত পীর রুহুল আমিন বলছেন, “যাহারা ইসলামের গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখিতে চাও, তাহারা কৃষক -প্রজা আন্দোলনে ঝাঁপাইয়া পড়। কৃষক প্রজাদিগকে ঐক্যবদ্ধ কর,’ বসিরহাটের হিন্দু-মুসলমান তাঁর প্রতি ভক্তি দেখিয়ে সেসময় জমি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি ভারত ভাগের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। পীর রুহুল আমিনের অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলতে গিয়ে বসিরহাটের স্বরূপনগরের মহম্মদ শুকুর আলি বলছেন, “পীর সাহেবের সঙ্গে একবার ফুরফুরা শরিফ থেকে তাঁরা ফিরছেন, তখন হাওড়া থেকে হুগলির শিয়াখালা পর্যন্ত মার্টিনবার্ন কোম্পানির ট্রেন চলত। তাদের সঙ্গে ছিলেন ১৬ জন। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তবুও পীর সাহেব তাঁদের বলছেন, ” দৌড়াও “। কিছুটা দূরে গিয়ে থেমে গেল ট্রেন। স্টেশন থেকে তাবড় ইঞ্জিনিয়াররা এলেন। কিন্তু গাড়ি চলছে না। পীর সাহেব উঠলেন। তাঁর সঙ্গীরা আসনে বসলেন। পীর সাহেব তারপর চালককে বললেন ইঞ্জিনে স্টার্ট দিতে। তারপর ট্রেন চলল। পীর রুহুল আমিনের পূর্বপুরুষরা ছিলেন পাঠান পরিবারের। টাকির কাছে ইছামতী নদীর ধারে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন তাঁরা। নদীগর্ভে একসময় তলিয়ে যায় সে গ্রাম। তারপর উঠে এসেছিলেন বসিরহাটের সাঁইপালায়। ১৮৮২ সালে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল রাখাল পণ্ডিতের কাছে। তাঁর প্রতিভায় বিস্মিত হয়ে গোপাল খাঁ পরবর্তী শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেন। সেসময় গোপাল খাঁ-কে বলা হত বসিরহাটের দানবীর। ১৯৪৫ সালের তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে তাঁরই তৈরি বসিরহাট মাদ্রাসার মাঠে ঈছালে সওয়াব শুরু করেছিলেন। প্রতিবছর ১৭ ফাল্গুন শুরু হয় উৎসব। তিনদিন ধরে উৎসব চলে। প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের সমাগম তিনদিনে। তার আগে পীর সাহেবের বাড়িতে রওজায় শুরু হয় উৎসব। ১৩ ফাল্গুন শুরু হয়ে চলে তিনদিন। হিন্দুরা এসে দোওয়া চান। দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য বহু হিন্দু-মুসলমান পীরের রওজায় এসে মোনাজাত করেন।

কোনোদিন অশান্তির খবর পাওয়া যায়নি। বরং তিনদিন শহরের হিন্দুরা ব্যস্ত থাকেন বেশি। তাঁদের বাড়িতেও আত্মীয় আসে। বিদেশ থেকে বহু মানুষের সমাগম হয়। দেশ – বিদেশের প্রখ্যাত আলেম, মৌলানা আসেন। বসিরহাটের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি, সামাজিক সহবস্থানের জন্য দোওয়া চান তাঁরা, ঠিক যেমন করে পীর রুহুল আমিন দোওয়া চাইতেন।

আরবি, ফারসি, এমনকি সংস্কৃত ভাষায় তাঁর ছিল অগাধ পান্ডিত্য। তাঁর মুখ নিঃসৃত বাণী হিন্দু-মুসলমান অনুসরণ করে চলতেন। পীর সাহেবের বংশধর খোবায়েব আমিন ‘আল্লামা রুহুল আমিন ফাউনডেশন’ তৈরি করে তাঁর অজানা বহু গুণের কথা প্রচারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

বসিরহাট স্টেশন থেকে ৫ মিনিট হাঁটা পথে তাঁর রওজা। এখান থেকে ইছামতী নদী হেঁটে ১০ মিনিট। টাকি জমিদার বাড়ি ১৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশ সীমান্ত ১০ কিলোমিটার। পড়ন্ত বিকেলে ইছামতীর পাড় থেকে সূর্যডুবি চোখ জুড়িয়ে দেয়।

Developed by DXDasia