
পুজো বা পার্বণে যেমন গোবিন্দভোগ, সীতাভোগ, মোহনভোগ, ঠিক তেমনই চালের চরিত্র, গুণ অনুযায়ী কৃষক বেশ কয়েকটা ধানের নাম রেখেছিলেন রাবণশাল, মুগুরশাল, লাঠিশাল, বাঁশমুগুর, তালমুগুর, লোহাগোড়া। এসব মোটা ধান। খেতে সুস্বাদু। কৃষক নিজে বাড়িতে খাওয়ার জন্য মোট ধানের চাষ করেন বরাবর। কিন্তু রাবণশাল, মুগুরশাল তাঁরা চাষ করেন সকালে পান্তা খেয়ে মাঠে যাওয়ার জন্য। সারাদিন কাজ করলেও পেটে থাকে অনেকক্ষণ। ধানের শিসের ফুল অনুযায়ী চম্পা, বকুলফুল, বেনাফুল, চাঁপা, কুসুমগাঁদা, পদ্ম, শিমুলকুঁড়ি নাম রেখেছেন কৃষক। শিস বের হওয়ার সময় যে ধান থেকে যেমন গন্ধ বের হয় সে ফুলের নামেই নামকরণ। এদের মধ্যে বকুলফুল হল উচ্চফলনশীল ধান। শিস দেখতে বাবুই পাখির বাসার মতো বলেই কৃষক নাম রেখেছেন বাবুইলতা। কৃষ্ণের গায়ের রঙের মতো দেখতে বলেই চালের নাম হয়েছে চিত্রাকানহাই। এই ধানেও রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ আয়রন। রক্তে উচ্চ কোলেস্টরল থাকলে এ চালের ভাত খাওয়া খুবই উপকারী। বলছিলেন বিরহীর দেবদুলাল।
নদিয়ার চাপড়ার কৃষক রবিউল ইসলাম চাষ করেন ভীমশালের। আমাদের রাজ্যে যেসব জাতের ধান হয়, ভীমশালের চাল তারমধ্যে সবচেয়ে মোটা, তবে মনমাতানো গন্ধ। গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের কাছে এ চালের চাহিদা খুব। চাপড়া, করিমপুর এলাকায় দু-ধরনের ধান এখনও চাষ করেন কৃষক। চৈতন্য আর দয়াল মদিনা। ৭০ বছরের বৃদ্ধ কৃষক রবিউল ইসলাম বলছিলেন, সম্ভবত তাঁরই বাপ – ঠাকুরদা শ্রীচৈতন্য আর হজরত মহম্মদের প্রতি ভক্তিতে এসব ধানের নামকরণ করেছিলেন। শিস বের হওয়ার পর ধানের মাজ দেখে নামকরণ হয়েছিল দুধেরসর, দুধকলমা, দুধমটরের। এদের মধ্যে দুধেরসর সরু চাল, খেতে সুস্বাদু। দুধের মতো ফ্যান হয়, ফ্যান খেতে মিষ্টি। খেলে নাকি শরীরে শক্তি বাড়ে। বহু কৃষক পরিবারে তাই ভাতের ফ্যান ঝেড়ে রেখে দেওয়া হয়। অপুষ্টিতে ভোগা রোগী আর শিশুদের খাওয়ানো হয়। তবে আমরা বাজারে যে দুধেরসর চাল পাই, তার বেশিরভাগই চামরমণি, প্রকৃত চাল দেখতে হবে অনেকটা বাদামি রঙের, বহুজাতিক সংস্থাগুলো বাণিজ্যিক স্বার্থে বলছে, পুরানো ধান পাঁচ থেকে ছ’মাসের ফসল। কিন্তু চাপড়ার রবিউল বলছিলেন, আঁশ, গোরা, গুরুজী, কেয়াকেলাস, লক্ষ্মীদিঘল, নলপাই, রাজঝিঙা, সাথী, শিসাফল তিনমাস অথবা তিনমাস পনেরো দিনে তোলা যায় জমি থেকে।
তাহলে কৃষক এসব ধানের চাষ করা ছেড়ে দিয়েছেন কেন? রবিউল ইসলাম বলছিলেন, মরশুম শুরুর আগে গ্রামে শিবির করে সংস্থাগুলো ছোট উপহার দেয় কৃষকদের, কেউ আবার ঋণ দেয়, শিবিরে কৃষকদের ডেকে ভুরিভোজ করানো হয়। তারপর বোঝানো হয় কোন সারের কী গুণ, কোন কীটনাশক কতখানি বেশি ফসলের জন্য দরকার। ফলে আর পুরানো ধানে মন নেই।