
আমাদের দেশের ১ লক্ষ ৪২ হাজার জাতের ধান সংরক্ষিত আছে ফিলিপিন্সে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে ভারতের ধান সংরক্ষিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ধান্য গবেষণা কেন্দ্রে। তবে শুনলে অবাক হবেন, আমাদের দেশে সরকারি ও বেস সরকারি উদ্যোগে গবেষণা চালিয়ে এ পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার জাতের ধান উদ্ধার আর সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এরমধ্যে ১৩২০ রকমের ধান রয়েছে ওড়িশায় ডঃ দেবল দেবের ‘বসুধা’ নামের সংস্থায়।
এ রাজ্যে ১২০ টা ক্লাস্টার তৈরি করে পুরানো ধানের চাষ শুরু হয়েছে ঠিকই, তবে বহু কৃষক এখনও নিজের বাড়ির জন্য বাপ – ঠাকুদার আমলের বীজ বুনছেন। দেখা যাচ্ছে, এ রাজ্যের কৃষক আজও সুগন্ধি ধানের চেয়ে অনেক বেশি চাষ করেন এমন সব ধান যার চাল খেতে মিষ্টি, পেঁজা তুলোর মত, পেটে থাকে অনেকক্ষণ, আর রান্না করতে কম সময় লাগে। দিনাজপুরের তুলাইপঞ্জী এত বিখ্যাত হয়েছে তার বড় কারণ দু জেলার বেশিরভাগ কৃষক এই ধানের চাষ করেন আর এর বিপণন ব্যবস্থা ভাল। তুলাইপঞ্জী রান্না করতে কম সময় লাগে, সুস্বাদু, গন্ধ আছে। তবে বাঁকুড়ায় কোমল নামে একধরণের ধান রয়েছে, কৃষকরা বলছেন এর চাল কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখলে প্রায় ভাত হয়ে যায়। তারপর মিনিট দুয়েক উনুনে রাখলেই হবে। তুলাইপঞ্জীর মত খেতে। তবে গন্ধ বেশি।
বালাম, বৌভোগ, দুধেরসর, ফুলপাকড়ি ইন্দিরাশাল এসব হল কম জ্বালানির ধান। উওর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণায় সন্তোষী, পাইজাম, চিনিকামিনী নামের ধান চাষ করেন কৃষক, এগুলো শুধু কম জ্বালানির নয়, খেতে সুস্বাদু। সন্দেশখালির বড় সেহেরার কৃষক বিলাস মন্ডলের কথায়,’ আগে কৃষকের চাষই মূল জীবিকা, তখন মানুষের পারিবারিক অবস্থা ছিল খুব খারাপ, এই চালের ভাতে শুধু লঙ্কা ঘষে আর পেঁয়াজ দিয়ে খেয়ে নিতেন, এত মিষ্টি আর সুগন্ধী ছিল।’ বিলাস ১০ কাঠা জমিতে চাষ করেন পাইজামের, এত চিকন চাল যে বারবার হাত বোলাতে ইচ্ছে করে। ফুলমতি আর দাঁতশালের গল্প শোনাচ্ছিলেন উওর ২৪ পরগণার শাঁড়াপুলের হোসেন আলি। ফুলমতির জমিতে গেলে দারুণ গন্ধ বের হয় আর দাঁতশাল দেখতে বাসমতির মত। আলাদা করে চেনা যায় না। হাঁড়িতে চাল ফুটলেই দূর থেকে গন্ধ পাওয়া যায়। সকালে জমিতে চাষ করার সময় যখন পান্তা খাওয়া হয়, পাশের জমির কৃষক বুঝতে পারেন ফুলমতির ভাত খাচ্ছে কেউ। একসময় এমন ছিল যে, ফুলমতির বীজ দিতে চাইতেন না প্রতিবেশী। ফুলমতি এখনও বিঘে প্রতি ৬/৭ বস্তা ফলন দেয়। আর উচ্চ ফলনশীল ধান দেয় ২০/২৫ বস্তা। কৃষক তাই ফুলমতির কথা ভুলেই গেছে। তবুও দু-একজন ইতিহাস ভুলতে পারে না। এসব চাল বাজারে কিনতে গেলে দাম পড়বে প্রতি কিলো ১০০ থেকে ১১০ টাকা। তাছাড়া বিক্রি করার বাজার নেই গ্রামে।! কিনে খাবে কে?’ যে তুলাইপঞ্জী নিয়ে এত কথা শোনা যায়, তার প্রকৃত চালের দাম পড়ার কথা ১১০ থেকে ১২০ টাকা। এই দামের চালে তাহলে সত্যিকারের স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যাবে।