May 23, 2017 | 12:00 PM

বাংলার অন্ন-কথা ২

দ্বিতীয় পর্ব

বৌমা সন্তানসম্ভবা হলেই শাশুড়ির হাঁড়িতে চড়ত হিরামতি, দুধেবোলতা, ভূতমুড়ি, কেলাস। কৃষক লোকমান মোল্লার মা বলতেন, এই সময় রক্ত দরকার। এসব চালের ভাত খেলে গায়ে রক্ত হবে। পেটে বাচ্চার বয়স যখন ন’মাস, তখন বৌমাকে খেতে দেওয়া হত গরীবশাল অথবা নৈচি চালের ভাত। মা বলতেন, দেহে শক্তি হবে। সন্তানের জন্ম হলে লোকমানের মা বলতেন, এবার কবিরাজ-শালের চালের ভাত খাওয়াও। গ্রামে তখন হাতুড়ে চিকিৎসকরা বলে দিতেন, শরীরের দিকে নজর দিতে, এসব চালের ভাত দেহে আয়রন বাড়ায়, শরীরে নতুন রক্ত তৈরি করে। প্রায় হারিয়ে যাওয়া এইসব ধান নিয়ে গবেষণা চলেছে ১৪/১৫ বছর ধরে। দেখা যাচ্ছে, এই সব ধানে আয়রন রয়েছে ১২ থেকে ১৬ মিলিগ্রাম (প্রতি ১০০ গ্রামে)। এদের মধ্যে করিম-শাল চালে আয়রন থাকে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৬ মিলিগ্রাম। বাঁকুড়ার পাঁচাল সুস্থায়ী কৃষি উদ্যোগ সমিতির ভৈরব  সাহানি এসব ধান সংগ্রহ  করছেন। চাষীদের উৎসাহী করছেন। খামারে গবেষণা চলছে। ‘গ্রামে আজও কেউ সন্তান সম্ভবা হলে এসব চালের ভাত খাওয়ান পরিবারের লোকজন’, বলছিলেন ভৈরব। তাঁর কাছে রয়েছে ১৪৭ রকমের ধান। আগে গ্রামে পেটের অসুখ  হলে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে বাগতুলসি চালের ভাত খাওয়ানো হত। ডাইরিয়া হলে বাড়ির বয়স্করা বলতেন পরমাইশাল, ভূতমুড়ি বা ফুলকাঠি চালের ভাত দিতে। উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালির কৃষক আবুবক্কর লস্কর বলছিলেন, তখন তো গ্রামে হাতুড়ে চিকিৎসকও ছিল না। দামোদরগেতু চালের ভাতের ফ্যান খাওয়ানো হত ডাইরিয়া রোগীকে। বল বাড়িয়ে দিত দেহে।

ডঃ দেবল দেব  প্রায় হারিয়ে যাওয়া ধান নিয়ে এখন গবেষণা করছেন ওড়িশায়। তাঁরই সহকারী দেবদুলাল বলছিলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় সব লালচে চালে কমবেশি আয়রন আর জিঙ্ক থাকে। তবে পরমাইশালে আয়রন থাকে ১২ থেকে ১৪ মিলিগ্রাম  আর জিঙ্ক থাকে ৩৬ মিলিগ্রামের কাছাকাছি। করিমশালে জিঙ্ক থাকে প্রায় ৪৬ মিলিগ্রাম। মিষ্টি চাল আর রোগ প্রতিরোধ করতে পারে বলেই আজও অনেক  কৃষক বাড়ির জন্য এসব ধান চাষ করেন। কৃষক জানেন এদের মধ্যে করিমশাল আর কবিরাজশাল সবচেয়ে উপকারী। গবেষণার বিষয়বস্তু তাঁদের  কাছে এখনও পৌঁছায়নি। চালে জিঙ্ক আছে বলেই ডাইরিয়া হলে তার ফল পেতেন গ্রামের মানুষ।’ কালো ধানও চাষ করেন অনেক কৃষক। কালাভাত, কালিন্দী,  কালোপেলাস, ঝিঙেশাল চাষ করেন তাঁরা। এসব চালের ভাত খুব মিষ্টি। তবে ফলন কম। সন্দেশখালির কৃষক বিলাস মণ্ডল চাষ করেন পরমাইশাল আর কালোপেলাস ধানের। এ চালের ভাত খেলে নাকি শরীরের কষ্ট দূর হয়। ভৈরবদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় সব কালো চালে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকে। তবে পরমাইশালে সবচেয়ে বেশি। কৃষককে তাঁরা সচেতন করে বলছেন, এসব চাল কিছুটা হলেও ক্যানসার প্রতিরোধ  করে। ভৈরব বাঁকুড়ার সোনামুখিতে কালো ধান চাষ করে চাল পাঠিয়ে দিচ্ছেন বিদেশে।