July 9, 2017 | 12:00 PM

‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’

হিংসায় বাবা কার্ত্তিক ঘোষকে হারিয়েছেন প্রভাশিস। যে অ্যাম্বুলেন্সে করে বসিরহাট হাসপাতাল থেকে তিনি আর জি কর মেডিকেল কলেজে নিয়ে এসেছিলেন মৃতপ্রায় বাবাকে, একই অ্যাম্বুলেন্সে আর এক আহত ফজলুল ইসলামকেও হাসপাতালে এনেছিলেন তিনি। প্রভাশিস বলেছেন, দু হাতে স্যালাইন ধরে দু ঘণ্টার পথ এসেও বাবাকে বাঁচাতে পারেন নি। কিন্তু বেঁচে গেছেন ফজলুল। অ্যাম্বুলেন্সে আহত ফজলুলকে তোলার সময় মুসলমান কী হিন্দু এসব মাথায় ছিল না, তখন মানবিকতার টান অনুভব করেছিলেন তিনি। আজ বাবা নেই। কিন্তু ফজলু কাকার জীবন বাঁচাতে পেরেছেন, এটাও একটা সান্ত্বনা।

কার্ত্তিক ঘোষের গলায় ছিল তুলসীর মালা, তাই তাঁকে হিন্দু মনে করে হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। আঘাত করা হয়েছিল মাথায়। আর ফজলুল হিংসার মধ্যে পড়ে গিয়ে বাহিনীর শেলে আহত হয়েছিলেন। যে মানবিকতার টান তিনি অনুভব করেছিলেন তা তাৎক্ষণিক নয়। বসিরহাটে এই টান দীর্ঘদিনের। এখানে হিন্দু – মুসলমান আলাদা করে চেনা যায় না। শাঁখা, সিদুঁর, গলায় তুলসীর মালা টুপি আর দাড়ি ছাড়া। এখানে দাড়ি থাকা মুসলমান গ্রামবাসী বাজার করতে এলে কেউ চাচা বলে না, বলে কাকা। মুসলমান ঘরের স্ত্রী বাজার করতে এলে হিন্দু দোকানি ‘ভাবী’ বলে ডাকেন না, ডাকেন বৌদি বলে। প্রভাশিস জন্মের পর থেকেই দেখেছেন, এক দোকানে সবাই চা খান, এক পুকুরে স্নান করেন, হিন্দুর টিউবওয়েলে পানীয় জল নিতে যায় মুসলমান। পাশাপাশি জমিতে চাষ করেন। ঈদ,পুজোয় একসঙ্গে আনন্দ করেন। দুর্গা প্রতিমার ভাসান যখন হয় ইছামতিতে,তখন দু পাড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্যে কে হিন্দু, কে মুসলমান আলাদা করা যায় না।

লবঙ্গ গ্রামে আব্দুল বারি গাজী মনসার ভাসানে চাঁদ সওদাগরের অভিনয় করেন। সওদাগরের স্ত্রী সনকার চরিত্রে অভিনয় করেন পাড়ারই মেয়ে ভারতী দাস। ভারতীরা রুইদাস সম্প্রদায়ের। গ্রামেরই রিকশা চালক রাজ্জাক গাজী পবনপুত্র হনুমান সাজেন। পালায় বাঁশি বাজান মুজিবর রহমান অথবা আতিয়ার গাজী। আব্দুল বারি, আতিয়াররা এখন হজ করে এসেছেন। সেই গ্রামেও এখন উত্তেজনা। এখনও নজরুল ইসলামের বাড়িতে কাজ করেন গোকুল দাস, জমি ধান চাষ করেন কালী দাস, যে সফিরাবাদে এত ঝামেলা হয়েছে সেখানে হিন্দু পাড়ায় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে সঞ্জয় ঘোষের সঙ্গে ডাক পড়ে জহুরুল আর আব্দুস সামাদের। আজীবন দিলদার রহমানের বাড়িতে কাজ করেছেন স্বামী পরিত্যক্তা সুমি দাস। রান্নাও করতেন। এমনকি গোমাংসও রান্না করতেন। হাঁড়ি থেকে বেড়ে দিতেন খাওয়ার সময়। কিন্তু নিজে কখনও গোমাংস খেতেন না সুমি আর দিলদারের পরিবার যে আলাদা তা কখনও দু পরিবার ভাবেনি, সেখানে এখন অবিশ্বাসের ছায়া। বসিরহাটের যে ট্যাটরায় প্রাণ গেছে কার্ত্তিক ঘোষের, সে গ্রামের শিক্ষক লিয়াকত আলি আজও নমস্য। হিন্দু যে কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এখনও তিনি মধ্যমণি। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের মেয়ে জাহানারা নার্গিস বলছিলেন, চারিদিক থেকে যখন এত হিংসার খবর আসছিল তখন তাঁর ভাইয়ের বন্ধু দিবাকর খোঁজ নিয়েছে ওরা কেমন আছে।”

বসিরহাটে যখন পীর রুহুল আমিনের রওজায় ঈছালে ছওয়াব হয়, সে তিনদিন কমকরে দশ লক্ষ মানুষ আসেন। হিন্দুরা এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যান। অথচ তিনদিন আগে পীরের মাজারের সামনেই পুলিসের সঙ্গে কার্যত খণ্ডযুদ্ধ হয়েছে উন্মত্ত জনতার। পীরজাদা খোবায়েব আমিন বলছিলেন, পীরের রওজার দিকে কেউ ইটও ছোঁড়ে নি। “এখনও এই রওজায় কোনো অনুষ্ঠান হলে আমন্ত্রিত হন বসিরহাটে কংগ্রেসের তৎকালীন নেতা বর্তমানে তৃণমূলের অসিত মজুমদার। তিনি বলেন, এটা তাঁর মামাবাড়ি।

যে আধানি গ্রামে এত গণ্ডগোল সেখানকারই বাসিন্দা বলহরি তপস্বীর ধরম মা হলেন কোহিনুর বেগম। গ্রামেরই পাশে পাঁচ মুসলিম কিশোরকে আটকে দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি সিপিআই(এম) নেতা সিদ্দিক মন্ডলের ছেলে। সবাই ভেবেছিলেন সিদ্দিক মন্ডলের ছেলে মারা গেছে। উন্মত্ত জনতার হাত পাঁচ কিশোরকে সেদিন রক্ষা করেছিলেন তাপস দাশ (ফোটেন)। তড়িঘড়ি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান বসিরহাটের আই সি নাসিম আখতার। তাদের উদ্ধার করে ভর্তি করান হাসপাতালে। আর জি কর হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে মৃতপ্রায়রা ফিরেছে বাড়িতে। বসিরহাট শহরের কাছে অনন্তপুরের যুবক ওবেদুল্লার মত্যুর খবরও রটে গিয়েছিল। তাঁর শেষকৃত্যের জন্য কেনা হয়ে গিয়েছিল কাফনের সাদা কাপড়। কিন্তু হঠাৎ তাঁর নাড়ির গতি পান স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসক। হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। বেঁচে ফিরেছেন তিনিও। শুধু ৬৫ বছরের বৃদ্ধ কার্ত্তিক ঘোষ আর ফিরে এলেন না। স্বরূপনগরের কংগ্রেস নেতা, একদা বাংলায় রাজীব গান্ধী ব্রিগেডের নেতা আব্দুল হাই সিদ্দিকী বলছিলেন, “৬৪ সালের ঘটনাতেও বসিরহাট মহকুমায় হানাহানি হয় নি। কংগ্রেসের প্রবাদপ্রতিম নেতা কাজী আব্দুল গফফরকে হিন্দু -মুসলমান ভোটে জিতিয়েছেন।” “কৃষক আন্দোলনের নেতা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, মনোরঞ্জন শুরকে হিন্দু-মুসলমান শ্রদ্ধা করতেন। এমনকি লোকসভা নির্বাচনে ধর্মীয় নেতা মৌলানা আসাদ মাদানিকে এনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুরারিশাহ এলাকায় সভা করিয়েও মনোরঞ্জন শুরকে হারানো যায় নি। “বলছিলেন সিপিআই (এম) নেতা মৃণাল চক্রবর্তী। এই বসিরহাটের স্বরূপনগরে খাদ্য আন্দোলনে শহিদ হয়েছিলেন নুরুল ইসলাম। আজ সেখানে ধর্মীয় হানাহানি হচ্ছে। বেসরকারি ও সরকারি সূত্রে সর্বশেষ খবর পাওয়া যাচ্ছে, ছ’দিনের হিংসায় আহত হয়েছেন ২২জন, দু-একজন ছাড়া হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরেছেন সবাই। লুটপাঠ হয়েছে বেশি।