
নারীর ক্ষমতায়নের সোনার পাথরবাটিটি তার অবয়বের উপরিতলের বৃত্তটুকু সম্পূর্ণ করার আগেই বড় ধাক্কা খেল, আমেরিকার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে অধরা মরীচিকার মত তা মিলিয়ে গেল ট্র্যাম্পের জয়ে। দিকে দিকে পুরুষতান্ত্রিকতার জব্বর উৎসব চলছে। সবাই দেখতে পাচ্ছে উঁচু পদমর্যাদার খোঁজ যেখানে, সেখানেই মহিলার সিংহাসন শূন্য। যোগ্যতার নিরিখে, ক্ষমতার বিন্যাসে তাদের পিছিয়ে পড়াটা যেন চিরন্তন প্রবাহ। আশাবাদীরা বলেন, তবুও হচ্ছে, আগের তুলনায় মহিলারা এগিয়েছে। কিন্তু কতখানি? ধীর গতির ঈশান কোণে কেবলই তো মেঘের আনাগোনা। এর মাঝেও মেয়েরা আত্মমর্যাদার জমি খুঁজতে মরিয়া, তাঁদের লড়াই অব্যাহত। অতি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এটা যেমন ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তেমনি অনুন্নত দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব। মোদ্দাকথা, সমাজে মেয়েদের সচেতনতা বাড়ছে, তাঁরা কিছু একটা হতে চান, তাই দিনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিজেদের হাজিরার দাবী তুলছেন।
২০০৬ সালে ‘মিনিস্ট্রি অফ পঞ্চায়েত রাজ’ মুর্শিদাবাদকে দেশের অন্যতম পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। এই অনুন্নয়নের ধারাবাহিক খতিয়ানের প্রতিফলন হিসেবে জেলায় নারীদের নিম্নমুখী স্বাক্ষরতার হারের হিসেব মিলতে থাকে নানা সূত্র থেকে। স্ন্যাপ অর্গানাইজেশন, শুধগঙ্গা, জবলা আক্সন রিসার্চ অর্গানাইজেসন এর কেস স্টাডিতে পিছিয়ে পরা এই জেলার নারী স্বাক্ষরতার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সিএসএসসির পশ্চিম বাংলার মুসলিম বিষয়ক তথ্যে প্রকাশিত সূত্র অনুযায়ী মুসলিম অমুসলিমদের তুলনায় বেশী পারিবারিক কাজে নিযুক্ত থাকে। এই জেলার অনগ্রসর মুসলিম সমাজ নিশ্চিতভাবেই তার ব্যতিক্রম নয়।
সুমনকুমার কুণ্ডু ও অনন্যা চক্রবর্তীর ‘অ্যান এম্পিরিক্যাল অ্যানালাইসিস অফ ওম্যান এম্পাওয়ারমেন্ট উইদিন মুসলিম কমিউনিটি ইন মুর্শিদাবাদ ডিসট্রিক্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’ গবেষণা পত্রে মহিলাদের ক্ষমতায়নের উৎসের নির্দেশকগুলি যেমন অর্থনৈতিক সূত্র, পারিবারিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সচেতনতা, চলাফেরার স্বাধীনতা এই বিষয়গুলির নিরীক্ষণ খুব হতাশা জনক। দামী জিনিস কেনার সিদ্ধান্ত পরিবারের সেভিংস ব্যবহার সম্পত্তি বিক্রয় পোশাক ক্রয় ব্যক্তিগত আয় খরচ ফ্যামিলি প্ল্যানিং প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলিম মেয়েদের স্বাধীনতা সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি মুসলিম মহিলাদের বাবার বাড়ি যাওয়া বা ডাক্তারের কাছে চেক আপে যাওয়া সিনেমা হল বা মেলা যাওয়া বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও কোনও ক্ষেত্রেই মেয়েদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত কার্যকরী হয় না। ভোটে দাঁড়ানো বা রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশগ্রহণও মেয়েদের পরিবার বা স্বামীর নিয়ন্ত্রণে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কারণে মহিলারা স্বামী বা পরিবারের বাবা-ভাই বা শ্বশুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ৬২.৭ শতাংশ স্বামী ও ৩৭.৩ শতাংশ নারী পরিবারের সদস্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পারিবারিক বিষয়ে সহযোগীতার ক্ষেত্রে ৭৩ শতাংশ মহিলা স্বামীর কাছে আভারেজ কো-অপারেশন পেয়ে থাকেন, ১৮ শতাংশ ভালো ও ৯ শতাংশ খারাপ কো-অপারেশন কে স্পষ্ট করে।
বাইরের জগতের সাথে জেলার এই প্রান্তিক মেয়েদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ সীমাবদ্ধ। এর প্রধান কারণ ধর্মীয় বিধিনিষেধ। তাছাড়া পুরুষতন্ত্রের রক্তচক্ষু, বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাব।’ ‘এডুকেশন অ্যান্ড এম্পাওয়ামেন্ট অফ মুসলিম ওম্যান ইন ওয়েষ্ট বেঙ্গল’ এই গবেষণাপত্রে শর্মিলা তালুকদার মুসলিম মহিলাদের পশ্চাৎ পদতার কথা তুলে ধরেন। তার কেস স্টাডি অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশাসনকে ৫৯.০৬% মহিলা শিক্ষার অন্তরায় বা কোনও সমস্যা বলে মানেন না। পর্দা প্রথা কে অনেকে নিজের ও সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেন। চলাফেরার সীমিত স্বাধীনতায় শিক্ষা ও স্বাধীনতার মূল অন্তরায় তার ও প্রমাণ মেলে। মাত্র ২৯.১% মহিলা জানান তাদের বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতির প্রয়োজন হয় না এবং ৭৭.৬৭% মহিলা স্বামীর সিদ্ধান্ত অনুসারেই সন্তান প্রতিপালন করে থাকেন। নাজমূল হোসেন ‘মুসলিম ফিমেল ওয়ার্ক পার্টিসিপেসন ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ নামক কেস স্টাডি তে মহিলাদের সীমাবদ্ধ জীবিকার কথা বলেছেন যেমন বিড়ি বাঁধা ও সিল্কের কাজ। মুর্শিদাবাদে সেই চিত্রের অবাধ প্রতিফলন। ‘এম্পাওয়ারমেন্ট অফ ওম্যান ইন দি ডিসট্রিক্ট অফ মুর্শিদাবাদ’ শুধগঙ্গার এই কেস স্টাডি অনুযায়ী মহিলারা বেশির ভাগ কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে। গবাদি পশু প্রতিপালন, বিড়ি বাঁধা ও পারিবারিক কাজ ছাড়া অন্য কোনও জীবিকায় মহিলাদের উল্লেখযোগ্য ভাবে উপস্থিতি নেই। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির কারণেও মহিলাদের বড় একটি সংখ্যা পারিশ্রমিকবিহীন পারিবারিক শ্রমিক।
এই জেলায় বাল্য বিবাহ একটি বড় সমস্যা কিন্তু কন্যাশ্রী প্রকল্প মেয়েদের সামনে এক নতুন পথ খুলে দিয়েছে। আইসিডিএস, শিশুশিক্ষা কেন্দ্র, সেলফ হেল্প গ্রুপ, এস এস সি নিয়োগ কাজের বড় সুযোগ করে দিয়েছে। বেলডাঙ্গা, জিয়াগঞ্জ, ডোমকলের মহিলারা সিল্ক ও জরি এবং কাঁথা স্টিচের সাথে যুক্ত। লালবাগে বাঁশের ফুলদানী, কৃত্রিম ফুল, ফারের পুতুল ও টেডিবেয়ার নির্মাণে মহিলারা পারদর্শী। বর্তমানে জেলা জুড়ে বিউটি পার্লারে কাজ শেখা ও নিজের পার্লার খোলার প্রবণতা বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রিসেপ্সনিষ্টের কাজ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বহরমপুরের ‘হাবিবস স্যালোনের’ কর্মী বিউটি দেবী জানান- ‘মেয়েরা গ্রাম থেকে স্বামী সহ আসছেন প্রশিক্ষণের সময় ও সিলেবাস জানতে।’ তিনি আরও বলেন- শেখদীঘির মত প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শ্বশুরের অনুমতি নিয়ে মুসলিম মহিলা আসছেন নিজেদের প্রশিক্ষিত করতে।
সদর শহর বহরমপুরে ও তার আশেপাশে গজিয়ে উঠেছে বহু এনজিও। কিন্তু নারীদেহ বিক্রি বন্ধের বিষয়ে তারা জোরকদমে এগিয়ে আসেননি তার প্রমাণ এখনো বিশেষ এলাকা জুড়ে চলছে নিয়মিত ফ্লেশ ট্রড। রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির কর্ণধার খাদিজাবানু জানান- বহরমপুরের আশপাশ থেকে বহু মেয়ে যারা অনেকেই বিবাহবিচ্ছেন্ন তারা এই অঞ্চলে পয়সার বিনিময়ে নিজেদের মুখ ঢেকে আত্মপরিচয় আড়াল করে দেহ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এছাড়া কিছু অখ্যাত ও নামী হোটেল পুলিশ ও প্রশাসনের একশ্রেণীর লোকজনের সাথে যোগসাজশে ফ্লেশ ট্রেড চালিয়ে যাচ্ছে রমরমিয়ে।